সববাংলায়

রূপকুণ্ড কঙ্কাল হ্রদের অমীমাংসিত রহস্য

বিভাগঃ ,

হিমালয়ের বরফে ঢাকা মনোরম প্রাকৃতিক শোভার মাঝে স্বচ্ছ নীল জলে পূর্ণ হ্রদ দেখে অভিভূত হবেন না এমন মানুষ খুব কমই আছে – আর সেই নীল জলের গভীরে চোখ রাখলে আঁতকে উঠবেন যেকোন সাধারণ মানুষ। কারণ সেখানে চোখে পড়বে শয়ে শয়ে নরকঙ্কাল। হ্রদটির নাম রূপকুণ্ড। নিসর্গ প্রাকৃতিক শোভার মাঝে এতগুলো নরকঙ্কাল এলো কী করে? এত মানুষের মৃত্যুর পিছনে কি রয়েছে কোন দেবতার অভিশাপ নাকি কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নাকি অন্য কোন ষড়যন্ত্র? এই সব কঙ্কালই বা কাদের? কীভাবেই বা এই স্থানে এসে তারা মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছিল? সেই সব প্রশ্ন ভিড় করে আসে মনে। অথচ বিজ্ঞান আজও তার সদুত্তর দিতে পারেনি। এখানে জেনে নিন রূপকুণ্ড কঙ্কাল হ্রদের অমীমাংসিত রহস্য সম্পর্কে।

রূপকুণ্ড (Roopkund) হল ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় অবস্থিত একটি ছোট হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬,৫০০ ফুট উঁচুতে ১৩০ ফুট চওড়া আর ১০ ফুট গভীর এই জনমানবহীন হ্রদটি ‘কঙ্কাল হ্রদ’ (Skeleton Lake) নামে পরিচিত। পর্যটক ও গবেষকদের কাছে এই স্থান চিরকালই রহস্য ও রোমাঞ্চকর। ত্রিশূল ও নন্দাঘুন্টি পর্বত শৃঙ্গের পাদদেশের এই হ্রদটি বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে।

১৯৪২ সালে হিমালয়ের পার্বত্য এলাকাতে প্রতিদিনকার মতো টহল দেওয়ার সময় এইচ. কে. মাধওয়াল নামক এক রক্ষী রূপকুণ্ড হ্রদের মধ্যে ও আশেপাশে স্তূপ করে রাখা মানুষের কঙ্কালের প্রথম সন্ধান পান। সেই সময় তিনি কয়েকটি নর কঙ্কাল দেখতে পেয়েছিলেন। তবে ওই এলাকার তুষার গলে যাওয়ার পর রূপকুণ্ড হ্রদের তলদেশ থেকে আরও শ’খানেক কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রূপকুণ্ডের নাম হয়ে যায় স্কেলিটন লেক বা কঙ্কাল হ্রদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাধওয়াল এই রহস্যময় কুন্ড আবিষ্কারের করায় প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ আধিকারিকরা মনে করেন যে, এই কঙ্কালগুলি জাপানি সেনাদের। জাপানিরা হয়ত গোপনে ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতে এই স্থান দিয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল। আর হামলা চালানোর সময় কোন পাহাড়ি ঝড়ের মুখে পড়ে বা মহামারীর কবলে পড়ে ওই সৈনাবাহিনীর মৃত্যু হয়েছিল। তবে খুব শীঘ্রই বোঝা যায় এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। এই কঙ্কালগুলো নিয়ে পরীক্ষা করার সময় দেখা যায় যে, এই কঙ্কালগুলো বহু বছরের পুরানো। তাই এই মানুষগুলো কোনভাবে জাপানি সেনা হতেই পারে না।

যেকোন রহস্যই লোককথার জন্ম দেয়। রূপকুণ্ড কঙ্কাল হ্রদের রহস্যও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অচিরেই এই পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের মুখে মুখে রূপকুণ্ড নিয়ে একটি গল্প ছড়িয়ে পড়ে। এই এলাকার নন্দাদেবী ভারতের অন্যতম উচ্চতম এক পর্বতশৃঙ্গ। পার্বতীর বিশেষ রূপ নামে পরিচিত এই নন্দাদেবী হিমালয়ের একটি অত্যন্ত পবিত্র ও জাগ্রত দেবী। মনে করা হয়, তিনি উত্তরাখণ্ড অঞ্চলের অন্যতম প্রধান রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এখনও নন্দাদেবীকে উদ্দেশ্য করে প্রতি ১২ বছরে একবার নন্দাদেবী যাত্রার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি হিন্দুদের এক প্রাচীন ঐতিহ্য। এই কষ্টসাধ্য পদযাত্রার শেষ গন্তব্য হোমকুন্ড যাওয়ার পথেই রূপকুন্ড অবস্থিত। লোককথায় দেবী পার্বতী ও নন্দাদেবী যাত্রাকে মিলিয়ে দেওয়া হয় রূপকুণ্ডে জমা হওয়া নরকঙ্কালের ব্যাখ্যা দিতে।

আঞ্চলিক এই উপকথা অনুযায়ী, একবার পার্বতী বহু দূরের কোন এক রাজ্য ভ্রমণের সময় সেখানকার রাজা ও রাণী তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করলে দেবী রাগান্বিত হন। এরপর দেবীর অভিশাপে ওই রাজ্যে নেমে আসে খরা, দুর্ভিক্ষসহ নানা দুর্যোগ। এই সময় রাজা শাপমোচনের জন্য দেবীর উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা শুরু করেন। কিন্তু বিলাস-ব্যসনে অভ্যস্ত রাজা এই কঠিন ভ্রমণের সময়ও নানা রকম রাজকীয় জাঁকজমকের আয়োজন করেন। এমনকি তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য নর্তকীদেরও সঙ্গে নেওয়া হয়। দেবী রাজার এইরূপ ব্যবহার দেখে আরও রেগে যান। আর এই জন্য তিনি হোমকুণ্ডে যাওয়ার পথে রূপকুণ্ডের সরু রাস্তায় নর্তকীদের ধাক্কা দিয়ে পাতালপুরীতে ফেলে দেন। তারপর দেবীর নির্দেশে ঝড় আর শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হলে রাজাসহ তাঁর সঙ্গীদের দেহ সলিল সমাধি হয় রূপকুণ্ডে। কেউ দেবীকে ক্রোধান্বিত করলে তার ফল কী হতে পারে তার নিদর্শন হিসেবে দেবী ওই কঙ্কাল রেখে যান ভবিষ্যত প্রজন্মকে সংকেত দেওয়ার জন্য। বহু বছর ধরে রূপকুণ্ডের কঙ্কালগুলির পিছনে এই তীর্থযাত্রার কাহিনীকেই বিশ্বাস করা হত।

এ তো গেল লৌকিক মত যার বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি নেই। তাই ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীরা রূপকুণ্ড কঙ্কাল হ্রদ নিয়ে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। অনেকের মতে, এই কঙ্কালগুলো ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লির সুলতানের তিব্বত অভিযানের সেনার দেহাবশেষ। তবে তাদের দাবীকে অযৌক্তিক বলে মনে হয়, কারণ এই এলাকায় কঙ্কাল গুলোর আশেপাশে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। আবার কারোড় মনে হয়েছিল, এই মানুষগুলো ছিল তিব্বতের বণিক। তারা এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কোনও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তাদের দাবীও নস্যাৎ হয়ে যায়, কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চল দিয়ে তিব্বত আর ভারতের মধ্যে আগে কোন বাণিজ্যপথ ছিল না, তাই ওই কঙ্কালগুলো বণিকদের হতে পারে না। এছাড়া এখানকার হ্রদ থেকে কেবল চামড়ার জুতো আর নিত্য ব্যবহার্য কিছু জিনিস পাওয়া গেছে, তবে সেগুলোকে কোনও বাণিজ্যিক দ্রব্য বলে মনে হয় না। আবার কিছু মানুষের মতে, রূপকুণ্ড ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের কবর দেওয়ার স্থান বা কোনো মহামারীতে মৃতদের দেহ ফেলার স্থান – কিন্তু তাও যে ভুল তা অচিরেই প্রমাণিত হয় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফলে।

রূপকুণ্ডের কঙ্কালগুলো জনসমক্ষে আসার পর এই স্থান নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয়। দেশ বিভাগের পর ১৯৫৬ সালে ভারতের কলকাতার নৃতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (Anthropological Survey of India) রূপকুণ্ডের জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। এই সময় হ্রদ থেকে কঙ্কাল, হাড়, কাপড়, জপমালা এবং কাঠের পাত্রের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। এরপর কার্বন ডেটিং করে দেখা যায় যে, ওই কঙ্কালগুলো ৫০০ থেকে ৮০০ বছরের পুরনো। তবে সেই সময়কার কার্বন ডেটিং খুব একটা উন্নত ছিল না।

পরবর্তীতে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, কঙ্কালগুলো ছিল পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের। তবে তাদের মধ্যে তেমন কোনও রোগের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে রূপকুণ্ড কবরখানা হিসেবে ব্যবহৃত হত সেই তথ্য ঠিক নয়। এরপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ওই কঙ্কালগুলো সবই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একসাথে মারা গিয়েছিল। তাই মনে করা হত কোনও একটি ঘটনাই সবার মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে পারে। সব ফলাফল একত্রিত করে বিজ্ঞানীদের একটি দল যুক্তি দেন যে, নন্দাদেবীর যাত্রার সময় রূপকুণ্ডের উপরের পাহাড়ি পথ পার হওয়ার সময় হয়ত তুষারঝড় আর শিলাবৃষ্টির কারণে সকল তীর্থযাত্রীদের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর তাদের দেহ চাপা পড়ে যায় বরফে। আর তারপর কয়েক বছর পরে তুষারধ্বসের কারণে তাদের মরদেহ চলে যায় রূপকুণ্ডের তলায়।

তবে ২০০৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং ভারতীয় বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল আবার নতুন করে এই রূপকুণ্ড নিয়ে গবেষণা শুরু করে। এই গবেষণায় কঙ্কালগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ভারী শিলাবৃষ্টির কারণে মাথায় আঘাত লেগে ওই এলাকার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

২০১৯ সালে জিনগত গবেষণার পর রূপকুণ্ড নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। এই গবেষণাটি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির ষোলটি প্রতিষ্ঠানের আটাশজন গবেষক যৌথভাবে পরিচালনা করেন। এই গবেষণাপত্রটি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। গবেষকরা হ্রদ থেকে ৩৮ জন ব্যক্তির হাড়ের জিনগত পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, ওই ৩৮টি কঙ্কালের মধ্যে ২৩ জন পুরুষ এবং ১৫ জন মহিলা। এছাড়া এই কঙ্কালগুলির প্রথম ভাগের ২৩টি কঙ্কালের সঙ্গে ভারতের বর্তমান মানুষের জিনগত মিল পাওয়া যায়। দ্বিতীয় ভাগে ১৪টি কঙ্কালের সঙ্গে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার বাসিন্দাদের সাদৃশ্য রয়েছে। আর শেষ তথা তৃতীয় ভাগের কঙ্কালগুলির সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাসিন্দাদের জিনগত মিল আছে। তবে এরা একসাথে নয় বরং সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মারা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, ওই মানুষগুলোর মৃত্যুর মধ্যে প্রায় ১,০০০ বছরের ব্যবধান ছিল। তাই মহামারী বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোন সেনাবাহিনীর আক্রমণের তথ্য একেবারে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।

ক্রমে রূপকুণ্ডের রহস্য আরো জটিল হয়ে উঠছে। এশিয়ান মানুষেরা হয়তো তীর্থযাত্রী হতে পারে। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের লোক এই পার্বত্য অঞ্চলে কী কারণে আসবে? রূপকুণ্ডের ওই মানুষগুলোর মৃত্যুর মধ্যে এত দীর্ঘ ব্যবধান কী করে হল? তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? এখনও পর্যন্ত এই সকল প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। রূপকুণ্ড কঙ্কাল হ্রদের রহস্য তাই আজও অমীমাংসিত থেকে গেছে। এই বিষয়ে আপনার কোন মতামত থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading