সববাংলায়

মার্বেল প্যালেস

মার্বেল প্যালেস (Marble Palace) উত্তর কলকাতায় অবস্থিত উনিশ শতকের এক সুবিশাল জমিদার বাড়ি। জমকালো এই বাড়ি তার স্থাপত্য, মার্বেল পাথর, মূল্যবান শিল্প সংগ্রহ এবং ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত। কথিত আছে যে, এই প্যালেস তৈরি করতে ১২৬ রকমের মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছিল, তাই এই প্যালেসের নাম দেওয়া হয় মার্বেল প্যালেস। এই প্যালেসে প্রাচ্যের ভাবধারার সাথে পাশ্চাত্যের নান্দনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক এই প্যালেসকে নিজের বাসস্থান ও ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রহের প্রদর্শনীশালা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নির্মাণ করেন। মার্বেল প্যালেস দেখে রাজার শিল্পকলা, পক্ষীবিদ্যা এবং উদ্ভিদবিদ্যার প্রতি অনুরাগ চোখে পড়ে। কিছু নির্দেশিকা মেনে এই প্যালেসের সংগ্রহশালায় সবাই প্রবেশ করতে পারে। এখানে রয়েছে ইংরেজ, ডাচ এবং ইতালীয় শিল্পীদের তৈরি করা বিভিন্ন মূর্তি ও চিত্র। এছাড়া এই প্যালেসে ইতালি ও বেলজিয়াম সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা বহু দুর্লভ শিল্পকর্ম দেখা যায়। এই অট্টালিকার প্রাঙ্গণে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের বাগান, ফোয়ারা এবং একটি ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা রয়েছে।

মার্বেল প্যালেস কোথায়

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার ৪৬, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটে মার্বেল প্যালেস অবস্থিত। এই প্যালেসটি কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির কাছেই অবস্থিত।

মার্বেল প্যালেসের ইতিহাস

মল্লিক পরিবারের জয়রাম মল্লিক কলকাতায় আসেন মূলত ব্যবসা করতে। এই সময় তাঁর পরিবার হুগলি থেকে গোবিন্দপুর গ্রামে এসে বসবাস করা শুরু করেন। আর কলকাতায় আসার কিছুদিন পর তাঁরা পাকাপাকিভাবে চলে যান পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে। এই বংশের নিঃসন্তান রাজা নীলমণি মল্লিক রাজেন্দ্র মল্লিককে দত্তক নেন। নীলমণি মল্লিকের মৃত্যুর পর মল্লিক পরিবারের বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তাঁর এই দত্তক পুত্র। পশু-পাখি, গাছ ও বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংরক্ষণে রাজেন্দ্র মল্লিকের গভীর আগ্রহ ছিল। ১৮৩৫ সালে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক মার্বেল প্যালেস নির্মাণ করেছিলেন। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন এই প্যালেস পরিদর্শন করেন এবং প্যালেসের দেওয়াল ও মেঝেতে বিপুল পরিমাণ মার্বেলের ব্যবহার দেখে এই বাড়ির নাম দেন ‘মার্বেল প্যালেস’। বর্তমানে এই প্যালেসটিতে মল্লিক পরিবারের বংশধরেরা বসবাস করেন।

মার্বেল প্যালেসের গঠনশৈলী

মার্বেল প্যালেসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী ধারার একটি চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। এটি মূলত প্যালাডিয়ান (Palladian) বা নব্য-ধ্রুপদী (Neoclassical) শৈলীর মিশ্রণ। একে প্রধানত ব্রিটিশ-ভারতীয় স্থাপত্যের সংমিশ্রণ বলা হয়, যেখানে করিন্থিয়ান স্তম্ভ গ্রিক ও রোমান প্রভাবকে ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া এই প্যালেসে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি শৈলীর কিছু প্রভাব চোখে পড়ে। উৎকৃষ্ট মানের মার্বেল দিয়ে পুরো কাঠামোটি নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপত্যের এই অনবদ্য নিদর্শনটি তৈরি করতে ইতালি, রাজস্থানসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাছাই করা প্রায় ১২৬ ধরনের মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়।

মার্বেল প্যালেসের সম্মুখভাগে লম্বা খাঁজকাটা করিন্থিয়ান স্তম্ভ এবং ভাস্কর্য দেখা যায়। এই প্যালেসের প্রবেশদ্বারে রয়েছে একটি জাপানি ব্রোঞ্জের ফুলদানি, যা প্রথমেই দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই বিশাল প্রাসাদটিতে পাঁচটি প্রধান হল বা কক্ষ রয়েছে, সেগুলি হল অভ্যর্থনা কক্ষ, চিত্রকলা কক্ষ, ভাস্কর্য কক্ষ, বিলিয়ার্ড কক্ষ এবং ঠাকুর দালান। এই প্যালেসে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী বাঙালি ধাঁচের খোলা উঠোন। এছাড়া তিনতলা বিশিষ্ট এই প্যালেসের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অলঙ্কৃত বারান্দা, ঢালু ছাদ ও ব্যালকনি।

মার্বেল প্যালেসের ভিতরের বিশাল করিডোরগুলো ঝাড়বাতি, ভিক্টোরিয়ান যুগের আসবাবপত্র নানা ভাস্কর্য দিয়ে সজ্জিত রয়েছে। এখানে ব্রোঞ্জ ও মার্বেল নির্মিত পুরনো দিনের বড় দেওয়াল ঘড়ি, ম্যান্টল-পিস, গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের মতো বহু পুরনো ঘড়ি আছে। এছাড়া এই প্যালেসে রয়েছে বেলজিয়াম থেকে আনা বেশ কিছু বিরল আয়না। এখানে এমন এক আয়না রয়েছে যা প্যালেসের ভিতরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আয়নাটি ঘরে এক চমৎকার নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করে।

এছাড়া এই প্যালেসে আছে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, ডিউক অফ ওয়েলিংটন, গ্রিসের বিখ্যাত ভাস্কর প্রাক্সিটেলিস, ফিডিয়াস, পাশ্চাত্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকবি হোমার, রানী ভিক্টোরিয়া, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অপরূপ ভাস্কর্য। এখানে গ্রীক পুরাণের দেবী ভেনাস, অ্যাপোলো, শিকারের দেবী ডায়ানা, ইহুদি ধর্মের নেতা মোজেস, যিশু খ্রিস্ট, ভার্জিন মেরি, ভগবান বুদ্ধ ও বিরল প্রজাতির পশুর ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়। আবার এই প্রাসাদের সবুজ ঘাসের বাগানে আরও কিছু মূর্তি রয়েছে। বাগানের কাছে ‘লেডা ও রাজহাঁস’-এর মূর্তিটির পাশে একটি মার্বেলের ফোয়ারা স্থাপন করা আছে।

মার্বেল প্যালেসের চিত্রকলা কক্ষটিতে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীর আঁকা চিত্রকর্মের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এই কক্ষের মধ্যে আছে স্যার জোশুয়া রেনল্ডসের (Sir Joshua Reynolds) আঁকা দুটি বিখ্যাত চিত্র ‘দ্য ইনফ্যান্ট হারকিউলিস স্ট্র্যাংলিং দ্য সার্পেন্ট’ এবং ‘ভেনাস অ্যান্ড কিউপিড’। এছাড়া এখানে আছে ডাচ চিত্রশিল্পী ইয়ান ভ্যান গোয়েন (Jan van Goyen), পিটার পল রুবেনস (Peter Paul Rubens), ইতালীয় চিত্রশিল্পী জিওভান্নি বাতিস্তা সালভি দা সাসোফেরাতো (Giovanni Battista Salvi da Sassoferrato), পিয়েরো দেল পোলাইওলোর (Piero del Pollaiuolo), টিশিয়ান (Titian), বার্তোলোমে এস্তেবান মুরিলোর (Bartolome Esteban Murillo) আঁকা ছবি। এই বাড়িতে পিটার পল রুবেন্সের আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দ্য ম্যারেজ অফ সেন্ট ক্যাথরিন’ এবং ‘দ্য মার্টারডম অফ সেন্ট সেবাস্টিয়ান’ রয়েছে। ভারতীয় চিত্রশিল্পীদের মধ্যে রাজা রবি বর্মার আঁকা বেশ কিছু বিরল এবং অসাধারণ চিত্রকর্ম এই প্যালেসে সংরক্ষিত আছে। এখানে গ্রীক ও ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনি নির্ভর কিছু চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য দেখা যায়। এই শিল্পকর্মগুলো বিগত যুগের রাজকীয়তা ফুটিয়ে তোলে, এগুলোকে অসাধারণ স্বপ্নের মতো বলে মনে হয়। এই সকল শিল্পকর্ম ছাড়াও গ্রাম্য নানা আসবাবপত্র রয়েছে এখানে। এই সব প্রাচীন নিদর্শনের জন্য এই প্যালেসকে বিগত বহু বছরের সংগৃহীত মূল্যবান প্রত্নবস্তুর ভান্ডার বলে মনে করা হয়।

তবে অনেক শিল্প সমালোচকের মতে, এই সংগ্রহটি বেশ এলোমেলো। আসলে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক বিভিন্ন দেশ থেকে যা পছন্দ করে এনেছেন, তা সবই মার্বেল প্যালেসে রেখে দেওয়া হয়েছে। তাই গ্রিক, রোমান এবং ভারতীয় পুরাণের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের সাথে অতি সাধারণ ঘরোয়া মূর্তিগুলিকেও এখানে পাশাপাশি রাখা আছে।

এছাড়া মার্বেল প্যালেসের মধ্যে এক অপরূপ সঙ্গীত কক্ষ ও নাচের ঘর রয়েছে। এই নাচের ঘরটিতে রয়েছে বেলজিয়ান কাঁচের তৈরি অপূর্ব বিশাল ও কারুকার্যময় ঝাড়বাতি।

মার্বেল প্যালেসের কাছে ‘নীলমণি নিকেতন’ নামে একটি ছোট চিড়িয়াখানা আছে। রাজেন্দ্র মল্লিকের বাবার নামে এই চিড়িয়াখানাটির নামকরণ করা হয়েছিল। এটি হল ভারতের প্রথম ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত এক বিখ্যাত চিড়িয়াখানা। প্রথম থেকেই এই চিড়িয়াখানা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এখানে প্রাণীদের প্রদর্শন ও সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে দেখা যায় সজারু, লাল-পাছা বেবুন, বার্কিং ডিয়ার, হায়াসিন্থ ম্যাকাও, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ, চিতল হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, ধনেশ, দোয়েল এবং আরও অনেক কিছু।

তাছাড়া মার্বেল প্যালেস চত্বরের মধ্যেই আছে একটি জগন্নাথ মন্দির। এই মন্দিরটি রাজেন্দ্র মল্লিকের বাবা নীলমণি মল্লিক তৈরি করেন। এই মন্দিরটি মার্বেল প্যালেসের থেকে পুরনো, তবে মন্দিরটি এখনও বেশ ভাল অবস্থায় আছে। এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে কেবলমাত্র মল্লিক পরিবারের সদস্যরাই প্রবেশ করতে পারেন। এখানে নিত্যপূজা ও রথযাত্রার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এছাড়া এখানে একটি হ্রদ আছে।

জনজীবনের মার্বেল প্যালেসের প্রভাব

মার্বেল প্যালেসে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারে, তবে এই প্যালেসে প্রবেশের জন্য আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই প্যালেস ভ্রমণের ২৪ ঘণ্টা আগে কলকাতার বিবাদী বাগের পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন তথ্য ব্যুরো থেকে লিখিত অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এখানে বাড়ির ভিতরে পর্যটকদের গাইড নিতে হয়, তাঁরাই পুরো বাড়ি দর্শনার্থীদের ঘুরিয়ে দেখান। তবে মার্বেল প্যালেসের মধ্যে যেখানে মল্লিক পরিবারের সদস্যরা বাস করেন সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। আর এই প্যালেসে ছবি তোলা একেবারে নিষিদ্ধ। তবে প্রতি বছর রথের দু’দিন মার্বেল প্যালেসে প্রবেশের জন্য কোন অনুমতি নিতে হয় না। রথের দিন ও উল্টোরথের দিনে পরিবারের সদস্যরা এখানে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার আয়োজন করেন। এখানে ঠাকুর দেখার জন্য ও রথের রশিতে টান দেওয়ার জন্য বহু মানুষ এই প্যালেসে যান। এছাড়া এই সময় এখানে একটি মেলাও বসে।

মার্বেল প্যালেস বর্তমান কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীরা এখানে বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের কাজ এবং অদ্ভুত ভাস্কর্য দেখে মুগ্ধ হন। এই সব নিদর্শন দেখে উনিশ শতকের কলকাতার মানুষের শিল্প ও সাংস্কৃতিক বোধের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাসাদের প্রাঙ্গণে থাকা ছোট চিড়িয়াখানাটি বিশেষ করে শিশুদের বিশেষভাবে আকর্ষিত করে । এছাড়া ইতিহাসপ্রেমী ও শিল্পীদের জন্য এটি একটি গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading