ইতিহাস

এম এস নরসিমহান

এম এস নরসিমহান

ভারতের একজন অন্যতম পণ্ডিত গণিতবিদ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত এম এস নরসিমহান (M. S. Narsimhan)। মূলত সংখ্যাতত্ত্ব, বীজগাণিতিক জ্যামিতি, প্রতিনিধিত্ব তত্ত্ব এবং পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল ইক্যুয়েশন বিষয়ে গবেষণার জন্যই তিনি বিখ্যাত। স্পর্শক প্রকৃতির হলোমর্ফিক ভেক্টর বাণ্ডিলের মডুলি স্পেসের উপরেও তিনি গবেষণা করেছেন। কোবায়াশি-হিচিন করেসপন্ডেন্সের ভিত্তি হিসেবে নরসিমহানের কাজকে বিবেচনা করা হয়। আরেক বিখ্যাত গণিতবিদ সি. এস. শেষাদ্রির সঙ্গে একত্রে একটি রিম্যান তলের উপর স্থিতিশীল ভেক্টর বাণ্ডিলের জন্য উপযুক্ত শর্তাবলী নির্ণয় করেছিলেন এম এস নরসিমহান যা পরে ‘নরসিমহান শেষাদ্রি তত্ত্ব’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৭৫ সালে গণিতে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। নরসিমহানই ছিলেন একমাত্র ভারতীয় যিনি বিজ্ঞানের জগতে কিং ফয়জল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি যা কিনা ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান হিসেবে স্বীকৃত। ঠিক এর আগের বছরই ১৯৮৯ সালে এম এস নরসিমহানকে ফরাসি সরকার ‘অর্ডার ন্যাশনাল ডু মেরিট’ উপাধিতে ভূষিত করে। লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৩২ সালের ৭ জুন তামিলনাড়ুর তন্দরাইতে এক গ্রাম্য পরিবারে এম এস নরসিমহানের জন্ম হয়। তাঁর পরিবারে তিনিই ছিলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর পরিবারের আদি নিবাস ছিল উত্তর আর্কট জেলায়। পরবর্তীকালে এক ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী শকুন্তলা নরসিমহানের সঙ্গে এম. এস. নরসিমহানের বিয়ে হয়। তাঁদের কন্যা শোভনা নরসিমহান ‘জওহরলাল নেহেরু সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্টিফিক রিসার্চ’ সংস্থায় অধ্যাপনার কাজে যুক্ত।

গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষালাভের পরে স্নাতক স্তরে মাদ্রাজের লয়োলা কলেজে ভর্তি হন এম এস নরসিমহান। এই কলেজে ফরাসি জেসুইট ফাদার চার্লস রেসিনের অধীনে পড়াশোনা করেন তিনি। এই ফরাসি ফাদারও আবার ফরাসি গণিতবিদ এলি কার্টেনের কাছে গণিতশিক্ষা করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করার জন্য বম্বের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফাণ্ডামেন্টাল রিসার্চ সংস্থায় ভর্তি হন নরসিমহান। ১৯৬০ সালে ইউনিভার্টি অফ মুম্বাই থেকে নরসিমহান তাঁর গবেষণা সম্পূর্ণ করেন এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সংখ্যাতত্ত্বের বিখ্যাত গবেষক অধ্যাপক কে. এস. চন্দ্রশেখরন ছিলেন তাঁর গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক।

১৯৬০ সালে টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফাণ্ডামেন্টাল রিসার্চের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এম এস নরসিমহান। এর কিছুদিনের মধ্যেই এই সংস্থার সম্মানীয় সদস্য হন তিনি। এই সংস্থায় কাজ করার সময় তাঁর আগ্রহের জায়গা ছিল পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল অপারেটরস (partial differential operators) এবং এলিপ্টিক অপারেটরস (elliptic operators)। এই সময়ের মধ্যেই তিনি লরেন্ট সোয়ার্টজের আহ্বানে ফ্রান্সে ভ্রমণ করেন। জাঁ পিয়ের সেরি, ক্লড শ্যাভালি, এলি কার্টান এবং জ্যঁ লেরার মতো বিখ্যাত গণিতবিদের সঙ্গে এই সময় সাক্ষাৎ হয় তাঁর। ফ্রান্সে থাকাকালীনই প্লুরিসি (pleurisy) তে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এই সময় তিনি সমগ্র ফ্রান্সের জনগণের মধ্যে একটি অদৃশ্য বামপন্থী মনোভাব লক্ষ করেন তিনি। ফ্রান্সে থাকার সময় জাপানি গণিতবিদ টাকেশি কোটাকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন নরসিমহান। কশি-সোয়ার্টজ অসাম্যকে (Cauchy–Schwarz inequalities) প্রমাণ করে এমন বিশেষ প্রকারের এলিপ্টিক অপারেটরসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশ্লেষণ তত্ত্ব বিষয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। তাঁর এই কাজটিই ‘কোটাকে-নরসিমহান তত্ত্ব’ নামে পরিচিত হয় যা কিনা আল্ট্রা-ডিফারেনশিয়েবল পার্টিকলের এলিপ্টিক অপারেটরস বিষয়ে ধারণা দেয়। তিনি ভারতীয় গণিতবিদ সি. এস. শেষাদ্রির সঙ্গে একত্রে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বীজগাণিতিক জ্যামিতি এবং সংখ্যাতত্ত্বের উপর গবেষণা করেছেন যার ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে নরসিমহান-শেষাদ্রি তত্ত্ব। এই তত্ত্ব রিম্যান সমতলে স্থিতিশীল ভেক্টর বাণ্ডিলের সম্পূর্ণ বীজগাণিতিক প্রতীককে সংজ্ঞায়িত করেছে। এছাড়াও এই তত্ত্ব আধুনিক জ্যামিতির ডিফারেনশিয়াল জ্যামিতি এবং বীজগাণিতিক জ্যামিতির মধ্যে সম্পর্ক সূত্র স্থাপন করেছে। নরসিমহান এবং শেষাদ্রি উভয়েই পরবর্তীকালে লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটির সদস্য হয়েছিলেন। অপর এক বিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ আর. আর. সিমহার সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করে নরসিমহান একটি বাস্তব বিশ্লেষণাত্মক ম্যানিফোল্ডের সাধারণ জটিল গঠনের মডুলির অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এই অভিনব গবেষণা রিম্যান তলের উপর সিমহা-নরসিমহান পরিমাপ নামে পরিচিত হয়।

তাঁর কাজের জন্য তাঁকে স্পর্শকীয় বৈচিত্র্য (projective varieties) বিষয়ে সমস্ত সমাকৃতি ভেক্টর বাণ্ডিলের মডুলি স্পেস নির্ণয়ের জনক বলা হয়ে থাকে। তাঁর এই কাজের ফলেই ‘কোবায়েশি-হিচিন করেসপণ্ডেন্স’ তৈরি হয় যা জটিল ম্যানিফোল্ডের উপর ভেক্টর বাণ্ডিলের বিষয়ে বীজগাণিতিক জ্যামিতি এবং ডিফারেনশিয়াল জ্যামিতির পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে। ভারতে ‘ন্যাশনাল বোর্ড অফ হায়ার ম্যাথমেটিক্স’ প্রতিষ্ঠিত হলে নরসিমহান সেই বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান হন। ১৯৯২ সালে তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফাণ্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে অবসর নেন এবং ট্রিয়েস্টিতে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’-এ গণিত বিষয়ে একটি গবেষক-দলের প্রধান নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে প্রিন্সটনের নিউ জার্সিতে অবস্থিত ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’-তে একজন অতিথি অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন এম. এস. নরসিমহান। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ সংস্থা থেকে অবসর নেওয়ার পরে ব্যাঙ্গালোরে স্থায়ী হন তিনি।

১৯৭৫ সালে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কারে ভূষিত হন নরসিমহান। ১৯৮৭ সালে গণিতের উপর তাঁকে থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স পুরস্কার দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৮৮ সালে নরসিমহান শ্রীনিবাস রামানুজন পদক অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে নরসিমহান ফরাসি ‘অর্ডার অফ মেরিট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৯০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০৬ সালে কিং ফয়জল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পুরস্কারে ভূষিত করা হন তিনি। সেই বছর ইম্পেরিয়াল কলেজের সিমোন ডোনাল্ডসনও এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ২০২১ সাল পর্যন্ত এম. এস. নরসিমহানই ছিলেন একমাত্র কিং ফয়জল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পুরস্কারের প্রাপক।

তাঁর বিখ্যাত কিছু গবেষণাকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘স্টেবল অ্যাণ্ড ইউনিটারি ভেক্টর বাণ্ডলস অন এ কম্প্যাক্ট রিম্যান সার্ফেস’ এবং ‘দ্য কালেক্টেড পেপারস অফ এম. এস. নরসিমহান’। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত শাস্ত্রের অনুরাগী ছিলেন, একইসঙ্গে সমকালীন চিত্রকলা এবং তামিল সাহিত্যের উপরও তাঁর বিশেষ চর্চা ছিল।

২০২১ সালের ১৫ মে ৮৮ বছর বয়সে ব্যাঙ্গালোরে এম এস নরসিমহানের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়