সববাংলায়

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস | বেদব্যাস

বিভাগঃ , , ,

ভারতের দুই প্রাচীন মহাকাব্যের অন্যতম মহাভারত। এর রচয়িতা হিসেবে প্রচলিত নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস (Krishna Dvaipayana Vyasa)।  তিনি শুধু মহাভারতের রচয়িতা নন, বৈদিক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলকও ছিলেন। বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করার কৃতিত্ব তাঁর নামে প্রচলিত। এছাড়া অষ্টাদশ মহাপুরাণ ও ব্রহ্মসূত্রও তাঁর নামে যুক্ত। মহাভারত মহাকাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে পাওয়া যায় তাঁকে আর তার মাধ্যমেই তাঁর জীবনের কিছু কিছু ঘটনা জানতে পারা যায়। বিভিন্ন পুরাণেও ব্যাসের জীবন এবং পরিবারের কিছু কিছু কথা রয়েছে। তবে ব্যাসের সঙ্গে গণেশ, ব্রহ্মা ইত্যাদি নানা পৌরাণিক চরিত্রের সংযোগের কাহিনিও যেহেতু মিশে রয়েছে তাই ব্যাসের জীবনের অনেকখানিই যে কিংবদন্তিতে ভরা তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

মহাভারতকার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের জন্মকাল নিয়ে সংশয় রয়েছে। আসলে মহাভারত রচনার সময়কে মাথায় রেখে যদি অনুমানের ওপর নির্ভর করে একটি জন্ম সময় নির্ধারণ করবার চেষ্টা করা হয়, তা হলেও খুব সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া মুশকিল। আসলে কয়েকটি নির্দিষ্ট বছরের গণ্ডির মধ্যে মহাভারত রচনা সমাপ্ত হয়নি এবং মহাভারতের রচনাকাল নিয়েও রয়েছে নানা মুনির নানা মত। কোন কোন গবেষকে মনে করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের কিছু পরে মহাভারত রচিত হয়েছিল। কেউ আবার বলেন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে এই মহাকাব্য রচিত হয়, তবে খ্রিস্টের জন্মের পরেও তার মধ্যে কিছু কিছু উপাদান সংযোজিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র আবার মনে করেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কাল খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩০ বা ১৪৩০। অতএব মহাভারত তারপরেই রচিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের মতো অনেকেই বলেছেন, মহাভারত কোন একজন লেখকের রচনাই নয়, এটি বহুকাল ধরে বিভিন্ন মানুষের হাতে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একটি মহাকাব্য। অতএব এত দীর্ঘ ও বিস্তৃত কালখণ্ডের মধ্যে বেদব্যাসের জন্মকাল নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

কারও কারও মতে, বর্তমান তানাহি জেলার দামৌলিতে জন্মেছিলেন, যা এখন নেপালে অবস্থিত। যে গুহায় বসে ব্যাসদেব মহাভারত রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়, তাও নেপালে রয়েছে।

একমাত্র মহাভারতের মধ্যেই ব্যাসের একটা জন্মবৃত্তান্ত পাওয়া যায়। সেই বৃত্তান্ত অনুসারে, সত্যবতী নামে এক সুন্দরী রমনী ছিলেন কৈবর্ত বংশের মেয়ে। পিতাকে সাহায্যের জন্য সেই সত্যবতী মানুষকে নদী পারাপার করে দেওয়ার কাজ করতেন। একদিন পরাশর মুনিকে যমুনা নদী পার করে দিচ্ছিলেন তিনি। সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ পরাশর মুনি মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন এবং তাঁর গর্ভে নিজের উত্তরাধিকারীর জন্ম দিতে চান। সত্যবতী নিজের সতীত্ব এবং সমাজের ভয়ে প্রথমে যখন রাজি হতে অস্বীকার করেন, তখন পরাশর মুনি  যমুনার এক নির্জন দ্বীপে লতাগুল্মের আড়ালে কুয়াশার চাদরে ঢেকে গোপন স্থান তৈরি করেন। সেই গোপন স্থানে পরাশর মুনি এবং সত্যবতীর মিলনেই ব্যাসের জন্ম হয়। তাঁদের মিলনস্থানটি অন্ধকার হওয়ায় ব্যাসের গাত্রবর্ণ হয়েছিল শ্যামবর্ণ এবং যেহেতু দ্বীপে জন্ম হয়েছিল তাঁর, সেই কারণেই ব্যাসের নাম হয়েছিল কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন।

সত্যবতীর সঙ্গে সেই গোপন মিলনের পর পরাশর মুনি সত্যবতীর কুমারীত্ব ফিরিয়ে দেন এবং জেলের মেয়ে বলে সত্যবতীর গায়ে যে মাছের আঁশটে গন্ধ ছিল তা দূর করে তাঁকে সুগন্ধ দান করেন। পরাশর তারপর পুত্র ব্যাসকে নিয়ে চলে যান। এরপর সত্যবতীর বিবাহ হয় মহারাজা শান্তনুর সঙ্গে। সত্যবতী ও শান্তনুর দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য দুজনেই নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায়। বিচিত্রবীর্য রেখে যান তাঁর দুই বিধবা স্ত্রী অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে। সত্যবতী চেয়েছিলেন তাঁর সৎপুত্র ভীষ্ম সেই দুই বিধবা রমণীকে যেন বিবাহ করেন, কিন্তু ভীষ্ম ব্রহ্মচর্যের প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন বলে সেই বিবাহ করতে রাজি হননি। সেই সময় সত্যবতী নিজের গোপন সেই সম্পর্ক ও তাঁর পুত্র ব্যাসের কথা প্রকাশ করেন এবং অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে ব্যাসের ঔরসে সন্তানের জন্মদানের পরিকল্পনা করেন। এই সময়েই নাকি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস বেদ সংকলন করেছিলেন।

মাসের পর মাস অরণ্যে তপস্যা করে কাটানোর ফলে ব্যাসের রূপ হয়ে গিয়েছিল আলুথালু এবং কুৎসিত। অম্বিকা ব্যাসের সেই বীভৎস রূপ দেখে মিলনের সময়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলেন, সেই কারণে তাঁদের মিলনে জন্ম নেওয়া ধৃতরাষ্ট্র হয়েছিলেন অন্ধ। এই ধৃতরাষ্ট্রই ছিলেন কৌরবদের পিতা। অন্যদিকে অম্বালিকা মিলনের সময় ব্যাসের রূপ দেখে ভয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন তাই তাঁদের মিলনে জন্ম হয় ফ্যাকাশে, দুর্বল এক সন্তানের, যার নাম পাণ্ডু। পাণ্ডুর পাঁচ পুত্রই পাণ্ডব নামে পরিচিত। যাই হোক, উক্ত দুই সন্তানের অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে ব্যাসকে অনুরোধ করেন যে, সে যেন আবার অম্বিকার সঙ্গে দেখা করে আরেকটি পুত্রের জন্ম দেয়। অম্বিকা এই কথা শুনে ভয়ে নিজে ব্যাসের কাছে না গিয়ে তাঁর এক দাসীকে পাঠিয়ে দেন। সেই দাসী ছিলেন সুস্থ, শান্ত ও সুসংগঠিত স্বভাবের। সেই দাসীর সঙ্গে ব্যাসের মিলনে যে স্বাভাবিক এক সন্তানের জন্ম হয়, তাঁর নাম বিদুর।

অতএব পাণ্ডব ও কৌরবরা আসলে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসেরই রক্ত বহন করছেন।

ব্যাসের আরও এক পুত্র ছিল তাঁর নাম শুক। এই শুকের জন্মবৃত্তান্ত এবং নামকরণ নিয়েও দুটি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। স্কন্দপুরাণ অনুসারে ব্যাস জাবালি ঋষির কন্যা বটিকা ওরফে পিঞ্জলাকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁদের যে সন্তান জন্মায় সে যা শুনত তাই তোতাপাখির মতো হুবুহু অনুকরণ করে বলত। তোতার মত এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই সেই সন্তানের নাম শুক হয়েছিল। আবার দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে, ঘৃতচী নামের এক অপ্সরা এক সুন্দর তোতাপাখির রূপে ব্যাসের সামনে এসে তাঁর যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। ফলে ব্যাসের বীর্য নিঃসারিত হয়ে কয়েকটি দন্ডে পতিত হলে একটি সন্তানের জন্ম হয়। এই সন্তানের পিছনে সেই তোতাপাখির ভূমিকা ছিল বলেই সন্তানটির নাম হয়েছিল শুক।

ব্যাসদেবকে ভগবান বিষ্ণুর অংশ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কথিত আছে, তিনি দ্বাপর যুগে পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং মহাবিশ্বের সমস্ত বৈদিক জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করে সকলের জন্য উপলব্ধ করতে চেয়েছিলেন। ব্যাসদেবের আগে বৈদিক জ্ঞান কেবলমাত্র কথ্যরূপেই বিদ্যমান ছিল। বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য বিষ্ণু ব্যাসের ব্যক্তিত্ব ধরে এসে বারংবার হাজির হন। প্রতি দ্বাপর যুগেই মূলত এটি ঘটে থাকে।  তাঁকে বেদব্যাস বলা হয়, তার কারণ, তিনি বেদের মূল সংস্করণকে চারটি ভাগে (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ) ভাগ করবার কাজ করেছিলেন। এই বিভাজনের ফলেই বেদ মানুষের পক্ষে বুঝতে পারা সহজ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য বেদ বিভক্তিকরণের কাজ কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস-ই করেছিলেন কিনা সে নিয়ে কিছু পণ্ডিতের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ব্যাস তাঁর চারজন শিষ্য যথা, পৈলা, জৈমিনি, বৈশম্পায়ন এবং সুমন্তু, প্রত্যেককে একটি করে বেদ ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পৈলাকে ঋগ্বেদ, জৈমিনিকে সামবেদ, বৈশম্পায়নকে যজুর্বেদ এবং সুমন্তুকে অথর্ববেদের দায়িত্ব দেন তিনি।

হিন্দুদের যে অষ্টাদশ মহাপুরাণ, সেগুলির রচয়িতাও মনে করা হয় ব্যাসদেবকেই। বৈদিক শিক্ষার ওপরে অনেক রচনার পরেও সন্তুষ্ট হননি তিনি। নারদ তখন তাঁকে ভাগবত পুরাণ রচনা করার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন। তখনই ভাগবত পুরাণ, যা শ্রীমদ্ভাগবত নামে পরিচিত, তা রচনা করেন ব্যাসদেব। এছাড়াও ব্রহ্মসূত্র বদরায়ণ নামে ব্যাস দ্বারাই লিখিত। আসলে ব্যাস যে দ্বীপে জন্মেছিলেন তা বদরী গাছে আবৃত ছিল বলেই হয়তো ব্যাসের আরেক নাম হয়েছিল বদরায়ণ।

যে মহাভারত রচনার জন্য কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস সুপরিচিত, তা রচনায় সহায়তার জন্য ব্রহ্মার পরামর্শে তিনি গণেশকে অনুরোধ করেন। গণেশ সেক্ষেত্রে একটি শর্ত দেন যে, ব্যাস একটুও না থেমে বিরামহীনভাবে একের পর এক শ্লোক বলে যাবেন। তখন ব্যাসদেবও পাল্টা শর্ত দেন যে, কোন শ্লোক না বুঝে গণেশ লিখতে পারবেন না। উভয়েই রাজি হন শর্তে এবং একটি শ্লোক বুঝতে গণেশ যে সময় নিতেন, সেই সময়টুকুতেই ব্যাস তাঁর পরবর্তী শ্লোকটি তৈরি করে ফেলতেন৷ তবে এই গণেশের সাহায্যে মহাভারত রচনার ঘটনাটি নিতান্তই পৌরাণিক এক কিংবদন্তির মতো। তবে গণপতি বলতে প্রাচীনকালে প্রজাতন্ত্রের যিনি প্রধান তাঁকে বোঝাত। প্রাচীন ভারতে, রাজা বা রাজাদের দ্বারা শাসিত রাজ্যের পাশাপাশি নির্বাচিত প্রধান বা গণপতিদের দ্বারা শাসিত প্রজাতন্ত্র ছিল। কম্বোজ ছিল একটি প্রজাতন্ত্র এবং দ্বারকা রাজ্যে একটি প্রজাতন্ত্রী শাসন ছিল। গণপতি, যিনি মহাভারত লিখেছিলেন, তিনি সম্ভবত এই প্রজাতন্ত্রের একজন প্রধান ছিলেন, এমনটাও হতে পারে।

বৌদ্ধ জাতকের দুটি গল্পেও কানহা-দীপায়ন নামে ব্যাসদেবের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আবার দশম গ্রন্থের অন্যতম রচনা ‘ব্রহ্ম অবতারে’ গুরু গোবিন্দ সিং ব্যাসকে ব্রহ্মার অবতার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আবার ব্যাসকে যোগ-ভাষ্যের রচয়িতা হিসেবেও মনে করেন কেউ কেউ, কিন্তু এই দাবি সম্পূর্ণ অমূলক, কারণ পতঞ্জলির এই যোগ সূত্রের ভাষ্য অনেক পরের।

কিংবদন্তি, ইতিহাস, পুরাণ ইত্যাদিতে মিলেমিশে এই কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস চরিত্রটি প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছেন, যাঁর জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের সঠিক বৃত্তান্ত পাওয়া মুশকিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস-কৃত মহাভারত, সারানুবাদ : রাজশেখর বসু, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স, ১৩৬৭
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://krishnasmercy.com/
  4. https://www.iloveindia.com/
  5. https://mahabharata.fandom.com/
  6. https://www.newworldencyclopedia.org/
  7. https://manavata.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading