ইতিহাস

কেশবচন্দ্র সেন

কেশবচন্দ্র সেন (Keshub Chandra Sen) ঊনিশ শতকের বাংলা নবজাগরনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি একজন ব্রাহ্ম নেতা ও ধর্মসংস্কারকই কেবল ছিলেন না, জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবোধ উন্মেষে তিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৮৩৮ সালের ১৯ নভেম্বর কলকাতার এক বৈষ্ণব কায়স্থ পরিবারে কেশবচন্দ্রের জন্ম হয়। তাঁর ঠাকুরদা রামকমল সেন ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সম্পাদক। বাবা প্যারীমোহন সেন কেশবচন্দ্রের শৈশবেই মারা যান। কেশবচন্দ্রের মা সরলা সুন্দরী দেবীর বালক কেশবচন্দ্রের চরিত্র গঠনে অপরিসীম প্রভাব ছিল।

কেশবচন্দ্র ছোটবেলায় স্থানীয় পাঠশালা ও পরবর্তীকালে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন। তিনি হিন্দু কলেজের ছাত্র হওয়ার সুবাদে তুলে ছোটবেলা থেকেই জেমস লং, চার্লস ডাল প্রভৃতি মিশনারি প্রচারকদের সংস্পর্শে আসেন ও তাঁর মনে ভক্তিবাদী ঈশ্বর চিন্তার এক গভীর শিকড় বিকাশ লাভ করে।

কেশবচন্দ্র ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এছাড়াও তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন। বেঙ্গল ব্যাঙ্কের করণিক হিসেবে স্বল্প সময়ের জন্য নিযুক্ত ছিলেন। ক্রমেই তাঁর মনে ক্রমশই ধর্মচিন্তা ও ধর্ম সংগঠনের ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ১৮৫৭ সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন। ব্রাহ্মসমাজের চিন্তাধারার বিকাশকে সামনে রেখে কেশবচন্দ্র সেনের কর্মপ্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে। এই সময়ে থেকেই কেশবচন্দ্র ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ‘ইন্ডিয়ান মিরর’-এ নিজের লেখা প্রকাশ করতে থাকেন। ধর্মতাত্ত্বিক থিয়োরি পার্কারের চিন্তাধারা এই সময়ে কেশবচন্দ্র সেনের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, এবং খ্রিষ্টান মিশনারী ও নিয়মতান্ত্রিক ধর্মাচরণের মধ্যে দিয়ে ব্রাহ্মসমাজকে এক সীমিত গন্ডি থেকে বের করে মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করাই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যান জ্ঞান।

১৮৬২সালের ১৩ এপ্রিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কেশবচন্দ্র সেনকে ব্রাহ্মসমাজের আচার্য রূপে নিযুক্ত করেন এবং উপাধি দেন ‘ব্রহ্মানন্দ’। যদিও ব্রাহ্মসমাজের অনেকেরই এই ‘অ-ব্রাহ্মণ’ কেশবচন্দ্রকে আচার্য পদে বরণ করায় আপত্তি ছিল। ফলে প্রতিবাদ স্বরূপ তাঁরা এই ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করেন।

কিন্তু অচিরেই কেশবচন্দ্র সেনের সাথে দেবেন্দ্রনাথের মতান্তর দেখা দেয়। মহর্ষি ছিলেন উপনিষদের ভাবধারায় গভীর ভাবে বিশ্বাসী। ব্রাহ্মধর্ম তাঁর কাছে ছিল হিন্দুধর্মেরই এক বিশুদ্ধ রূপ। তাই বর্ণপ্রথা, জাতিভেদ প্রথা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর সনাতনপন্থী দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে কেশবচন্দ্র সেনের প্রগতিশীল ও খ্রিস্টীয় আদর্শের সনাতনী ভাবধারার সংঘাত ঘটে। ফলত, আদি ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করে কেশবচন্দ্র সেন ১৮৬৮সালে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’প্রতিষ্ঠা করেন।

এই সময় থেকেই কেশবচন্দ্র বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে নিহিত ভক্তি ও মিলনের বিষয়টি ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের প্রধান দিক হিসাবে তুলে ধরেন। ‘নব্য’ নামে পরিচিত এই নতুন ধর্মনীতিতে খ্রিস্টীয় প্রভাবে পাপ স্বীকার, বিলাসিতা বর্জনের আদর্শ যেমন ছিল, তেমনই ছিল হিন্দু ঐতিহ্যের কিছু সারাৎসার, যথা হোম আরতি, তীর্থযাত্রা প্রভৃতি।

কেশবচন্দ্র সেনের ধর্মপ্রচারের অন্যতম অভিনব ও জনপ্রিয় পদ্ধতি ছিল কীর্তন। কলকাতা ছাড়িয়ে বাংলার মফস্বলে ও গ্রামে এর ফলে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৭০ সালে কেশবচন্দ্র ধর্মপ্রচার ও ধর্মালোচনার লক্ষ্যে ইংল্যান্ড যান। সেখান থেকে ফিরেই তিনি নানাধরনের সামাজিক সংস্কার কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন যার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল চোদ্দ বছরের কম বয়সী বালিকাদের বিবাহ নিষিদ্ধ করা। এছাড়াও ইংল্যান্ডের পরিবারগুলির শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা ও ধর্মচিন্তার অনুপ্রেরণায় কেশবচন্দ্র সমধর্মী পরিবারদের একত্রে থাকবার জন্য ‘ভারতআশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীও এই যৌথ পরিবারে অংশ নিয়েছিলেন।

কেশবচন্দ্র সেনের সাথে বিয়ে হয় জগন্মোহিনী দেবীর। পরবর্তীকালে কেশবচন্দ্রের পারিবারিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মসমাজে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়। ১৮৭৮ সালে কেশবচন্দ্র তাঁর নাবালক কন্যা সুনীতির বিবাহ দেন কোচবিহারের নাবালক যুবরাজের সঙ্গে। এবং এই বিবাহ মূলত রাজপরিবারের সনাতন রীতিতেই ঘটে, শুধু পৌত্তলিকতার অংশটুকু বাদ দিয়ে। কেশবচন্দ্র সেন দ্বারা ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শের এই চরম লঙ্ঘন ব্রাহ্মযুবকদের অত্যন্ত হ্মুব্ধ করে তুলেছিল। প্রতি বাদে কোনো ফল না হওয়ায় এক বিরাট অংশের সদস্য ব্রাহ্মসমাজ থেকে পদত্যাগ করে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলে। এই ঘটনার পরে কেশবচন্দ্র সেন অল্পদিনেই জীবিত ছিলেন।

জীবনের শেষ পর্বে তাঁর ধর্মভাবনায় এক বিরাট বদল দেখা যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে কেশবচন্দ্র সেনের যোগাযোগ ঘটে, এবং রামকৃষ্ণের ভক্তিবাদ তাঁকে বিপুল ভাবে আকৃষ্ট করে। রামকৃষ্ণ বাণী নির্মিত জনমানসে ছড়িয়ে দিতেও উদ্যোগী হন কেশবচন্দ্র। কেশবচন্দ্র তাঁর কর্মময় স্বল্প জীবনে তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তাধারাকে বারংবার পরিবর্তিত করেছেন। একদা ধর্মকে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখতে শুরু করেছিলেন যে কেশবচন্দ্র, তিনিই ঔপনিষদিক ব্রাহ্মধর্মের মধ্যে খৃষ্টীয় ও বৈষ্ণব মতাদর্শের প্রভাব আনলেন এবং শেষে মাতৃশক্তির পূজারী হলেন। যিনি গণতন্ত্র ও সমদর্শিতার পক্ষে দাঁড়িয়ে আদি ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করেছিলেন,তিনিই নিজের হ্মেত্রে গুরুভার ও ব্যক্তি কর্তৃত্বকে প্রশ্রয় দিলেন। বাল্যবিবাহের প্রবল বিরোধী হয়েও ইংরেজ সরকারের সুবিধার্থে নিজের কন্যার বাল্যবিবাহ দিলেন। এত সব বৈপরীত্য সত্ত্বেও কেশবচন্দ্র সেন সংস্কারক হিসেবে বাংলার সামাজিক জীবনে যে বিরাট অবদান রেখেছেন তা কোনভাবেই অগ্রাহ্য করার নয়।

১৮৮৩ সালে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সিমলা থেকে কলকাতায় ফিরে কেশবচন্দ্র সেন তাঁর বাড়িতে ‘নব দেবালয়’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেন। ১৮৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে যখন তা সমাপ্ত হয়, তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। তাঁকে বহন করে এনে দেখানো হয় ভবনটি। ৮ জানুয়ারি ১৮৮৪ তে কেশবচন্দ্র সেনের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন