সববাংলায়

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত 

ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (Dhirendranath Datta) অধুনা বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত বাঙালি আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং রাজনীতিবিদ। তিনি অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আবার দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেই সময় তিনি পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া যে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গোড়াপত্তন হয়, তার মূলে ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনিই দৃঢ়ভাবে সর্বপ্রথম ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলাই চাই। এইজন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁর উপর চরম অত্যাচার করেছিল। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামটি আজও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলায় অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জগবন্ধু দত্ত পেশাগতভাবে ছিলেন একজন নিম্ন পদস্থ আইনজীবী। পারিবারিক আবহে তিনি ন্যায়নিষ্ঠা ও আদর্শবাদের শিক্ষা পেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সুরবালা দাসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ থেকে এফ.এ. এবং ১৯০৮ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীকালে ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি (B.L.) অর্জন করে ওকালতি পেশার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।

এক নজরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনী:

  • জন্ম: ২ নভেম্বর, ১৮৮৬
  • মৃত্যু: ২৯ মার্চ, ১৯৭১
  • কেন বিখ্যাত: ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক এবং পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক ।
  • পুরস্কার: কুমিল্লার স্টেডিয়াম ও একটি সড়কের নামকরণ তাঁর নামে করা হয়েছে এবং ইতিহাসে তিনি ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন।

আইনজীবী হওয়ার আগে তিনি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। কুমিল্লার বাঙ্গোরা উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে আইনের ডিগ্রি পাওয়ার পর ১৯১১ সালে কুমিল্লা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন এবং অতি দ্রুত একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে তিনি সরাসরি যোগ দেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেন। ১৯১৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁর ত্রাণ কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁকে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে অংশগ্রহণের পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের আহ্বানে তিনি ওকালতি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়।

১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বাচিত হন। এই সময় তিনি বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন এবং বঙ্গীয় কৃষিঋণগ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনী আইন পাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রায় নয় মাস কারাবন্দি করে রাখে। ১৯৪৬ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বঙ্গীয় আইনসভায় পুনরায় নির্বাচিত হন।

ভারত ভাগের সময় তিনি প্রথম থেকেই ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের দৃঢ় বিরোধিতা করেন। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলার বিভাজন অনিবার্য, তখন তিনি তাঁর নিজ জেলা পূর্ব পাকিস্তানের কুমিল্লায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের একজন হিন্দু সদস্য হিসাবে নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে তিনিই প্রথম দুঃসাহসিক দাবি উত্থাপন করেন যে, ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। তিনি যুক্তি দেন, সমগ্র পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বাঙালি। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার জন্যই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান। অথচ ভাষার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যে ভূমিকা পালন করেছিল তা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ফর্ম, খাম-পোস্টকার্ড, জমি বেচাকেনার জন্যে ভেন্ডার-এর স্ট্যাম্প উর্দু ভাষায় হওয়ায় সাধারণ বাংলাভাষী মানুষ কত দুর্ভোগ স্বীকার করে। সেইদিন আবেগতাড়িত কণ্ঠে মহম্মদ আলী জিন্নাহর সমানে তিনি যেভাবে যুক্তি তুলে ধরেন, তা পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এই প্রস্তাবকে লিয়াকত আলী খান ‘পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র’ এবং ‘পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা’ বলে আখ্যা দেন।

এরপর বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবীতে দিকে দিকে ধর্মঘট, মিছিল, পিকেটিং শুরু হয়। ধীরে ধীরে বাংলা ভাষার দাবী তুঙ্গে ওঠে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তানে গর্ভনর শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। গণআন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের ২১৪(১) নং অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দীর্ঘ সংগ্রামের বড় জয়। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও এই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এরপর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর আইয়ুব খান ১৯৫৯ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (EBDO) জারি করে। এই বিশেষ অধ্যাদেশের ফলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এই সময় তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকলেও পিছন থেকে উদীয়মান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করতেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। তবে তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরোধিতা করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শেখ মুজিবের ছয় দফাকে সমর্থন করেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কুমিল্লার বাড়ি থেকে এই অশীতিপর বৃদ্ধ নেতাকে তাঁর ছোট ছেলেসহ গ্রেপ্তার করে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে যায় ও অমানুষিক নির্যাতন চালায়। দীর্ঘ নির্যাতনের ফলে আপসহীন সংগ্রামী নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ শহিদ হন।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আপসহীন সংগ্রামকে পাকিস্তানি শাসকরা ভয় পেত, ফলে তারা নানা কৌশল খুঁজে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে দমন করার চেষ্টা করত। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্য হতে হয়েছিল তাঁকে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ হিসাবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রয়েছেন। কুমিল্লা শহরে এই মহান শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামে একটি সড়ক আছে। এছাড়া এই শহরের প্রধান স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম’।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading