ইতিহাস

উমেশচন্দ্র দত্ত

উমেশচন্দ্র দত্ত

বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসে ব্রাহ্মধর্মের একজন অন্যতম প্রচারক হিসেবে উমেশচন্দ্র দত্ত (Umesh Chandra Dutta) আজও বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম। তিনিই প্রথম হরিনাভিতে ব্রাহ্মসমাজের একটি শাখা গড়ে তোলেন। দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র সেনের পরামর্শে ও অনুপ্রেরণায় তিনি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছিলেন উমেশচন্দ্র দত্ত। কেশবচন্দ্র সেনের বিরোধিতা করে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৮৮১ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি কলকাতার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। পরবর্তীকালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক এবং সভাপতি পদে উন্নীত হন তিনি। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশের মাধ্যমেই আপামর বাঙালির কাছে তিনি খুব সহজেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিন বন্ধুর সহায়তায় কলকাতার মানিকতলায় উমেশচন্দ্র দত্ত গড়ে তোলেন মূক-বধির বিদ্যালয়। উনিশ শতকের কলকাতায় নারীশিক্ষার বিস্তারে তাঁর প্রভূত অবদান ছিল।

১৮৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার মজিলপুরে উমেশচন্দ্র দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল হরমোহন দত্ত।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

১৮৫৯ সালে ভবানীপুরের লন্ডন মিশনারী সোসাইটি ইনস্টিটিউশন থেকে উমেশচন্দ্র দত্ত প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপরে তিনি ডাক্তারি পড়ার জন্য মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও অর্থাভাবের কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। পরে ১৮৬৭ সালে প্রাইভেটে উমেশচন্দ্র দত্ত স্নাতক উত্তীর্ণ হন।

১৮৬২ সাল থেকে তিনি নানা স্কুলে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। ১৮৬৭ সালে সপরিবারে তিনি কেশবচন্দ্র সেনের প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত-আশ্রম’-এর অন্তর্ভুক্ত হন। কিশোর বয়সে তাঁর গ্রামের শিবকৃষ্ণ দত্ত গ্রামে ব্রাহ্মসমাজের বাতাবরণ বিস্তারে অনেক সাহায্য করেছিলেন। তিনি প্রত্যহ ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ পড়তেন এবং সে বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতেন। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই কিশোর উমেশচন্দ্র দত্ত ব্রাহ্মসমাজের কর্মকাণ্ড ও ভাবাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন। কিশোর বয়সেই ব্রাহ্ম আচার-অনুষ্ঠান মানার কারণে সমাজে নানাবিধ রোষের মুখে পড়তে হয় তাঁদের, কিন্তু তাঁরা সেই সময় নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন। ক্রমে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কেশবচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে এসে ১৮৫৯ সালে উমেশচন্দ্র দত্ত ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন। হরিনাভিতে পরবর্তীকালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পরে এলাকার বেশ কিছু সমমনস্ক মানুষজনের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি এবং সেখানেই ১৮৬৬ সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। হরিনাভিতে এক ব্রাহ্ম অনুরাগীর এক টুকরো জমির উপর একতলা একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানেই ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা এবং কাজকর্ম শুরু করেন উমেশচন্দ্র দত্ত। সেখানেই নিয়মিত উপাসনায় বসতেন এলাকার ব্রাহ্ম-মনস্ক মানুষজন। এই কর্মকাণ্ড চলতে চলতেই মজিলপুরের আরেক ব্রাহ্ম-অনুরাগী শিবনাথ শাস্ত্রী ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন এবং নিজের উপবীত ত্যাগ করেন। সেকালে এই ধরনের উপবীত ত্যাগ করার মত ঘটনা একেবারে বিরল ছিল। এই ঘটনার কারণে তাঁকে তাঁর বাবা বাড়ি থেকে বহিষ্কার করায়, এই ঘটনা জনসমক্ষে প্রচারিত হয়ে যায়। এর পর থেকে জনরোষ আরও বাড়তে থাকে। যে সকল ব্যক্তি উপাসনায় যোগ দিতেন নিয়মিত তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই তাঁদের সন্তানদের উপর অত্যাচার করা শুরু করেন যাতে তাঁরা কোনওভাবে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত না হয়। সেই সময় শিবনাথ শাস্ত্রীর এই উপবীত ত্যাগ করার ঘটনার অনুষঙ্গে স্কুলে কোনও ব্রাহ্ম শিক্ষক পড়াতে পারবেন না এমত অভিযোগ উঠেছিল। শিবনাথের মামা হরিনাভি স্কুলের অধ্যক্ষ দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের কাছে সাধারণ মানুষেরা এই অভিযোগ লিখিত জমা দেন। উমেশচন্দ্র দত্ত এই বিষয়টি জানতে পেরে কিছুদিনের মধ্যেই নিজে থেকে স্কুলের শিক্ষকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। যদিও দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ব্রাহ্মদের ব্যাপারে যারপরনাই সহানুভূতিশীল ছিলেন, কিন্তু নিজে কখনও তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেননি। উমেশচন্দ্র দত্ত চাকরি ছেড়ে দিলেও ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করেননি। প্রত্যেক সপ্তাহেই তিনি উপাসনায় যোগ দিতেন। সাধারণ মানুষ ক্রুদ্ধ হয়ে গ্রামে যাতে কোনওভাবেই উপাসনা না হয়, সেজন্য জমিদারের শরণাপন্ন হয় এবং কালীপূজার ঠিক আগে আগে ১৫০-২০০ জনের একটি দল নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের ঘরটি ঘিরে ফেলেন জমিদার। লাঠিয়ালরা ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে দেয় এবং এক এক করে প্রায় সকলকেই তুলে মাঠে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। রক্তাক্ত আহত মানুষেরা যে যার মত পালিয়ে যান প্রাণ বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সেদিন উমেশচন্দ্রের গায়ে কেউ হাত দেননি। তিনি থানায় গেলে সেখানে অভিযোগ দায়ের করার জন্য অফিসার ছিলেন না, কেবলমাত্র একজন কনস্টেবল ছিলেন। এই ব্যবস্থাও সেই গ্রামের জমিদারই করে রেখেছিলেন। পরদিন সকালে উমেশচন্দ্র আলিপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনাটি সবিস্তারে বলেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ লিখতে এবং এর প্রতিকার করতে সম্মত হন।

এরপরে কলুটোলায় কেশবচন্দ্র সেনের বাসভবনে গিয়ে দেখা করেন উমেশচন্দ্র দত্ত এবং সবিস্তারে হরিনাভির এই ঘটিনাটি তাঁর কাছে ব্যক্ত করেন। কেশবচন্দ্র তাঁকে পরামর্শ দেন তিনি যেন পরের সপ্তাহেই হরিনাভিতে আরও লোকজন নিয়ে গিয়ে পুনরায় উপাসনার বন্দোবস্ত করেন। কলকাতা থেকে এক দল ব্রাহ্মদের নিয়ে উমেশচন্দ্র যখন হরিনাভিতে পৌঁছান, তিনি দেখেন ব্রাহ্মসমাজের ঘরে সেখানকার মানুষজন একটি কালীমূর্তি ও একটি শালগ্রামশিলা স্থাপন করেছে এবং উচ্চস্বরে ঢাক-ঢোল বাজানো হচ্ছে। সেদিন ব্রাহ্ম অনুরাগীর দলকে নিয়ে উমেশচন্দ্র অন্যত্র এক অনুরাগীর বাড়িতে উপাসনা করেন এবং সেখানে খাওয়া-দাওয়ার পরে তাঁরা যখন সমাজে ফিরে আসেন, লক্ষ্য করেন পুলিশের তাড়া খেয়ে সমাজের ঘর থেকে সকলে পালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সেখানকার কালীমূর্তি আর শালগ্রামশিলা তুলে ফেলে দিয়েছে। পরে জানা যায় যে ম্যাজিস্ট্রেট সেই পুলিশদের পাঠিয়েছিলেন এবং পুলিশেরা উমেশচন্দ্রকে আশ্বাস দেন যে এরপর থেকে তিনি নিজের স্বাধীনতা অনুযায়ী ধর্মাচরণ করতে পারবেন। তাছাড়া তিনি যদি প্রতি বুধবার এখানে এসে উপাসনা আয়োজন করেন এবং সেই সময় কোনও অসুবিধে হয়, তাহলে পুলিশ সর্বদা তাঁদের সহায়তা করবে। ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় আদালতে সমাজ পরিচালনায় বিঘ্ন-সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তিনি এবং এর ফলে জমিদার তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এর বিনিময়ে প্রধান সড়কের একেবারে পাশে বেশ অনেকটা জমি নিয়ে হরিনাভি ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তুলতে সমর্থ হন তিনি। একাজে যদিও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অনেকাংশে সহায়তা করেছিলেন।

১৮৭৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবেও বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন তিনি। ১৮৭৯ সালে সিটি স্কুল প্রতিষ্ঠার পরে উমেশচন্দ্র দত্ত সেখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৮১ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। যামিনীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীনাথ সিংহ এবং মোহিনীমোহন মজুমদার নামে তিন বন্ধুর সঙ্গে একত্রে ১৮৯৩ সালে মানিকতলায় উমেশচন্দ্র দত্ত গড়ে তোলেন মূক-বধির বিদ্যালয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের সদস্যও ছিলেন তিনি।

নারীশিক্ষার বিস্তারেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’র সম্পাদক ছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘ধর্মসাধন’ ও ‘ভারত সংস্কারক’ এই দুটি পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৮৬৩ সালে উমেশচন্দ্র দত্ত বিবাহিত মহিলাদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে কয়েকজন ব্রাহ্মনেতার সহযোগিতায় গড়ে তোলেন ‘বামাবোধিনী সভা’। এই সভা থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। কলকাতার সিমুলিয়া অঞ্চলে রঘুনাথ স্ট্রিটে এই সভার কার্যালয় ছিল। ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’টি ‘ভাগ’, ‘খণ্ড’ ও ‘কল্প’ এই তিনটি বিভাগে বিভক্ত আকারে প্রকাশিত হত। তাঁর লেখা দুটি অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘বামা রচনাবলী’ (১৮৭২) এবং ‘স্ত্রীলোকদিগের বিদ্যার আবশ্যিকতা’ (১৮৭২)। তাঁর স্মৃতিতে ও তাঁর প্রতি সম্মানার্থে উমেশচন্দ্র কলেজ স্থাপিত হয় ১৯৬১ সালে।

১৯০৭ সালের ১৯ জুন ৬৭ বছর বয়সে উমেশচন্দ্র দত্তের মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. শ্রীসুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, 'সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা ৬৪
  2. https://en.wikipedia-on-ipfs.org/
  3. https://amritmahotsav.nic.in/
  4. https://www.veethi.com/
  5. https://abasar.net/
  6. https://www.ebanglalibrary.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন