খেলা

সৈয়দ আব্দুল রহিম

আধুনিক ভারতীয় ফুটবলের স্থপতি হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আব্দুল রহিম (Syed Abdul Rahim) ছিলেন ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম কোচ এবং ম্যানেজার। ১৯৫০ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের জন্য যা করেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে রয়ে গিয়েছে। তাঁর প্রশিক্ষণ এবং অনুপ্রেরণায় ভারতীয় ফুটবল এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তাঁর তত্ত্বাবধানেই এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ভারত মেলবোর্ন অলিম্পিক ফুটবল টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে যায়। কোচ হিসেবে সৈয়দ আব্দুল রহিমের সময়কালকে ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে।

১৯০৯ সালের ১৭ আগস্ট হায়দ্রাবাদে সৈয়দ আব্দুল রহিমের জন্ম হয়। পড়াশোনায় ভাল হওয়ার পাশাপাশি ছোটোবেলা থেকেই খেলাধূলার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল টিমেই খেলতেন। স্নাতক হওয়ার পরে আব্দুল রহিম একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেও পরবর্তীকালে একজন ফুটবল কোচ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেন এবং ভারতকে গৌরবান্বিত করে তোলেন।

সৈয়দ আব্দুল রহিমকে ভারতের স্ট্যান কুলিস (The Stan Cullis of India) বলা হয়। ১৯২০ থেকে ১৯৪০ এর দশকের শুরুর দিকে তিনি হায়দ্রাবাদের অন্যতম সেরা ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তখন তিনি হায়দ্রাবাদের অন্যতম স্থানীয় দল কামার ক্লাবের (Qamar Club) হয়ে খেলতেন। ১৯৪২ সালে তিনি হায়দ্রাবাদ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল থাকেন।

প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে সৈয়দ আব্দুল রহিমের কোচিং ছিল অভিনব এবং উপযোগী। খেলোয়াড়দের রিফ্লেক্স, গতি, শক্তি, দক্ষতা এবং কলা-কৌশলকে ক্ষুরধার করতে তিনি বিশেষত নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে ফুটবল টুর্নামেন্ট করতেন। ভারতীয় ফুটবলের মান বাড়াতে হলে তিনজন ব্যাক নিয়ে অথবা একজন স্টপার খেলানোর কথা তিনিই প্রথম বলেছিলেন। নভি কাপাডিয়া রচিত ‘বেয়ারফুট টু বুটস’ (‘Barefoot to Boots’) আব্দুল রহিমের ছেলে সৈয়দ শাহিদ হাকিম যিনি তাঁর বাবার অধীনে ১৯৬০অলিম্পিকে ভারতীয় ফুটবল দলে ছিলেন তাঁর বাবার অভিনব অনুশীলন পদ্ধতি নিয়ে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বাবা সৈয়দ আব্দুল রহিম ফুটবলারদের ওয়ান-টাচ পদ্ধতিতে খেলার মান উন্নত করতে ড্রিবলিং বিহীন টুর্নামেন্ট আয়োজন করতেন যেখানে কোন ফুটবলার ড্রিবলিং করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, তিনি দুর্বল পা টুর্নামেন্টও আয়োজন করতেন যেখানে খেলোয়াড়রা কেবল তাঁদের দুর্বল পা ব্যবহার করে খেলতে পারবেন। সেই সময় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই যখন ২-৩-২-৩ ফর্মেশনে খেলতে অভ্যস্ত ছিল তিনিই প্রথম ৪-২-৪ ফর্মেশনে খেলাতে শুরু করেন ভারতীয় ফুটবল দলকে যে পদ্ধতিকে ব্রাজিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপে জনপ্রিয় করে তোলে।

আব্দুল রহিম ১৯৪৩ সালে ‘হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশ’ বা ‘সিটি আফগানস’-এর কোচ নিযুক্ত হন। কোচ হিসেবে তিনি যুক্ত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এই দলটি ব্যাঙ্গালোরে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিরুদ্ধে অ্যাশ গোল্ড কাপ জিতে হায়দ্রাবাদের একটি শক্তিশালী স্থানীয় দল হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এমনকি, ১৯৫০ সালে ডুরান্ড কাপের ফাইনালে বাংলার শক্তিশালী দল মোহনবাগানকেও তাঁরা হারিয়ে দেন।

১৯৫০ সালে আব্দুল রহিম ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের কোচ নিযুক্ত হন। একইসঙ্গে তিনি হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশ দলটির দায়িত্বও পালন করতে থাকেন। কোচ হয়ে আসার পরে ১৯৪৮ সালের অলিম্পিক দলের সদস্যদের বাদ দিয়ে জাতীয় দলের খোলনলচে বদলে দেন তিনি। ভারতীয় কোচ হিসেবে তাঁর অন্যতম টুর্নামেন্ট হল ১৯৫১ সালের এশিয়ান গেমস। এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে ইরানকে ১-০ গোলে হারিয়ে ভারত সোনা জেতে। তবে ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ভারতে হেরে গেলে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের(এ.আই. এফ.এফ) কর্তারা সৈয়দ আব্দুল রহিমকে নিজের পছন্দমতো দল নির্বাচন করা থেকে বিরত রাখেন।

হায়দ্রাবাদ সিটি পুলিশ ১৯৫০, ১৯৫৭ এবং ১৯৫৯ সালে হওয়া ১২ টি জাতীয় টুর্নামেন্টই জেতে। ১৯৫৯ সালের আগে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং হায়দ্রাবাদ, ফুটবলের দুটি আলাদা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। কিন্তু ১৯৫৯ সালের পর থেকে উভয়ে মিলে একটি একক প্রতিষ্ঠান অন্ধ্রপ্রদেশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠে। এই সংযুক্তির পিছনে আব্দুল রহিমের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে ভারত খুব ভাল শুরু না করলেও জাপানকে ২-০ গোলে হারিয়ে এবং ফাইনাল গ্রুপের খেলায় থাইল্যান্ডকে ৪-১ গোলে হারিয়ে পরবর্তী ধাপে পৌঁছায়।

১৯৫২ সালে ফিনল্যান্ড অলিম্পিকে বুট ছাড়া খেলে যুগোস্লোভাকিয়ার কাছে ১০-১ গোলে লজ্জাজনক হারের পরে ভারত খেলা থেকে বেরিয়ে যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেশে ফিরে আসার পরে এ.আই. এফ.এফ জানায় যে ভারতের হয়ে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের বুট পরা বাধ্যতামূলক। অলিম্পিক থেকে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার পরে সৈয়দ আব্দুল রহিম হাঙ্গেরির আক্রমণাত্মক ৪-২-৪ গঠন থেকে অনুপ্রেরণা নেন এবং রাজ্য দলে সেন্টার-হাফ থেকে ডাব্লিউ ফর্মেশন (W Formation) আনেন। এই সিদ্ধান্তটিকে খুব ভালভাবে নেওয়া না হলেও এই সিদ্ধান্তের জন্যই ১৯৫২ সালে ঢাকাতে চতুর্ভুজ টুর্নামেন্টে ভারত পাকিস্তানকে হারিয়েছিল।

১৯৫৪ সালের এশিয়ান গেমসে ভারত দলগত স্তরে ছিটকে গেলেও আব্দুল রহিমের উৎসাহ এবং বিশ্বাসের ওপর ভর করে ভারত, আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া্কে হারিয়ে চার নম্বরে টুর্নামেন্টটি শেষ করে। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে ভারতকে হাঙ্গেরি, ফ্রান্স এবং পেরুর সঙ্গে একই গ্রূপে রাখা হয়। হাঙ্গেরি এবং পেরুর কাছে যথাক্রমে ২-১ এবং ৩-১ গোলে হারলেও ফ্রান্সের সঙ্গে ১-১ এ ভারত ড্র করে।

১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে সোনা জেতার পথটি ভারতীয় দলের জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। ভারতীয় দলের বেশ কিছু খেলোয়াড়কে বিশ্ব রাজনীতিতে বেশ কিছু চাপানউতোরের জন্য ভারতে ফিরে আসতে হয়। বাকি খেলোয়াড়েরা জেতার আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল রহিম নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। তিনি ফাইনালের আগের দিন গোটা দলকে জাকার্তার রাস্তায় নিয়ে বেরোলেন এবং বললেন “কাল তোমাদের থেকে আমার একটা উপহার চাই… তোমরা কাল সোনা জিতে আনো…” এই কয়েকটি কথা খেলোয়াড়দের উদ্যম এবং জেদ কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে দেয়। পরের দিন সেন্টার-ফরোওয়ার্ড হিসেবে খেলা আহত জার্নেল সিংকে সৈয়দ আব্দুল রহিম স্ট্রাইকারের দায়িত্ব দেন যাঁর ওপরে ভরসা করে তিনি এই বিশাল ঝুঁকি নিয়েছিলেন সেই জার্নেল সিং-ই হাফ-টাইমের আগে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-০ তে পিছিয়ে দেয়। হাফ-টাইমের পরে ভারতের দুর্ভেদ্য প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ১ টির বেশি গোল দিতে পারে না। অতঃপর দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে ভারত আন্তর্জাতিক ফুটবল জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করে।

সৈয়দ আব্দুল রহিমের কোচিংয়ে ১৯৪৫-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সময়কালকে হায়দ্রাবাদ ফুটবলের এবং ১৯৫১ এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সময়কে ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। তাঁর প্রিয় দল ছিল হাঙ্গেরি, এবং প্রিয় ফুটবলার ছিলেন গুস্তাভ সেবেস (Gusztav Sebes) ও রবার্ট অ্যান্ড্র্যু ফ্রুভাল (Robert Andrew Fruval)।

যোগ্য সম্মান কোনদিনই তিনি পাননি। তবে তাঁর নামে আই লিগে (I-League) একটি ট্রফি রাখা হয়েছে, এবং সেরা কোচকে তাঁর নামাঙ্কিত ‘সৈয়দ আব্দুল রহিম বেস্ট কোচ অ্যাওয়ার্ড’ (Syed Abdul Rahim Best Coach Award) দেওয়া হয়।

১৯৬৩ সালের ১১ জুন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে সৈয়দ আব্দুল রহিমের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনী অবলম্বনে সম্প্রতি ‘ময়দান’ (Maidaan) নামে একটি হিন্দি ছবি তৈরি হয়েছে যেখানে অজয় দেবগণকে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন