ইতিহাস

শ্যামবাজার

কলকাতার মানচিত্রে বেশ কিছু 'বাজার' আছে, যেমন  বাগবাজার, শ্যামবাজার, লালবাজার, বৌবাজার ( বহুবাজার), আমিনীবাজার, চিনাবাজার, টেরিটিবাজার, ইত্যাদি৷ প্রত্যেকটি বাজারেরই আছে তার নিজস্বতা, আছে তার ইতিহাস। এইরকমই স্থাননামে প্রসিদ্ধ কলকাতার বাজার-গুলির মধ্যে এখানে  শ্যামবাজার নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হল।

পুরনো কলকাতার ঐতিহ্য নিয়ে যে অঞ্চলটি আজও স্বমহিমায় বিরাজমান সেটি হল শ্যামবাজার। কলকাতার উত্তরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি অতীতে সুতানুটির অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ শোনা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্যামবাজার সংলগ্ন হাতিবাগানে জাপানিরা বোমা নিক্ষেপ করেছিল, যদিও তা ফাটেনি৷

শ্যামবাজার

এবার আসা যাক নামকরণের প্রসঙ্গে, শ্যামবাজার অঞ্চলে অতীতে একটি বিখ্যাত বাজার ছিল, জন জেফানিয়া হলওয়েল এই বাজারটিকে চার্লস বাজার নামে অভিহিত করেছেন । অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতার এক বিশিষ্ট বাঙালি ধনী ব্যবসায়ী শোভারাম বসাক তাঁর গৃহদেবতা শ্যামরায়ের (কৃষ্ণ) নামানুসারে এই অঞ্চলের বর্তমান নামকরণটি করেন।

উত্তর কলকাতার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হল শ্যামবাজার । মূলত বস্ত্র বিপণন, অলঙ্কার বিপিণনপ এই অঞ্চলে হয়ে থাকে। শ্যামবাজার অঞ্চলে দুটি বড়ো বাজার রয়েছে, শ্যামবাজার বাজার ও হাতিবাগান বাজার। এই দুই বাজারের ফুটপাথগুলি হকারদের দখলে আর সেখানেই চলে পণ্য ব্যবসা৷

অঞ্চলটি বাজার ভিত্তিক তাই খেলার মাঠ এখানে বর্তমানে নেই তবে কলকাতার প্রসিদ্ধ মোহনবাগান ক্লাবের প্রথম মাঠ এখানকার মোহনবাগান রো-তে অবস্থিত। মোহনবাগান ভিলার একটি ফলক থেকে জানা যায় যে সেই মাঠটি ১৮৮৯-১৮৯২ সাল পর্যন্ত মোহনবাগান মাঠ ছিল৷

শ্যামবাজারের দ্বারিক ঘোষ ও সেন মহাশয়ের মিষ্টির দোকান আজও সমভাবে বিখ্যাত৷ অতীতের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান জলযোগ ও রেস্তোরাঁ গোলবাড়ি খাদ্য রসিক মানুষের কাছে সুপরিচিত।

শ্যামবাজার নিয়ে আলোচনায় বসতে হলে, শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ের ছোটো করে একটা বিবরণ দিতে হয়৷ তখনকার কথা, সেই সময়ে সুতানুটি অঞ্চলে বড়ো রাস্তা বলতে কেবল হালিশহর থেকে বড়িশা পর্যন্ত প্রসারিত একটি তীর্থযাত্রার জন্য তৈরী পথ ছিল। এই পথেরই একটি অংশে পরে চিৎপুর রোড (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি) নির্মিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হওয়ার পর থেকেই শ্যামবাজার অঞ্চলের সমৃদ্ধি শুরু হয়। লটারি কমিশন ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে ও পরবর্তীকালে লটারি কমিটি ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে পুরনো কলকাতার দেশীয় অঞ্চলগুলির রাস্তাঘাট নির্মাণের দায়িত্ব পায়। চৌরঙ্গী-চিৎপুর রাস্তাটির পাশাপাশি কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রসারিত প্রধান রাস্তাটি এই সময়ই তৈরী হয়েছিল৷

১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে মারাঠা দস্যুদের কলকাতা আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে তিন মাইল দীর্ঘ মারাঠা খাত খনন করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। শেষ পর্যন্ত কিন্তু মারাঠারা কলকাতা আক্রমণ করেনি। পরবর্তীতে ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এই খাতটি বুজিয়ে সার্কুলার রোড নির্মিত হয়। এই রাস্তাটি শ্যামবাজার থেকে ময়দান পর্যন্ত প্রসারিত ছিল, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এটি পাকা রাস্তা করা হয়। এই সময় উত্তর দক্ষিণ সংযোগকারী বেশ কিছু রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল৷ তখনই ব্যারাকপুর পর্যন্ত একটি নতুন রাস্তা যা বর্তমানে ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড বা বিটিরোড ও বিধান সরণির কিছু অংশ ও আর. জি. কর রোড এই সময়েই নির্মিত হয়েছিল। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ-এর একটি প্রসারিত অংশ যার শ্যামবাজারের দিকের অংশটির নাম ভূপেন বোস অ্যাভেনিউ শ্যামবাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এইভাবে পাঁচটি রাস্তা একত্রিত হয়ে গড়ে ওঠে শ্যামবাজারের বিখ্যাত পাঁচমাথার মোড়; যা বর্তমানে কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত মোড়।

১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ঘোড়ায় টানা ট্রামের পরিষেবা শ্যামবাজার পর্যন্ত প্রসারিত করা হয়েছিল। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি ট্রাম বিদ্যুতায়িত করা শুরু করে এ ১৯০২ সালের মধ্যেই কলকাতা জুড়ে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম চালু হয়ে যায়। এরপরই ট্রাম পরিষেবা বেলগাছিয়া অবধি প্রসারিত করা হয়। ১৯৪১ সালে সার্কুলার রোডে ট্রাম চালু হয়। বলাবাহুল্য এর পর দীর্ঘদিন ট্রামই ছিল কলকাতার একমাত্র গণ পরিবহন মাধ্যম। ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় মোটরগাড়ি চালু হয়েছিল তবে মোটর বাস চালু হয়েছিল ১৯২০ সালে। পাঁচমাথার মোড়ের কাছেই বিধান সরণিতে শ্যামবাজার ট্রামডিপো অবস্থিত।

এতসব ছাড়াও যে কারণে শ্যামবাজার বিখ্যাত তা হল বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে। শ্যামবাজারের বিধান সরণিতে রাধা, রূপবাণী, মিনার, মিত্রা ও দর্পণা নামে পাঁচটি সিনেমাহল পরপর অবস্থিত, এই কারণেই অঞ্চলটি সিনেমা পাড়া নামে খ্যাত৷ আর কাছেই অবস্থিত ফড়েপুকুরের টকি শো হাউস ইংরেজি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য একসময়ে বিখ্যাত ছিল।

১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বাংলা নাট্যপ্রযোজনা "বিদ্যাসুন্দর"  নবীনচন্দ্র বসু দ্বারা শ্যামবাজারের একটি ঘরোয়া থিয়েটারে মঞ্চায়িত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জনসাধারণের মধ্যে নাটকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক নাটক মঞ্চায়নের জন্য বাগবাজার অ্যামায়েচার থিয়েটার ও শ্যামবাজার নাট্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শ্যামবাজারের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্টার থিয়েটার। স্টার থিয়েটার কলকাতার একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন, এখানে নাট্যকার ও অভিনেতা গিরীশ ঘোষ বহু নাটক অভিনয় করেছেন৷ বর্তমানে এখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়ে থাকে৷ কলকাতার অন্যতম নাট্যগোষ্টী নান্দীকারের কেন্দ্রও শ্যামবাজারে৷
শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ের কাছে অবস্থিত সুভাষ চন্দ্র বসুর একটি পূর্ণ অবয়ব মূর্তি, যেটিকে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা পৌরসংস্থার পক্ষ থেকে স্থাপন করা হয়েছিল৷

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!