ধর্ম

লাহাবাড়ির পুজো

শ্যামবাজার থেকে ট্রাম ধরে টুকটুক করে পৌঁছে যাবেন যখন ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, নেমে পড়বেন তক্ষুণি। কালীবাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন আর ঠিক তখনই উল্টোদিকের লাল পাথরের বাড়িটার নেমপ্লেটে চোখ যাবে আপনার। পুজোর সময় হলে এই বাড়িতে আপনাকে ঢুকে পড়তেই হবে। হ্যাঁ, এটাই সেই সুপ্রাচীন লাহাবাড়ি। কলকাতার বনেদি পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত আরেক দৃষ্টান্ত। রানি রাসমণির পুজো, সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো, শীলবাড়ির পুজো সবই তো এই কলকাতার বুকেই আর এগুলির পাশে আজও লাহাবাড়ির পুজো চলে আসছে সমান গুরুত্ব নিয়ে ও একই ঐতিহ্যবাহিত হয়ে। শিবের কোলে দুর্গার এমন মোহনীয় রূপ কলকাতার আর কোথাও দেখা যায় না।

লাহাবাড়ির পুজোর প্রকৃত প্রবর্তক আসলে কে তা নিয়ে অতীতে জলঘোলা অনেক হলেও সদুত্তর বিশেষ মেলেনি। তবে ধরে নেওয়া হয়েছে যে বংশের প্রথম পুজো করেন বনমালী লাহা তাও আবার বর্ধমানের বড়শূল গ্রামে। তারপরে লাহা বংশের মধুমঙ্গল লাহা পুজো করেন চূঁচুড়ায়। সবশেষে কলকাতায় দূর্গাচরণ লাহা প্রথম এই দুর্গাপুজো চালু করেন। তবে এই পুজো আরো সমৃদ্ধ আরো বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে শিবচরণ লাহার সময়ে। প্রাচীন কলকাতার ‘ল’ বাড়ি’ নামে পরিচিত এই বাড়ির সম্পদের প্রাচুর্য আর জাঁকজমকের পাশাপাশি বৈষ্ণবমতে পুজোর রীতি এখানকার স্বাতন্ত্র্যের সূচক। একসময় শোনা যায় এই দুর্গাপূজার আয়োজন-সম্ভার নিয়েই প্রতিযোগিতা চলতো বাবুদের মধ্যে। আর এই প্রতিযোগিতায় কম যাননি লাহারা। তবে ধীরে ধীরে এই দেখনদারি কমে এসে ভক্তিমার্গে আশ্রয় নিয়েছে লাহাবাড়ির পুজো। বর্তমানে বাড়ির তিন প্রজন্ম প্রাণকৃষ্ণ লাহা, নবকৃষ্ণ লাহা আর শ্রীকৃষ্ণ লাহার হাতে পালা করে প্রতি বছর পূজিত হন দেবী দুর্গা। শিবের কোলে অস্ত্রবিহীন দুর্গার উপস্থিতি এখানকার বিগ্রহে। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে উপবিষ্ট নন, দেবীর এখানে বরাভয় মূর্তি। দুই হাত বিশিষ্ট দেবীর দুই পাশে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী উপবিষ্ট আছেন। শিবের বাহন ষাঁড়ের অবস্থানও এখানে লক্ষণীয় যা অন্যত্র কোনো দেবীমূর্তিতেই দেখা যায় না। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এই দেবীমূর্তিতে মহিষাসুর থাকেন না। অভয়া মূর্তি, হরগৌরী মূর্তি ইত্যাদি রূপে এখানে পূজিত হন দেবী দুর্গা।

জন্মাষ্টমী কেটে গেলেই দু-তিনদিন পর থেকে শুরু হয়ে যায় লাহাবাড়ির কাঠামো পুজো। দেবীর মূল পুজো শুরুর আগে পর্যন্ত একটি ছোট্ট মাটির গণেশকে দেবীরূপে পূজা করা হয় এখানে। বড়ো অদ্ভুত এই রীতি! পঞ্চমী আর ষষ্ঠীতে পরপর রচনা, কল্পনা আর অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। ষষ্ঠীর দিন সমস্ত রূপার অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে ওঠেন দেবী। তিল, নারকেল, সুজি, বেসন ইত্যাদি নানা স্বাদের নাড়ু তৈরি হয় এই লাহাবাড়িতে ভোগের মিষ্টি হিসেবে। তাও মিষ্টির সংখ্যায় তা প্রায় একুশ প্রকারের। এই লাহাবাড়িতে না হয় অন্নভোগ, না হয় পশুবলি। তবে অষ্টমীর দিন পুজোর পরে বাড়ির মহিলারা মাথায় আর দুই হাতে সরায় চাপানো জ্বলন্ত ধুনো নিয়ে বসেন ঠাকুর দালানে। এটাই অভিনব রেওয়াজ লাহাবাড়ির মহিলাদের। নবমীর দিন দেবীর সামনে খই, মুড়কি, মিষ্টি একটা হাঁড়িতে ভরে তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয় যে পদ্ধতিকে বলা হয় ‘কোলহাড়ি’ দেওয়া। ধীরে ধীরে দশমী চলে আসে। বেলপাতায় দেবীর নাম লিখে বাড়ির পুরুষেরা অর্পণ করেন দেবীকে। দশমীর অঞ্জলিপর্ব সারেন পুরুষরাই। তারপর কুলিদের কাঁধে চড়ে দেবী দুর্গা যান বিসর্জনে। এরপরের প্রথাটি বেশ অভিনব। বিসর্জন সেরে বাড়ি ফিরে আসেন পুরুষরা, বন্ধ দরজার বাইরে থেকে জিজ্ঞাসা করেন মা আছেন কিনা আর ভিতর থেকে মহিলারা জানান মায়ের অবস্থানের কথা। এভাবে তিনবার পরপর জিজ্ঞাসা করার পরে পুরুষরা দরজা খুলে ভিতরে ঢোকেন। এমন রীতি-রেওয়াজ কলকাতার অন্য কোনো বনেদি বাড়িতে দেখা যায় না। এইসমস্ত অভিনবত্ব আর ঐতিহ্যবাহী রীতি-নীতি নিয়েই আজও কলকাতার বুকে জেগে আছে লাহাবাড়ির দুর্গাপুজো।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

অর্জুনের পুত্রকে কেন বিয়ে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন সেই ভিডিও

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য