তুলসীদাস বলরাম (Tulsidas Balaram) একজন বিখ্যাত ভারতীয় ফুটবলার। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০এর দশকের মধ্যে কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিম চুনী গোস্বামী, পিকে ব্যানার্জি ও তুলসীদাস বলরামকে সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় ফুটবলকে আন্তর্জাতিক সাফল্যের শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই সময়কালকে অনেকে ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলে মনে করে। এই তিনজন ফুটবলারকে একসাথে ভারতীয় ফুটবল দলের ‘হোলি ট্রিনিটি’ বলেও মনে করা হত। তুলসীদাস বলরাম এশিয়ান গেমস, মার্ডেকা কাপ এবং অলিম্পিকসহ একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিক এবং ১৯৬২ সালে জাকার্তা এশিয়ান গেমসে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছিলেন। তাঁর সময়কালে তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। ভারতের জাতীয় দলের পাশাপাশি তিনি কলকাতার ইস্টবেঙ্গল দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ইস্টবেঙ্গল দলের অধিনায়কত্ব করে দলকে অনেক ট্রফি জিততে সাহায্য করেছিলেন। ফুটবল মাঠে তিনি সাধারণত সেন্টার বা বাম-উইং ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন। ভারতীয় ফুটবল জগতে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তিনি অর্জুন পুরস্কার, বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯৩৬ সালের ৩০ নভেম্বর ব্রিটিশ-অধিকৃত হায়দ্রাবাদের সেকেন্দ্রাবাদে তুলসীদাস বলরামের জন্ম হয়। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা বলরামের ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু সেই সময়ে তাঁদের পরিবারে ফুটবল খেলা ছিল এক প্রকারের বিলাসিতা। তাঁর পরিবারের পক্ষে এই ফুটবল খেলার খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর মা খেলার পরিবর্তে পড়াশোনায় মন দেওয়ার কথা বলতেন। আসলে তাঁর মা চেয়েছিলেন যে, পড়াশোনা করে বলরাম কোন সরকারি চাকরি করলে তাঁদের পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে। কিন্ত ফুটবল খেলাকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও তিনি কোনভাবেই ফুটবল খেলা থেকে সরে যাননি।
বলরাম প্রথমে আম্মুগুড়ার স্থানীয় এক ফুটবল ক্লাবে খেলতেন। তবে সাধারণ স্থানীয় খেলা হলেও এই ক্লাবের ছেলেরা এতটাই ভালো ফুটবল খেলত যে, ফুটবলপ্রেমী অনেক মানুষ এবং লালাগুড়া রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিকরা তাদের খেলা দেখতে আসত। কিন্তু এই দলে জায়গা করে নিতে হলে, প্রতিটি ছেলেকে একটি জার্সির জন্য ২ টাকা করে দিতে হত। তবে তুলসীদাস বলরাম জানতেন যে, মায়ের কাছে এই বিষয়ে টাকা চাওয়া অর্থহীন হবে। তাই তিনি পাঠ্যপুস্তক কেনার নাম করে মায়ের থেকে টাকা নেন। এরপর পরিবারের অমতে তিনি নিয়মিতভাবে ফুটবল খেলা শুরু করেন।
এক নজরে তুলসীদাস বলরামের জীবনী:
- জন্ম: ৩০ নভেম্বর, ১৯৩৬
- মৃত্যু: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
- কেন বিখ্যাত: তুলসীদাস বলরাম ১৯৫০–৬০-এর দশকে ভারতের আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সফলতা এনে দেন। বিশেষ করে ১৯৬২ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে স্বর্ণজয়ী দলের সদস্য ও ১৯৬০ রোম অলিম্পিকে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের জন্য তিনি স্মরণীয়।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: পিকে ব্যানার্জি, চুনি গোস্বামী ও তুলসীদাস বলরামকে ভারতীয় ফুটবলের “পবিত্র ত্রয়ী” বলা হয়। ভারত সরকারের অর্জুন ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
কয়েকদিন পর থেকে তুলসীদাস বলরাম লালাগুড়া ওয়ার্কশপ মাঠে ফুটবল খেলতে যান। তারপর তিনি রাইডার্স ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতে নামেন। এই ম্যাচ দেখার জন্য প্রধান অতিথি হিসাবে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় দলের ম্যানেজার তথা বিখ্যাত কোচ সৈয়দ আব্দুল রহিম। সেই সময়ে তিনি হায়দ্রাবাদ পুলিশ দলের কোচিং করাতেন। তুলসীদাস বলরামের প্রতিভা বুঝতে পেরে আব্দুল রহিম তাঁকে ১৯৫৬ সালের সন্তোষ ট্রফির জন্য হায়দ্রাবাদ দলের ট্রায়ালে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। এছাড়া তিনি তুলসীদাস বলরামের আর্থিক অবস্থার কথা জেনে গ্রাম থেকে হায়দ্রাবাদে অনুশীলনে যাওয়ার জন্য পারিশ্রমিকও দিতেন। ট্রায়ালে চমকপ্রদ পারফরম্যান্সের পর তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে হায়দ্রাবাদ দলে জায়গা করে নেন এবং ১৯৫৬ সালের সন্তোষ ট্রফিতে হায়দ্রাবাদের হয়ে খেলতে নামেন। সন্তোষ ট্রফির ফাইনাল ম্যাচে তিনি বোম্বের বিরুদ্ধে গোল করে হায়দ্রাবাদকে ৪-১ ব্যবধানে সহজ জয় তুলে এনে দিতে সাহায্য করেছিলেন।
এরপর ১৯৫৬ সালেই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন অলিম্পিকে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ভারতীয় ফুটবল দলে তুলসীদাস বলরামের অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে ভারতীয় দল ৪-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্টের চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল। তবে এশিয়ার প্রথম দল হিসেবে অলিম্পিকে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল ভারতীয় দল। পরাজিত হলেও তরুণ খেলোয়াড় তুলসীদাস বলরামের জন্য অলিম্পিকস গেমস এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা ছিল।
ভারতে ফিরে আসার পর তুলসীদাস বলরাম কলকাতার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগদান করেন। সেই সময়ে তিনি ছিলেন ক্লাবের সর্বোচ্চ বেতনভোগী খেলোয়াড়। বলরাম ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলার সময় দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং কিছুদিন পর তিনি ওই দলের অধিনায়কও হন। তিনি ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক হিসেবে সিএফএল বা কলকাতা ফুটবল লীগ এবং আইএফএ শিল্ড জিতেছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে থাকাকালীন তিনি কোচ সুশীল ভট্টাচার্যের অধীনে খেলেছেন। তাছাড়া তিনি বাংলার হয়ে বেশ কয়েকবার সন্তোষ ট্রফি খেলেছিলেন এবং একাধিকবার দলকে চ্যাম্পিয়নও করেছেন। কলকাতার ভক্তদের কাছ থেকে দারুণ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং প্রশংসা পেয়ে তিনি পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন।
তবে তুলসীদাস বলরামের জনপ্রিয় হয়ে রয়েছেন আন্তর্জাতিক স্তরের তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য। ১৯৫৮ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের সদস্য ছিলেন তিনি। হংকংয়ের বিপক্ষে ভারতের এই খেলাটি অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার পর ভারত ৫-২ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এই ম্যাচে তুলসীদাস বলরাম একটি গোল করেন। তারপর ১৯৫৯ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মার্ডেকা টুর্নামেন্টে ভারতের রানার্স-আপ হওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬০ সালের রোমে অলিম্পিকেও তুলসীদাস বলরাম ভারতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে তারকাখচিত হাঙ্গেরির বিপক্ষে ভারতের প্রথম গোলটি করেন তিনি। হাঙ্গেরির বিখ্যাত রক্ষণভাগও তাঁকে থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। আবার পরের ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে তুলসীদাস বলরাম দুর্দান্ত খেলেন। ওই ম্যাচে পিকে ব্যানার্জির ঐতিহাসিক গোল করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ম্যাচে ভারত জয়লাভ করতে পারেনি। আবার গ্রুপ পর্বের শেষ খেলায় পেরুর বিপক্ষে ভারত ৩-১ গোলে পরাজিত হলেও তাতে গোল করেন তুলসীদাস বলরাম। পুরো টুর্নামেন্টে ভারতের মোট ৩টি গোলের মধ্যে ২টি গোলই করেন তিনি।
এরপর ১৯৬২ সালের জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে থাইল্যান্ড এবং জাপানের বিপক্ষে একটি করে গোল করেন তিনি। আর ভারত এই এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক জয় করেছিল। এটি ছিল দ্বিতীয় এশিয়ান গেমস, যেখানে ভারতীয় ফুটবল দল প্রথম স্থান অর্জন করে।
এরপর ১৯৬৩ সালে তিনি বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের হয়ে খেলেছিলেন। কিন্তু হঠাৎই তুলসীদাস বলারামের জীবনে ছন্দপতন ঘটে। ১৯৬৩ সালে তাঁর যক্ষ্মা রোগ ধরা পরে। আর এই কারণে তিনি কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকতেই মাত্র ২৭ বছর বয়সে অবসর নিতে বাধ্য হন। অবসর গ্রহণের পর বলরাম কলকাতার বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা মেয়র একাদশের কোচ নিযুক্ত হন। তারপর ১৯৯০ সালের দিকে তিনি সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের জাতীয় নির্বাচক মণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও কাজ করেন। তবে তিনি এই পদে খুব বেশিদিন কাজ করতে পারেননি। মনে করা হয় যে, তাঁর আপসহীন মনোভাব এবং সততার কারণেই তিনি এই দায়িত্ব থেকে সরে যান।
তবে তুলসীদাস বলরাম সুইডেনের বিখ্যাত গথিয়া কাপে কোচ হিসেবে ভারতীয় যুবদলকে কোচিং করিয়েছিলেন। বাসুদেব মণ্ডল, মেহতাব হোসেন এবং সংগ্রাম মুখার্জির মতো খেলোয়াড়দের কেরিয়ারে তাঁর ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া তিনি কিছুদিন দমদম পৌরসভার কিংস্টন-নিখিল নন্দী ফুটবল একাডেমির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। শেষের দিকে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়েতে সিনিয়র ওয়েলফেয়ার অফিসার হিসেবে কাজ করেন।
তুলসীদাস বলরামকে ফুটবল মাঠে পেনাল্টি এরিয়ার ভিতরে একজন বিপজ্জনক খেলোয়াড় হিসেবে মনে করা হত। তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, স্কোরিং দক্ষতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাঁকে ভারতীয় ফুটবলের লোককাহিনীর অংশ করে তুলেছে। এছাড়া তিনি তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিতেন। তবে তুলসীদাস বলরামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দৃঢ়, আপোষহীন ন্যায়পরায়ণতাবোধ। তিনি নিজের ফুটবল কেরিয়ারে এমনকি খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পরেও কখনোই অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি।
১৯৬১ সালে কলকাতা ভেটেরান্স ক্লাব তুলসীদাস বলরামকে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার দিয়েছিল। এরপর ১৯৬২ সালে ভারত সরকার তাঁকে অর্জুন পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে। তবে তুলসীদাস বলরাম ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কর্তৃপক্ষের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০১০ সালে ইস্টবেঙ্গল কর্তৃক প্রদত্ত আজীবন কৃতিত্বের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি নিজের চিকিৎসার খরচও ইস্টবেঙ্গল কর্তৃপক্ষের থেকে নিতে অস্বীকার করেন। এছাড়া ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। তুলসীদাস বলরামের মৃত্যুর পর ২০২৩ সালে ভারত এবং কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের উভয় দলের খেলোয়াড়রা এক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে তাঁর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানায়।
২০২৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তুলসীদাস বলরামের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান