সববাংলায়

রবীন্দ্র সেতু | হাওড়া ব্রিজ

বিভাগঃ ,

ভারতবর্ষের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্যগুলির তালিকা করলে হাওড়া ব্রিজ —অর্থাৎ রবীন্দ্র সেতুর নাম প্রথম সারিতেই উঠে আসে। কলকাতা শহরের প্রতীক, বাংলার গর্ব এবং প্রকৌশল দক্ষতার অসাধারণ নিদর্শন—এই সেতুর পরিচিতি শুধু ইস্পাতের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহু মানুষের স্মৃতি, গল্প, সিনেমা, সাহিত্য, গান ও আবেগে গেঁথে আছে গভীরভাবে। ভোরের আলোয় কিংবা সন্ধ্যার আলোছায়ায়, গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল সাসপেনশন-টাইপ ক্যান্টিলিভার ব্রিজ শহরের পরিমণ্ডলকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে হাওড়া বা কলকাতা—দুই শহরেরই পরিচয়ের অঙ্গ হয়ে গেছে এটি।

রবীন্দ্র সেতু, গঙ্গার প্রধান শাখা হুগলি নদীর উপর নির্মিত। প্রশাসনিক দিক থেকে সেতুটি কলকাতা জেলাহাওড়া জেলাকে সংযুক্ত করেছে। একদিকে হাওড়া স্টেশন অঞ্চল, অন্যদিকে কলকাতার বড়বাজার, বি. বি. ডি. বাগ – সব মিলিয়ে সেতুটি দুই জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রকে একত্রে বেঁধেছে। বিশাল এই সেতুটি প্রায় ৭০৫ মিটার লম্বা। নদীর প্রস্থ, জোয়ার-ভাটার প্রকৃতি এবং নাব্যতা বিবেচনা করে সেতুটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে বড় বড় জাহাজও এর নিচ দিয়ে অনায়াসে চলাচল করতে পারে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বর্ধিষ্ণু কলকাতা শহরের সাথে হুগলি নদীর অপর পাড়ে গড়ে ওঠা হাওড়া অঞ্চলের মধ্যে স্থায়ী যোগাযোগের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন হুগলি নদী পার হওয়ার প্রধান উপায় ছিল নৌকা এবং ফেরি, যা বাণিজ্য ও জনজীবনের বাড়তি চাপ সামলাতে পারছিল না। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন একটি পন্টুন ব্রিজ নির্মাণ করে। ৫২টি পন্টুনের উপর দাঁড়ানো সেই সেতু নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে ওঠানামা করত এবং নৌকা চলাচলের সময় সেতুটিকে প্রায়ই খুলে ফেলতে হত। বাণিজ্যের ক্রমবৃদ্ধি, রেলস্টেশনের বিস্তার এবং শহরের জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ধীরে ধীরে প্রশাসনের কাছে এটা স্পষ্ট হচ্ছিল যে কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে যোগাযোগের ভবিষ্যত হিসাবে এই ভাসমান সেতু যথেষ্ট নয়।

১৯০৬ সালে কলকাতা পোর্ট কমিশনারদের একটি প্রতিবেদনে হুগলি নদীর উপর স্থায়ী ইস্পাতের সেতু তৈরির প্রথম প্রস্তাব আসে। নদীর স্রোতের গতি, গভীরতা, পলিমাটির গঠন, নৌযান চলাচল – এসব বিবেচনা করে তৎকালীন বিশিষ্ট প্রকৌশলীরা বলেন যে নদীর মাঝে পিলার বসিয়ে সেতু নির্মাণ করা যাবে না এবং একমাত্র বড় ক্যান্টিলিভার ব্রিজই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। এই প্রস্তাব ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি জাতীয় প্রকল্পে। শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালে ভারত সরকার হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশন গঠন করে, যারা নতুন সেতুর সমগ্র পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ এবং তদারকির দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ গবেষণা, মাটির নকশা পরীক্ষা, জোয়ার-ভাটার পরিমাপ, নৌযাত্রার পথ বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের দৃষ্টান্ত খোঁজা। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সেতুটি হবে একটি ব্যালান্সড ক্যান্টি লিভার ব্রিজ, যাতে পিলার কম থাকলেও তার বিশাল দৈর্ঘ্যে কোন সমস্যা হবে না এবং সে বিশাল ভার বহন করতেও সক্ষম হবে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত সেতু সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা চলতে থাকে।

অবশেষে ১৯৩৬ সালে হাওড়া ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু পৃথিবী তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপের দিকে এগোচ্ছে, ফলে ইস্পাত সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের জন্য যে বিপুল পরিমাণ উচ্চমানের স্টিল প্রয়োজন ছিল, যুদ্ধের কারণে তা ইংল্যান্ড থেকে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় শিল্প – বিশেষ করে টাটা স্টিল – এই সেতু নির্মাণের কাজে এগিয়ে আসে। তারা প্রায় ২৬,৫০০ টন স্টিল সরবরাহ করে, যা হাওড়া ব্রিজের ইতিহাসে এক মাইলফলক বলে বিবেচিত হয়। যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার মধ্যেও সেতু নির্মাণের কাজ থামেনি। কলকাতা সেই সময় জাপানি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হলেও ব্রিজের নির্মাণ একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি।

রবীন্দ্র সেতুর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল, এটি নির্মিত হয়েছে কোনো নাট-বল্টু ছাড়া। পুরো কাঠামো জোড়া দেওয়া হয়েছে রিভেটিং প্রযুক্তিতে, যা স্থায়ীভাবে ইস্পাতকে যুক্ত রাখে এবং কাঠামকে অত্যন্ত টেকসই করে। বিশাল টাওয়ার দু’টি, গভীর অ্যাঙ্কর ব্লক, সাসপেন্ডেড স্প্যান – সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে তৎকালীন ভারতের সর্ববৃহৎ ইস্পাত কাঠামো ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যান্টিলিভার সেতু। নদীর স্রোত, জোয়ার-ভাটা, ভারী নৌচলাচল – সমস্তকিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে এই সেতুকে দাঁড় করানো প্রকৌশলের দৃষ্টিতে এক বৃহৎ সাফল্য। ১৯৪২ সালের শেষভাগে হাওড়া ব্রিজের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় এবং ১৯৪৩ সালে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুটি হয়ে ওঠে কলকাতা ও হাওড়ার প্রধান সংযোগস্থল এবং কিছুদিনের মধ্যেই এটি দেশের অন্যতম ব্যস্ততম সেতু হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্বাধীনতার পরে সেতুর ওপর আরও চাপ বাড়তে থাকে – জনসংখ্যা, যানবাহন, শহুরে বিস্তার সবই বাড়ছিল। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুবার বড় ধরনের সংস্কার, রঙ, রিভেট পরীক্ষা, স্ট্রাকচারাল অডিট এবং আধুনিক প্রলেপ প্রয়োগ করা হয়। আজও এইচআরবিসি নিয়মিতভাবে সেতুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করে। ১৯৬৫ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণে সেতুটির নাম সরকারিভাবে “রবীন্দ্র সেতু” রাখা হয়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে এটি এখনও হাওড়া ব্রিজ নামেই অধিক পরিচিত।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় দেড় লক্ষ যান এবং পাঁচ লক্ষ পথচারী এই সেতু ব্যবহার করেন, যা সেতুটিকে আবারও ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে—বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত, সর্বাধিক ব্যবহৃত এবং সর্বাধিক অনুভূত স্থাপত্যের তালিকায় আজও এটি প্রথম সারিতেই থাকে। একসময়ের উপনিবেশিক প্রকৌশলের প্রকল্প আজ বাংলার পরিচয়, মানুষের যাতায়াতের নিত্য সঙ্গী এবং শহরের পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রবীন্দ্র সেতু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্যান্টিলিভার ব্রিজগুলির একটি। পুরো সেতুটি ‘সাসপেনশন টাইপ ক্যান্টিলিভার ব্রিজ’ হিসেবে পরিকল্পিত, যেখানে দুই প্রান্ত থেকে ক্যান্টিলিভার বাহু এগিয়ে এসে মাঝখানে একটি সাসপেন্ডেড অংশকে ধরেছে। স্টিলের প্লেট ও রিভেটের সাহায্যে সেতুর প্রতিটি অংশ জোড়া লাগানো হয়েছে, ফলে প্রতিটি সংযোগই অত্যন্ত শক্তিশালী। সেতুর মূল টাওয়ার দুটির উচ্চতা প্রায় ৮২ মিটার। এই টাওয়ার দুটি সেতুর ভার বহন করে এবং পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে। নদীর জোয়ার-ভাটার কারণে পিলারের সংখ্যা কম রাখা হয়েছিল—কারণ নদীর তলার নরম পলিমাটি ভারবহন ক্ষমতার জন্য উপযুক্ত নয়। তাই সেতুটি দুই প্রান্তে স্থাপিত বিশাল অ্যাঙ্কর ব্লকের উপর নির্ভরশীল।

সেতুটি ৭০৫ মিটার লম্বা ও ৩০ মিটার চওড়া, যার মধ্যে রয়েছে চলাচলের জন্য ছয় লেনের রাস্তা এবং দুই পাশের পায়ে চলার পথ। প্রকৌশলগত দিক থেকে এই সেতুটি তার সময়ের তুলনায় অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তিতে নির্মিত – বিশেষ করে নদীর গভীরতায় বিশাল অ্যাঙ্করিং সিস্টেম, রিভেটিং প্রযুক্তি এবং ক্যান্টিলিভার ডিজাইনের নিখুঁত ভারসাম্য সেই যুগে এক অসাধারণ উদ্ভাবন ছিল।

আজকের দিনে রবীন্দ্র সেতু শুধু একটি স্থাপত্য নয় – এটি পশ্চিমবঙ্গের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অঙ্গ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক থেকে দেড় লক্ষ যানবাহন এবং প্রায় পাঁচলক্ষ পথচারী এই সেতু ব্যবহার করে। বিশ্বের ব্যস্ততম ক্যান্টিলিভার ব্রিজ হিসেবে এটি বহু দশক ধরে রেকর্ড ধরে রেখেছে। হাওড়া স্টেশন থেকে যাত্রীদের কলকাতায় প্রবেশের প্রধান দরজা হিসেবে এই সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। হাজার মানুষের জীবিকা এই সেতুকে ঘিরে। ফেরিঘাট, দোকানপাট, পরিবহন, পর্যটন, এমনকি নদীর ধারের ক্ষুদ্র ব্যবসাও সেতুর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত। কলকাতার অর্থনীতি ও পরিবহনের নেটওয়ার্কে এটি এমনভাবে গাঁথা যে সেতুটিকে একদিনের জন্য বন্ধ করলেও শহরের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়।

জনজীবনে এর সাংস্কৃতিক প্রভাবও কম নয়। সিনেমা, সাহিত্য, আলোকচিত্রে হাওড়া ব্রিজ বারবার ফিরে এসেছে ‘চলচ্চিত্রের আইকন’ হিসাবে। বাংলা সিনেমা থেকে বলিউড – অসংখ্য চলচ্চিত্রে সেতুটিকে কেন্দ্র করে অনেক সিনেমার গল্প এগিয়েছে। কবিতা, গান, ভ্রমণকাহিনীতে বারেবারে ফিরে এসেছে হাওড়া ব্রিজ। তাই এইকথা অনায়াসেই বলা যায় যে হাওড়া ব্রিজ বাংলা সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading