দিমিত্রি মেন্ডেলিভ

দিমিত্রি মেন্ডেলিভ

রাশিয়ান রসায়নবিদ এবং উদ্ভাবক দিমিত্রি মেন্ডেলিভ (Dmitri Mendeleev) পর্যায়সূত্র এবং প্রকৃতিতে প্রাপ্ত প্রায় সকল মৌলের একটি সুসজ্জিত পর্যায় সারণী নির্মাণের জন্য বিখ্যাত। কিছু পরিচিত মৌলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বদল ঘটাতে এবং ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক ওজন সম্পর্কে সঠিক নিদান দেওয়ার জন্যেও এই পর্যায় সারণী নির্মাণ করেছিলেন তিনি। দেড় শতাব্দী আগেই মেন্ডেলিভ তাঁর এই পর্যায় সারণীর প্রথম খসড়া প্রকাশ করেছিলেন। তাছাড়া এই সারণী তৈরির জন্য তখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত সকল মৌলের সংকেত লিখেছিলেন তিনি এবং তাদের পারমাণবিক গুরুত্বের ক্রমানুসারে এই সারণীতে বিন্যস্ত করেছিলেন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। বিশ্বের রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর এই আবিষ্কার এক যুগান্তকারী ঘটনা। শুধু তাই নয়, গ্যালিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও জার্মেনিয়াম নামে তিনটি মৌলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ভবিষ্যৎবাণী দিয়েছিলেন মেন্ডেলিভ যা তখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃতও হয়নি। তাঁর পর্যায় সারণী প্রণয়নের মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই সেই তিনটি মৌল আবিষ্কৃত হয়।

১৮৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সাইবেরিয়ার তবোলস্কের নিকটস্থ ভার্খনি আরেমজেনি গ্রামে দিমিত্রি মেন্ডেলিভের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ইভান পাভলোভিচ মেন্ডেলিভ এবং মায়ের নাম ছিল মারিয়া দিমিত্রিভ্‌না মেন্ডেলিভা। তাঁর বাবা ইভান পেশায় একজন বিদ্যালয় অধ্যক্ষ ছিলেন এবং তাম্বোভ ও সারাতোভের আখড়ায় তিনি চারুকলা, রাজনীতি ও দর্শন বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন। মেন্ডেলিভের ঠাকুরদাদা পাভেল ম্যাক্সিমোভিচ সোকোলভ একজন রক্ষণশীল পুরোহিত ছিলেন এবং সেকালের নিয়মানুসারে থিওলজিক্যাল সেমিনারিতে তাঁদের পরিবারের পদবি হিসেবে স্থানীয় জমিদারের নামানুসারে ‘মেন্ডেলিভ’ উপাধিটি জুড়ে যায়। তাঁর মা মারিয়া কর্নিলিয়েভা তবোলস্কের একজন বিখ্যাত বণিক পরিবারের কন্যা ছিলেন যারা প্রথম সাইবেরিয়ান প্রিন্টিং হাউজ তৈরি করে। ইভান ও মারিয়ার ১৭টি সন্তানের মধ্যে মেন্ডেলিভ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। যদিও বাপ্তিস্ম নেওয়ার আগেই তিন সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল। মেন্ডেলিভের জন্মের পরে পরেই তাঁর বাবা ইভান অসুস্থতার কারণে ক্রমেই অন্ধ হয়ে যান এবং বাধ্য হয়ে তাঁকে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরিটি ছাড়তে হয়। ফলে তাঁদের পরিবার দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। ইভান সেকালে কোনও ভাতাও পেতেন না চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নেওয়ার পরে। ফলে তাঁর মা মারিয়া বাধ্য হয়েই তাঁদের পারিবারিক কাচের কারখানাটি চালু করেন। আগে মারিয়ার ভাইই এই কারখানাটি চালাতেন,কিন্তু বহু বছর তা বন্ধ হয়ে পড়েছিল। ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত এভাবেই মারিয়া তাঁর সংসার প্রতিপালন করেছিলেন। কিন্তু ঐ বছরই মেন্ডেলিভের বাবা ইভান মারা যান এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁদের কাচের কারখানাটিও অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়ে যায়। ফলে আবার এক অনিশ্চিত দারিদ্র্য তাঁদের সংসারে নেমে আসে। এই সময় তাঁর মা মেন্ডেলিভ ও তাঁর এক ভাইকে মস্কোতে নিজের ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর ভাই সেই দুই সন্তানের দায়িত্ব নেবেন, সাধ্যমতো দেখাশোনা করবেন এবং মেন্ডেলিভকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু তা আদতে হয় না। ১৮৬২ সালের ১৭ এপ্রিল ফিওজা নিকিতিখনা লেশ্চেভাকে বিবাহ করেন মেন্ডেলিভ।

১৮৪৯ সালে মেন্ডেলিভকে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার জন্য সাইবেরিয়া থেকে মস্কো চলে এসেছিলেন তাঁরা, কিন্তু মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় মেন্ডেলিভকে ভর্তি নিতে চায়নি। ফলে তাঁরা চলে আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে এবং সেখানে মেইন পেডাগজিক্যাল ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। ক্রমে ১৮৫০ তবোলস্কের আখড়ায় মেন্ডেলিভ ভর্তি হয়ে যান। এখানেই একসময় তাঁর বাবা অধ্যাপনা করতেন। তবোলস্কের আখড়াতেই প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। সেখানে জনৈক অধ্যাপক আলেকজান্ডার ভ্রোসক্রেসেন্সকির (Alexanadar Vroskresensky) অনুপ্রেরণায় রসায়নশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন মেন্ডেলিভ। ১৮৫৫ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। স্নাতক স্তরে তাঁর গবেষণা সন্দর্ভের বিষয় ছিল ‘আইসোমর্ফিজম এবং ভৌত অবস্থা ও রাসায়নিক উপাদানের মধ্যেকার সম্পর্ক’। এই সন্দর্ভটি সেকালের বিখ্যাত একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপরে বিজ্ঞান ও রসায়ন সংক্রান্ত আরও কয়েকটি জার্নালে তাঁর লেখাপত্র প্রকাশিত হতে থাকে, কিন্তু তখনও পর্যন্ত স্থায়ী উপার্জনের ব্যবস্থা হয়নি মেন্ডেলিভের। ঐ সময়েই তাঁর মা ও বোনের মৃত্যু হয়। তিনি নিজেও যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন। ফলে তাঁকে বাধ্য হয়েই পরিবেশ পরিবর্তনের জন্য ক্রিমিয়ায় চলে যেতে হয়।

ক্রিমিয়ায় প্রায় এক বছর অধ্যাপনা করার পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। ক্রিমিয়ার ফার্স্ট সিম্ফারোপোল জিমন্যাসিয়ামে অধ্যাপনা করছিলেন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। পরে আবার সুস্থ শরীরে সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে আসেন তিনি। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ সালের মধ্যে তরলের কৈশিকতা নিয়ে গবেষণা করেন এবং হাইডেলবার্গে স্পেক্ট্রোস্কোপ বিষয়েও গবেষণা করেন তিনি। ১৮৬১ সালে তিনি ‘অর্গ্যানিক কেমিস্ট্রি’ নামে একটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। এই বই লেখার জন্যেই পিটার্সবার্গ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে দিমিত্রি মেন্ডেলিভ ডেমিডোভ পুরস্কারে ভূষিত হন। তারপর ১৮৬৪ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে দিমিত্রি মেন্ডেলিভ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং তার পরের বছর ১৮৬৫-তেই তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও অধ্যাপনা শুরু করেন। ঐ বছর তাঁর একটি গবেষণা সন্দর্ভের জন্য ডক্টর অফ সায়েন্স উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। সেই সন্দর্ভটির নাম ছিল ‘অন দ্য কম্বিনেশনস অফ ওয়াটার উইথ অ্যালকোহল’। ১৮৬৭ সালে অজৈব রসায়ন বিষয়ে পড়াতে শুরু করেন তিনি এবং ক্রমে ১৮৭১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর হাত ধরেই রসায়নের গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৮৬৩ সালে তখনও পর্যন্ত মোট ৫৬টি মৌল আবিষ্কৃত হয়েছে, ১৮৬৫ সালে নিউল্যান্ডের অষ্টক সূত্রের মাধ্যমে মৌলগুলির নির্দিষ্ট পারমাণবিক গুরুত্বের বিচারে পর্যায়ক্রমিকতা ধর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৬৪ সালে আরেক রসায়নবিদ লোথার মেয়ার ২৮টি মৌলকে তাঁদের যোজ্যতার ক্রমানুসারে সজ্জিত করে একটি পর্যায় সারণী প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। এই সময় ১৮৬৭ সালে দিমিত্রি মেন্ডেলিভ ‘প্রিন্সিপলস অফ কেমিস্ট্রি’ নামে আরেকটি পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ১৮৬৮ ও ১৮৭০ সালে দুই খণ্ডে বিভাজিত হয়ে এই বইটি প্রকাশিত হয়। এই সময়েই যখন তিনি মৌলগুলিকে তাদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করতে যান, একটি নির্দিষ্ট ক্রমবিন্যাস লক্ষ করেন তিনি। এইভাবেই দিমিত্রি মেন্ডেলিভ তাঁর পর্যায় সারণী আবিষ্কার করেন। ১৮৬৯ সালের ৬ মার্চ রাশিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটিতে মেন্ডেলিভ একটি বক্তৃতা দেন যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য ডিপেন্ডেন্স বিটুইন দ্য প্রপার্টিস অফ দ্য অ্যাটমিক ওয়েটস অফ দ্য এলিমেন্টস’ যেখানে তিনি মৌলগুলিকে তাঁদের পারমাণবিক গুরুত্ব এবং যোজ্যতা অনুসারে বিন্যস্ত কিরেছিলেন। এই বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন যে মৌলগুলিকে তাঁদের পারমাণবিক ওজনের ক্রমানুসারে সাজালে তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিকতা লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া যে সকল মৌলের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য একই, তাদের হয় পারমাণবিক ওজন এক নয়তো তা ক্রমবর্ধমান রীতিতে রয়েছে বলেও মেন্ডেলিভ উল্লেখ করেন। এভাবে মৌলগুলির বিন্যাসকে তিনি নাম দেন ‘পর্যায় সারণী’। পরবর্তীকালে তাঁর পর্যায় সারণীর কিছু ত্রুটিকে সামনে রেখে এই সারণীর পুনর্বিন্যাস ঘটে এবং তা আধুনিক পরররযায় সারণী নামে পরিচিত হয়। শুধু তাই নয়, গ্যালিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও জার্মেনিয়াম নামে তিনটি মৌলের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ভবিষ্যৎবাণী দিয়েছিলেন মেন্ডেলিভ যা তখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃতও হয়নি। তাঁর পর্যায় সারণী প্রণয়নের মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই সেই তিনটি মৌল আবিষ্কৃত হয়। এই কারণেই দিমিত্রি মেন্ডেলিভ পর্যায় সারণীর জনক নামে পরিচিত হন। এছাড়াও তিনি প্রথম পেট্রোলিয়ামের রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে গবেষণা করেন এবং রাশিয়াতে প্রথম পেট্রো-রসায়ন কারখানা ও তৈল শোধনাগার স্থাপনে সহায়তা করেন। ভৌত রসায়নের ক্ষেত্রে তরলের তাপীয় প্রসারণের বিষয়েও মেন্ডেলিভের গবেষণা এক গুরুত্বপূর্ব অবদান রাখে।   

১৮৮২ সালে রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের পক্ষ থেকে ড্যাভি পদকে সম্মানিত হন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। ১৮৯২ সালে তিনি এই সোসাইটির বৈদেশিক সদস্যপদ লাভ করেন। পরের বছর ১৮৯৩ সালেই তিনি ‘ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারস’ সংস্থার ডিরেক্টর পদে আসীন হন। ১৯০৫ সালে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন দিমিত্রি মেন্ডেলিভ। নোবেল কমিটি ফর কেমিস্ট্রি মেন্ডেলিভের নাম মনোনয়ন করলেও শেষপর্যন্ত মেন্ডেলিভ নোবেল সম্মান পাননি।  

১৯০৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে দিমিত্রি মেন্ডেলিভের মৃত্যু হয়।   

আপনার মতামত জানান