ধর্ম

হাটখোলার দত্তবাড়ির পুজো

কলকাতা জুড়ে বনেদী দুর্গাপুজোর ছড়াছড়ি। নাম করতে গেলে এখনই দশ-বারোটি পুজোর নাম লেখা হয়ে যাবে। প্রাচীন জমিদারি প্রথার স্মারক বুকে নিয়ে আজও কলকাতার বুকে দণ্ডায়মান জমিদারবাড়িগুলিতে দেবীর আবাহন হয় নিষ্ঠাভরে। কোথাও দশমহাবিদ্যারূপী দেবী, কোথাও দেবী অশ্ববাহিনী, কোথাও আবার দেবী প্রতিমার পাশে জয়া-বিজয়ার অধিষ্ঠান। লক্ষণীয় বেশিরভাগ বনেদি পুজোই গড়ে উঠেছে উত্তর কলকাতাকে কেন্দ্র করে। দর্জিপাড়ার মিত্রবাড়ি, শোভাবাজার রাজবাড়ি, রানি রাসমণির জানবাজারের বাড়ি, লাহাবাবুদের বাড়ি, লাটুবাবু-ছাতুবাবুদের বাড়ি ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি জমিদারবাড়িতেই বনেদি দুর্গাপুজোর ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সেইরকমই আহিরীটোলা জোড়াবাগান থানার কাছেই ৭৮ নং নিমতলা ঘাট স্ট্রীটে দীর্ঘ ২২৬ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে হাটখোলার দত্তবাড়ির পুজো। কলকাতার বনেদি পুজোগুলির মধ্যে আজও সমান ঐতিহ্যসম্পন্ন এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জগৎরাম দত্তের কথা, জড়িয়ে আছে।

জগৎরাম দত্ত ছিলেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান। ইতিহাস বলে জগৎরাম দত্তের পূর্বপুরুষ গোবিন্দশরণ দত্তের নামেই নাকি সেকালের গোবিন্দপুরের নামকরণ হয়েছিল। সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা এই তিন গ্রাম নিয়েই তৈরি হয়েছিল কলকাতা নগরী। সুদূর ইতিহাসপ্রসিদ্ধ কনৌজ থেকে এসে এই গোবিন্দপুরে বসবাস শুরু করে দত্ত পরিবার যা পরে আন্দুলে ছড়িয়ে যায়। আন্দুলের দত্ত চৌধুরী বাড়ির রামচন্দ্র দত্ত হাটখোলায় এসে বিরাট প্রাসাদোপম রাজবাড়িটি তৈরি করেন, সেসময় তাঁর পৌত্র জগৎরাম দত্ত বালক। পরে সেই জগৎরাম দত্ত এই নিমতলা স্ট্রিটের বাড়িতে প্রথম দুর্গাপুজো চালু করেন। কীভাবে তৈরি হল এই বাড়ির ঠাকুরদালান? শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। দ্বারকা, পুরী, কাশী, হরিদ্বার প্রভৃতি সব তীর্থস্থান থেকে নৌকা বোঝাই করে পবিত্র মাটি এসেছিল কলকাতার গঙ্গাঘাটে যা দিয়েই তৈরি হয়েছিল ঠাকুরদালান। এই অদ্ভুত অভিনব পরিকল্পনা করলেও কালের নিয়মে সেই ঠাকুরদালান ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, থাকার মধ্যে আছে শুধু উঠোন। যদি শীত এসে পড়ে, বসন্ত কী আর দূরে থাকে! ঠাকুরদালান নির্মাণ শেষ, এবার বাকি ছিল ঠাকুর পুজোটুকু। তাও শুরু হয়ে গেল ১৭৯৪ সালে। স্বাতন্ত্র্যে এই হাটখোলার দত্তবাড়ির পুজো আজও কলকাতার অন্য পুজোকে টেক্কা দিয়ে যায়। কাঠামো পুজো এখানে শুরু হয় উল্টোরথের দিন আর কাঠামো পুজোর পর থেকেই শ্রাবণ মাস নাগাদ এখানে দেবী প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যায়। দত্তরা কায়স্থ, তাই পুজোর কাজে সরাসরি কেউ অংশ নিতে পারতেন না বলে পরিবারের কুলগুরুই এই পুজো পরিচালনা করতেন, কিন্তু সে রীতি এখন আর নেই। পোশাকহীন ঠাকুরের গায়ের রঙ-তুলি দিয়ে আঁকা হয় পোশাক। তবে বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে বারোজন পণ্ডিত এই পুজোর আগে থেকে বিসর্জন পর্যন্ত দুর্গা ও চণ্ডী নাম জপ করেন হাটখোলার দত্তবাড়ির পুজোয়। দুর্গার বাহন সিংহ এখানে অশ্বমুখী। আর চালচিত্রের মধ্যে একদিকে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি, একদিকে কালী আর রাম-সীতা থাকে। চালচিত্রের নীচে বিষ্ণুর দশাবতারের মূর্তি খোদাই করা থাকে দত্তবাড়ির দেবী প্রতিমা। সেকালে নবদ্বীপ থেকে শিল্পী শিবপ্রসাদ, কাঞ্চন প্রমুখরা আসতেন প্রতিমা রং করার জন্য। দেবী দুর্গার আবাহন হয় এখানে ষষ্ঠীর দিন, বেল বরণের মাধ্যমে দেবীর আবাহনের রীতি আজও সমানভাবে প্রচলিত আর এই সময়েই কেবল পারিবারিক কুলদেবতাকে নীচে নামানো হয়। কায়স্থ হওয়ার কারণে অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিতে পারেন না এই বাড়ির লোকেরা। তবে নবমী পুজোর দক্ষিণান্ত উপাচার শেষ হলে তারপর একমাত্র বাড়ির লোকেরা অঞ্জলি দিতে পারেন। দশমীর দিনে এখানে ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের মতোই সিঁদূর খেলা হয় না, বরং অষ্টমীর দিনে দেবী দুর্গাকে সিঁদূর পরানোর পরেই এখানে বাড়ির মহিলারা একে অপরকে সিঁদূর পরিয়ে দেন। বলির রীতি আগে প্রচলিত থাকলেও পরবর্তীকালে তা বন্ধ হয়ে যায়, তার বদলে এখানে অষ্টমীর দিন ক্ষীরের পুতুল বলি দেওয়া হয়। জিলিপি, নিমকি, খাজা, দরবেশ, মতিচুর, পোলাও ইত্যাদি সবই ঘিয়ে ভেজে ভোগ অর্পণ করা হয় দেবীকে। হাটখোলার দত্তবাড়িতে আরো নানারকম ভোগের মধ্যে আলুছাড়া সিঙারা, পোস্ত দিয়ে বানানো গজা খুব বিখ্যাত। মেদিনীপুর থেকে বামুন এসে এইসব মিষ্টি তৈরি করতেন দত্তবাড়ির ভিয়েনে। স্বদেশপ্রেমের জোয়ারে সে সময় ভাসছে আপামর বাংলা। এই দত্তবাড়িও তার থেকে পৃথক নয়। অন্য বনেদি বাড়িতে যখন ব্যবসায়ীদের বাবুদের ধনসম্পদের জাঁকজমক প্রধান হয়ে উঠছে, সেখানে দত্তবাড়িতে বিসর্জনের পরে দশমীর দিন বাড়ির সকলে মিলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে আসতেন। বহু প্রাচীনকালে নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানোর পাশাপাশি একটি বাছুরকে বেঁধে রাখা হতো ঠাকুরদালানে। বিসর্জনের পরে ফিরে এসে তার পা ধুইয়ে তাকে ধরে উঠোন প্রদক্ষিণ করেন পরিবারের লোকেরা যাকে বৈতরণী পার বলা হয়। আসলে দত্তদের বিশ্বাস দেবীকে বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে যে পাপ হয়, তা স্খালন করার জন্য গোমাতার পূজা করা হয়, একইসঙ্গে দুর্গার রূপ ভগবতীর আরাধনাও করতেন দত্তরা, তবে সেই রীতি আজ আর নেই। আজও দেবী প্রতিমা বিসর্জনের পরে দত্তবাড়ির সকলে এই গান গাইতে গাইতে ফিরে আসেন নিজগৃহে। দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক এই রীতিই চিনিয়ে দেয় বাবুয়ানির মাঝেও দত্তদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল জাতীয়তাবোধ।

বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


2 Comments

2 Comments

  1. Pingback: পাথুরিয়াঘাটার দুর্গাপুজো | সববাংলায়

  2. Pingback: কুমোরটুলীর পুজো | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

অর্জুনের পুত্রকে কেন বিয়ে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন সেই ভিডিও

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য