ধর্ম

নাটাই চন্ডী ব্রত

মঙ্গলচণ্ডী

নাটাই চন্ডী ব্রত অগ্রহায়ন মাসের প্রতি রবিবার পালন করা হয়। বলা হয় যারা এই ব্রত পালন করে থাকে তাদের সব অভাব দূর হয়ে সংসার ধন-রত্নে ভরে উঠে। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক দেশে এক সদাগর বাস করত। তার ফুটফুটে একটি ছেলে ও মেয়ে ছিল। সদাগরের বউ মারা যাওযায় সে আবার বিয়ে করে। কিছুদিন যাওযায় পর তার আবার দুটি ছেলেমেয়ে হয়। কিন্তু ছোটবউ-এর ছেলেমেয়ে দুটিকে বড়বৌএর বাচ্চাদের মতো সুন্দর দেখতে হয়নি বলে ছোটবউ-এর মনে খুব দুঃখ ছিল। একদিন ছোটবউ সদাগরকে বলল, “এইভাবে বসে বসে আর কদিন চলবে?এইবার বাণিজ্য করতে বেরোও।”
তা শুনে সদাগরের মনে ভাবনা হল। কারণ তার প্রথম পক্ষের দুই ছেলেমেয়ের প্রতি ছোটবউএর কেমন মনোভাব তা সদাগরের জানা ছিল। তাই সে লুকিয়ে গোয়ালা ও ময়রাকে ডেকে বলে গেল তার ওই ফুটফুটে ছেলেমেয়ে দুটিকে তারা যেন রোজ খাবার দেয়। বাণিজ্য করে দেশে ফিরে সে তাদের সব দাম মিটিয়ে দেবে। এরপর ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে খুব কেঁদে, মা চন্ডীকে স্মরণ করে ,শুভ দিন দেখে সদাগর বাণিজ্য করতে বাইরে গেল। কিছুদিন যাওয়ার পর ছোটবউ রাখাল ছাড়িয়ে দিল এবং  বড়বৌএর বাচ্চাদের দিয়ে মাঠে গরু চড়াবার কাজ করাতে লাগল। তারা সারাদিন মাঠে গরু চরাবার পর বাড়ি ফিরলে ছোটবউ তাদের পান্তাভাত খেতে দিত। তারা তাইই আনন্দ করে খেয়ে নিত।
বড়বৌএর বাচ্চারা যখন মাঠে গরু চড়াতে যেত সেইসময় গোয়ালা ও ময়রা এসে তাদের দুধ ও নানারকম মিষ্টি খাইয়ে যেত। তাই তারা দিনদিন বেশ নাদুসনুদুস হয়ে যাচ্ছিল। তা দেখে ছোটবউএর তো বুক ফেটে যায়। সে ভাবে তার বাচ্চারা রোজ ক্ষীর, মাখন ,ফল খায় তাও শুকিয়ে যাচ্ছে আর পান্তাভাত খেয়ে কি করে ওরা দিনদিন গোলগাল সুন্দর হয়ে যাচ্ছে! একদিন ছোটবউ তার বাচ্চাদের ওদের সাথে মাঠে গরু চড়াতে পাঠাল যাতে সারাদিন ওরা কি করে তা সে জানতে পারে। সারাদিন পর চার ভাই বোন বাড়ি ফিরলে ছোটবৌ নিজের বাচ্চাদের খুব আদর করল এবং বড়বৌ এর বাচ্চাদের খুব বকাবকি করল। তা দেখে তার ছেলেমেয়ে বলল, “মা তুমি ওদের বোকো না ওরা খুব ভালো। আমাদের আজ কতকিছু খাবার খাইয়েছে আমরা তার নামও জানি না।”
ছোটবৌ এবার ওদের মোটা হবার কারণ বুঝতে পেরে গোয়ালা, ময়রাকে ডেকে বারণ করে দিল। তাদের বলল কর্তা চিঠি পাঠিয়েছে তার বড় অসুখ ,তার দুটো নৌকা ডুবে গেছে, সে আর টাকা দিতে পারবে না । তাই ওরা যেন বাচ্চাদের আর খাবার না দেয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

এইদিকে খেতে না পেয়ে তারা দিনদিন শুকিয়ে রোগা হতে থাকল। একদিন সকালে উঠে তারা মাঠে গরু,বাছুর চড়াতে গেছে। সারাদিন পর খিদের জ্বালায় তারা গাছ তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর উঠে দেখে তাদের গরু,বাছুর নেই। তারা তাদের গরুবাছুর খুজঁতে খুজঁতে এক গৃহস্থ বাড়ির সামনে হাজির হল। ফুটফুটে দুই ছেলেমেয়ে দেখে বাড়ির গিন্নি তাদের ডেকে ঘরে বসাল। তারপর তাদের সব কথা শুনল। সব শুনে গিন্নি বলল, “আজ তো অগ্রহায়ন মাসের রবিবার। আমাদের বাড়িতে নাটাইচন্ডীর পুজো। তোমরাও এই ব্রত করো তোমাদের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।”
তারাও সেইমতো তাই করল। তারপর বাড়ির গিন্নি বলল “এবার তোমরা মা চন্ডীর কাছে বর চেয়ে নাও”
তা শুনে ছেলেমেয়ে দুটো বলে তাদের বাছুরগরু ফিরিয়ে দিতে। এই শুনে সবাই তো হেসে অস্থির। গিন্নি বলে, “ও আবার কি রকম বর চাওয়া। মা চন্ডীকে বল যেন তোদের বাবাকে চোদ্দডিঙি ধন-হিরে-মানিক, রাজকন্যা , রাজপুত্র নিয়ে দেশে ফিরিয়ে দেয়। আর বল মা চন্ডী আমাদের সব দুঃখ দূর করে দাও।”
তারপর গিন্নি তাদের ভালোমন্দ খাইয়ে দুদিন তাদের বাড়িতে থাকতে বলল।

ওই দিকে সদাগর চোদ্দডিঙি ধনহিরে রাজকুমার রাজপুত্র নিয়ে দেশে ফিরল। সদাগর বাড়ি এলে ছোটবৌ কেঁদে অস্থির। সে বলে ছেলেমেয়ে গুলো কোথায় গেছে এখনো বাড়ি আসেনি লোকে বলছে তাদের বাঘে খেয়েছে। সদাগর সে কথায় কান না দিয়ে তাদের খুঁজতে বেরোয়। খুঁজতে খুঁজতে দেখে ছেলেমেয়েরা পথে গরু চড়াচ্ছে। তাদের ফিরে পেয়ে সদাগর বুকে করে খুব আদর করল।
ওই দিকে ছোটবৌ সদাগরের ধন, হিরের বালা, টাকা যত পারে নিয়ে বাগানে পুঁতে আসছিল। এই ভাবে যাওয়া-আসা করতে করতে সে পাত-কুয়োতে পরে মারা যায়। তা দেখে তার বাচ্চারা কাঁদতে থাকে। সদাগর তার বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখে চারিদিক লোকে লোকারণ্য, বাগানে ছোট বাচ্চারা দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সে সব বুঝতে পেরে চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে যায়।তারপরে ছোটবৌএর পারলৌকিক কাজকর্মের পর রাজকুমার ও রাজকুমারীর সাথে বড় মেয়ে ও ছেলের বিয়ে দেয়। যে গৃহস্থ বাড়ির গিন্নি তাদের নাটাইচন্ডীর ব্রত করিয়েছিল সদাগর তাদেরও অনেক ধন দান করে। আর তার ছেলেরা ছোটবৌএর ছেলেমেয়েকে নাটাইচন্ডীর ব্রত করতে শিখিয়ে দেয়। সেই থেকে নাটাইচন্ডীর ব্রত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রতটি ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৭৯
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৫৪

1 Comment

1 Comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন