সববাংলায়

রেজাং লা-র লড়াই

বিভাগঃ ,

রেজাং লা-র লড়াই (Battle of Rezang La) স্বাধীনতোত্তর ভারতের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক সামরিক সংঘর্ষ। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের এই লড়াইয়ের একদিকে ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কুমায়ুন রেজিমেন্টের ১৩তম ব্যাটালিয়ন-এর ‘সি’ কোম্পানি বা চার্লি কোম্পানি। আর অন্যদিকে ছিল এক বিশাল চিনা সেনাবাহিনী। এই লড়াইয়ে চার্লি কোম্পানির সৈন্যরা পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়াই গিরিপথের কঠিন পার্বত্য এলাকায় প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে যেভাবে লড়াই করেছিলেন তা বীরত্বের এক নিদর্শন হয়ে রয়েছে। রেজাং লা-র লড়াইয়ে ভারতীয় সেনারা অবিশ্বাস্য বীরত্ব দেখিয়ে বিপুল সংখ্যক চিনা সেনাকে হতাহত করেছিল। অবশেষে চিনা সৈন্যরা রেজাং লা দখল করতে সমর্থ হলেও চিনকে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত দেয়। তাই শেষ পর্যন্ত চিনা সৈন্যরা নিজেদের আগ্রাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তবে এই যুদ্ধে ১২০ জন ভারতীয় সেনার মধ্যে ১১৪ জন সেনাই নিহত হয়। অনেকে মনে করেন যে, রেজাং লা-র যুদ্ধে ভারতকে পরাজিত করে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ভারতীয় সেনার এলাকা দখল করে নিলেও এই যুদ্ধে ভারত কৌশলগত বিজয় লাভ করেছিল। রেজাং লা লড়াইয়ের নায়ক মেজর শয়তান সিং তাঁর অসাধারণ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্য মরণোত্তর পরমবীর চক্র পুরষ্কার পেয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাদের অদম্য মনোবল, বীরত্ব, সাহস, দৃঢ় সংকল্প ও দেশের প্রতি চরম আত্মত্যাগের জন্য রেজাং লা-র যুদ্ধটি অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। পরবর্তীকালে এই লড়াই ভারতীয় সামরিক লোককথার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

১৯৬২ সালের ১৮ নভেম্বর লাদাখের চুশুল সেক্টরে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর প্রায় ১৬,০০০ ফুট থেকে ১৮,০০০ ফুট উচ্চতায় ভারত ও চিনের মধ্যে রেজাং লা-র লড়াই সংঘটিত হয়। মূলত আহির সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে গঠিত ১৩ কুমায়ুন রেজিমেন্টের চার্লি কোম্পানির ১২০ জন ভারতীয় সৈন্য হাজার হাজার চিনা সৈন্যের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করেছিল।

ভারতের রেজাং লা হল লাদাখের চুশুল সেক্টরের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে অবস্থিত একটি উঁচু পার্বত্য গিরিপথ। এটি ভারত-শাসিত লাদাখ এবং চিন-শাসিত স্পাংগুর লেক অববাহিকার সীমান্তে অবস্থিত। এছাড়া এই রেজাং লা লাদাখের দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এমন একটি স্থান, যা ভারতের চুশুল বিমানঘাঁটি সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-চিন যুদ্ধের সময় চিনা সৈন্যেরা চুশুল বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে লেহ দখল করার পরিকল্পনা করে। অনুমান করা হয় যে, সেই সময় চিন যদি একবার রেজাং লা অতিক্রম করতে পারত তাহলে শুধু লেহ না, তারা লাদাখের অধিকাংশ অংশ নিজেদের দখলে নিয়ে নিতে পারত।

ব্রিটিশরা ভারতের আহির সম্প্রদায়ের মানুষদের সাহসী যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করত। তাই তারা আহির সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে সেনাবাহিনীতে এক বিশেষ কোম্পানি গঠন করে। আহির ও অন্যান্য সৈন্যদের নিয়ে গঠিত ১৯তম হায়দ্রাবাদ রেজিমেন্ট প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে লড়াই করে। এরপর এই রেজিমেন্টকে পুনর্গঠন করে আধুনিক কুমায়ুন রেজিমেন্ট তৈরি করা হয়। রেজাং লা-য় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৩তম কুমায়ুন রেজিমেন্টের চার্লি কোম্পানিকে মোতায়েন করা হয়। এই বাহিনীর বেশিরভাগ সৈনিক ছিল আহির সম্প্রদায়ের। অপ্রস্তুত এবং সংখ্যায় কম থাকা সত্ত্বেও তাদের উপরই ভারতীয় অঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

চিন রেজাং লা ও গুরুং হিলে একসাথে আক্রমণ শুরু করেছিল। ১৯৬২ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে প্রায় মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তীব্র ঠান্ডার মধ্যে মেজর শয়তান সিং- এর নেতৃত্বে ১২০ জনের কোম্পানি রেজাং লা রক্ষা করার জন্য এগিয়ে যায়। ওই এলাকার তাপমাত্রা আবার কখনও কখনও মাইনাস ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও পৌঁছে যেত।

সেই সময় চিনা সৈন্যেরা রেজাং লা আক্রমণ করতে এলে মেজর শয়তান সিং সেনাদের রাইফেল, এলএমজি এবং ৩-ইঞ্চি মর্টার দিয়ে শত্রু সৈন্যদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও তিনি আত্মরক্ষার তোয়াক্কা না করে এই যুদ্ধে সাহসিকতার সাথে নিজের সৈন্যদের নেতৃত্ব দেন। তিনি সেই সময় এক পোস্ট থেকে অন্য পোস্টে গিয়ে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে তুলতেন। এরপর নানা দিক থেকে চিনা সৈন্যরা আক্রমণ করলেও ভারতীয় সেনারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাদের লড়াই চালিয়ে যায়। ভারী গোলাবর্ষণ ও প্রচণ্ড আক্রমণ সত্ত্বেও মেজর শয়তান সিং ও তাঁর সৈন্যবাহিনী ভোর রাতে প্রায় ১৮,০০০ ফুট উচ্চতায় হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে চিনা সেনার সাথে যুদ্ধ করে। তবে চিনের অবিরাম আক্রমণ সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনী কখনও নিজেদের ঘাঁটি ত্যাগ করেনি। সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তারা নির্ভুল গুলিবর্ষণ এবং হাতাহাতি লড়াইয়ের মাধ্যমে একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন।

এই কৌশলী আক্রমণের ফলে চিনা সৈন্যরা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। প্রাথমিক আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর তারা আরও কয়েক হাজার সৈন্য এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুনরায় আক্রমণ শুরু করেছিল। এরপর চিনা বাহিনী তাদের বিপুল জনবল ব্যবহার করে বারবার আক্রমণ করে। অবশেষে তারা ভারতীয় সেনাদের পরাজিত করে ও তাদের জায়গা দখল করে নেয়।

রেজাং লা-র যুদ্ধে প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতিকূলতা ভারতীয় সেনাদের বিভিন্ন অসুবিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই ব্যাটালিয়নের বেশিরভাগ সৈন্যই ছিল হরিয়ানা ও রাজস্থানের বাসিন্দা, তাদের এই রকম বরফের পরিবেশের মধ্যে থাকার অভ্যাস ছিল না। প্রচণ্ড ঠান্ডায় লড়াই করার জন্য তাদের না ছিল উপযুক্ত কোনও প্রশিক্ষণ, এবং না ছিল নঠাণ্ডা মোকাবিলার জন্য বিশেষ পোশাক । সেই সময় রেজাং লা-তে পৌঁছানোর জন্য ভালো রাস্তা না থাকায় সেখানে রসদ পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। রেজাং লা-র বরফে ঢাকা এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ভারতের গোলন্দাজ বাহিনী কামান নিয়ে যাওয়ার সময় নানা রকম বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। সেখানে ভারী আর্টিলারি গান মোতায়েন করাও সম্ভব ছিল না। মাঝখানে উঁচু পাহাড় থাকায় গোলন্দাজ বাহিনী বুঝতে পারত না যে, কোথায় গোলা ছুঁড়তে হবে। আবার প্রচণ্ড ঠান্ডায় ব্যাটারি জমে যাওয়ায় সেনাদের রেডিও সেটগুলোও ঠিক করে কাজ করত না, ফলে রেজাং লা-র বাহিনীর সাথে অন্যান্য বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে আক্রমণকারী চিনা বাহিনী এই যুদ্ধে ভারী আর্টিলারি এবং মর্টারের মতো আধুনিক অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল। এখানে ভারতীয় পদাতিক বাহিনীকে গোলন্দাজ ও অন্যান্য বাহিনীর সুরক্ষা ছাড়াই লড়াই করতে হয়। তারা এই যুদ্ধে শুধুমাত্র রাইফেল ও গ্রেনেড নিয়ে বীরত্ব আর সাহসের সঙ্গে হাজার হাজার চিনা সৈন্যের মোকাবিলা করে।

রেজাং লা-র যুদ্ধে ভারত ও চিনের সৈন্য সংখ্যা নিয়ে নানা মতভেদ আছে। উভয় পক্ষেই ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল, তবে কতজন নিহত হয়েছিল তা নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নানা সূত্র থেকে জানা যায় যে, এই যুদ্ধে ভারতের ১২০ জন সেনার মধ্যে ১১৪ জন সেনা নিহত হয়েছিল। এই যুদ্ধের কয়েক মাস পর বরফ গলে গেলে সৈনিকদের মৃতদেহগুলো তাদের পোস্টেই পাওয়া যায়। সেই সকল বীর সৈনিকদের অনেকেই তখনও তাদের হাতে অস্ত্র ধরে রেখেছিলেন। আর ভারতীয় বিবরণ অনুসারে, এই লড়াইয়ে ভারতীয় সৈন্য প্রায় ৩,০০০ এরও বেশি চিনা সৈন্যের মুখোমুখি হয়েছিল। তাদের মতে ভারতীয় সেনারা এই যুদ্ধে প্রায় ১৪০০ জনেরও বেশি চিনা সৈন্যকে হতাহত করেছিল। তবে চিনা সরকার এই তথ্য অস্বীকার করে। তাদের মতে, পুরো যুদ্ধে তাদের মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ৭২২ জন। তবে আন্তর্জাতিক অনেক বিশ্লেষক রেজিং লা-র লড়াইয়ে চিনের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি ছিল বলে মনে করে।

রেজাং লা-র যুদ্ধে মেজর শয়তান সিং-কে তাঁর অসামান্য নেতৃত্ব এবং বীরত্বের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান মরণোত্তর পরমবীর চক্রে ভূষিত করা হয়ে। এমনকি নানা সূত্র থেকে জানা যায় যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চিনারা ভারতীয়দের বীরত্বকে সম্মান জানিয়েছিল। রেজাং লা-র লড়াই ভারতীয় সৈন্যদের অদম্য সাহস, দক্ষতা ও সংকল্পের প্রতীক হয়ে রয়েছে। এই যুদ্ধে লড়াই করে নিহত সৈন্যদের বীরত্বকে স্মরণ করে রেজাং লা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে, যেমন, চুশুলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, হরিয়ানার রেওয়ারিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও পার্ক তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এবং কুমায়ুন রেজিমেন্টের সহযোগিতায় প্রতি বছর ১৮ নভেম্বর এখানে রেজাং লা-র সৈনিকদের বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া চুশুলের মেমোরিয়াল পার্কে একটি যুদ্ধের যাদুঘর রয়েছে এবং ফলকে ওই শহীদদের নাম খোদাই করা আছে। এছাড়া হরিয়ানার গুরগাঁওয়ে রেজাং লা-র সৈনিকদের উদ্দেশ্যে আরেকটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

এই যুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকদের অসাধারণ বীরত্ব প্রকাশিত হলেও এই যুদ্ধ ভারতের সামরিক দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে দেয়। মনে করা হয় যে, দুর্বল সরঞ্জাম, ভঙ্গুর পরিকাঠামো এবং উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অপর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের কারণেই ভারতের এই পরাজয় হয়েছিল। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ভারত-চিন যুদ্ধের পর চিন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর লাদাখের আকসাই চিন এবং অরুণাচল প্রদেশের কিছু অংশ দখল করে নিয়েছিল, যা বর্তমানে ভারত-চিন সীমান্ত বিরোধের মূল কারণ।

তবে অন্যদিক থেকে দেখলে এই যুদ্ধের পর ভারতের প্রতিরক্ষা নীতি আরও শক্তিশালী করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সরকারের মধ্যে বৃহত্তর সচেতনতা তৈরি হয়। পরবর্তীকালে ভারত শান্তির জন্য ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং যুদ্ধের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেয়।

রেজাং লা-র যুদ্ধ ভারতীয় সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে। রেজাং লা-র এই অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা নিয়ে বলিউডে ‘১২০ বাহাদুর’ (120 Bahadur) নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে অভিনেতা ফারহান আখতার মেজর শয়তান সিং-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সিনেমাটি নতুন প্রজন্মের কাছে ১৩ কুমায়ুন রেজিমেন্টের চার্লি কোম্পানির সৈন্যদের সেই অদম্য সাহস ও চরম আত্মত্যাগের ইতিহাসকে পুনরায় জীবন্ত করে তুলেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading