ইতিহাস

মারাদোনা

আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় দিয়েগো মারাদোনা (Diego Maradona)। পেশাদার ক্রীড়া জীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি ‘আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্স’ এবং ‘নাপোলি’ ক্লাবের হয়েই ফুটবল খেলেছেন। এছাড়াও বার্সেলোনা এবং বোকা জুনিয়র্স ক্লাবের হয়েও বহু সময় মাঠে নেমেছেন তিনি। শোনা যায়, আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ১৬৫টি ম্যাচ খেলার পর প্রায় পনেরো লক্ষ ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্স ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন মারাদোনা। ১৯৮২ থেকে শুরু করে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে মারাদোনা মোট চারটি ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ১৯৭৯, ১৯৮৭ ও ১৯৮৯ সালে মোট তিনটি কোপা আমেরিকা ফুটবল ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৮৬ সালে ইংল্যাণ্ডের বিপক্ষে তাঁর সেই বিশ্বখ্যাত গোলের স্মৃতি সকল বিশ্ববাসীর মনে আজও উজ্জ্বল। এই বিতর্কিত গোলটি ইতিহাসে ‘হ্যাণ্ড অফ গড’ নামে খ্যাত হয়ে আছে। এই ম্যাচেই করা তাঁর আরেকটি গোল ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে ফুটবল বিশ্বে। ১৯৮৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের জন্য গোল্ডেন বুট এবং ১৯৯০ সালে ব্রোঞ্জ বল জয় মারাদোনার ক্রীড়া জীবনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ২০০০ সালে তাঁকে পৃথিবীর আরেক ক্ষণজন্মা ফুটবলার পেলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ের শিরোপা’ দেওয়া হয়। এত উজ্জ্বল ক্রীড়া জীবনের পরেও মাদক সেবনের কারণে বেশ কিছুদিন তাঁকে খেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তারপরেও ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি হিসেবে দিয়েগো মারাদোনা আজও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের নাম।

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের লানুসের এক গোঁড়া রক্ষণশীল ক্যাথলিক পরিবারে দিয়েগো মারাদোনার জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। তাঁর বাবার নাম চিতরো দিয়েগো মারাদোনা এবং মায়ের নাম ছিল দোনা তোতা দালমা সালভাদ। তাঁদের আট সন্তানের মধ্যে মারাদোনা ছিলেন পঞ্চম সন্তান। প্রচণ্ড অভাবের পরিবারে তাঁর বাবাকে কারখানায় কাজ করতে হতো রাতদিন। ছোটো থেকেই মারাদোনার মধ্যে ফুটবলের প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ ছিল। লানুস প্রদেশে জন্ম হলেও মারাদোনা বড় হয়েছেন ভিলা ফিওরিতো অঞ্চলে। মাত্র দশ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার তৎকালীন একটি বিখ্যাত ক্লাব আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের কিশোরদের শাখা ‘লস সেবোলিতাস’-এ যোগ দেন মারাদোনা। এত কম বয়সে এত দক্ষতার সঙ্গে ফুটবল খেলতে পারার কারণে মারাদোনার নেতৃত্বে ‘লস সেবোলিটাস’ দলটি ১৩৬টি ম্যাচ ধরে অপরাজিত থাকে। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি পেয়ে যান ‘বল-বয়’ শিরোপা। এরপর মারাদোনার ১৬ বছরের জন্মদিনের দশ দিন আগে আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের বড়দের দলে যোগ দেবার আহ্বান আসে। ১৯৭৬ সালে পেশাদারি ফুটবল খেলায় তাঁর অভিষেক ঘটে যায় এভাবেই। সেই মরশুমেই আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্সের হয়ে স্থানীয় লীগে চ্যাম্পিয়ন হন মারাদোনা। তাঁর খেলার দক্ষতার প্রশংসা করে তাঁকে সকলে ডাকতে থাকে ‘ফিওরিতো’ নামে যার অর্থ ‘ফুলের মতো সুন্দর’।

১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পান মারাদোনা। আন্তর্জাতিক স্তরে ফুটবলের জগতে পা রাখেন তিনি। হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রথম জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামেন মারাদোনা। সেই প্রথম নীল-সাদা জার্সি গায়ে পড়ার সৌভাগ্য হল তাঁর। মাত্র ১৬ বছর ৪ মাস বয়সে মারদোনার নেতৃত্বে এই ম্যাচে ৫-১ গোলে হাঙ্গেরিকে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ আয়োজিত হলেও জাতীয় প্রশিক্ষক লুই মেনত্তির আপত্তিতে সেবারে মারাদোনাকে বিশ্বকাপে খেলতে দেওয়া হয়নি ফলে নেদারল্যাণ্ডসের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার জয়লাভের প্রত্যক্ষ অংশীদার হতে পারেননি তিনি। ১৯৭৯ সালে জাপানে আয়োজিত যুব বিশ্বকাপে মারাদোনার নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা জয়লাভ করে। এরপর ‘ফিফা অনূর্ধ্ব-২০’ দলে যোগ দেন তিনি আর এই দলের হয়েই প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন দলকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে আর্জেন্টিনাকে জেতান এবং তারপরে ১৯৭৯ সালের ২ জুন তারিখে সিনিয়র দলের হয়ে স্কটল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামেন মারাদোনা। এভাবেই চূড়ান্ত দক্ষতায় মাত্র ১৮ বছর বয়সেই দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ফুটবলারের স্বীকৃতি পান তিনি।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৮১ সালে আর্জেন্তিনোস জুনিয়র্স ছেড়ে ১৫ লক্ষ ইউরোর বিনিময়ে ‘বোকা জুনিয়র্স’ ক্লাবে নাম লেখান মারাদোনা। ১৯৮২ সালে স্পেনে আয়োজিত বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় মারাদোনাকে এবং দুর্ভাগ্যবশত সেই ম্যাচে হেরে গিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে আর্জেন্টিনা বাদ পড়ে যায়। এরপরে ইউরোপের বার্সেলোনা ক্লাবে ১১ লক্ষ পাউণ্ডের বিনিময়ে খেলতে শুরু করেন মারাদোনা এবং দুটো মরশুম বার্সেলোনার হয়ে খেলেন তিনি। ৫৮টি ম্যাচে বার্সার হয়ে মোট ৩৮টি গোল করেন মারাদোনা, সেইসঙ্গে কোপা দেল রে ও স্পেনীয় সুপার কাপ খেলাতেও বার্সেলোনার হয়ে খেলেন এবং যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন। এর পরে ইতালির ক্লাব নাপোলিতে ৪০ লক্ষ পাউণ্ডের বিনিময়ে যোগদান করেন এবং অবিশ্বাস্যভাবে মারাদোনার নেতৃত্বে ইতালির নাপোলি ক্লাব অন্যান্য সকল ইউরোপীয় ক্লাবকে টেক্কা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পায়। ১৯৮৬-৮৭ এবং ১৯৮৯-৯০ এই দুই মরশুমে মারাদোনার নেতৃত্বে ইতালির নাপোলি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে এবং মারাদোনা সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি অর্জন করেন। নাপোলি ক্লাবের হয়ে ১৯৮৭ সালের কোপা ইতালিয়া, ১৯৮৯ সালে উয়েফা কাপ, ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার কাপ খেলায় পরপর জয়লাভ করতে থাকেন মারাদোনা। ১৯৮৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপের আগে আগেই টটেনহাম দলের হয়ে খেলেন তিনি যে খেলায় ইন্টারজিওন্যালের বিপক্ষে ২-১ গোলে জিতে যায় টটেনহাম হটস্পার দলটি।

১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ মারাদোনার জীবনে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে দুটি কারণে স্মরণীয়। প্রথমত এই বিশ্বকাপেই ইংল্যাণ্ডের বিপক্ষে খেলায় দুটি গোল করে আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দেন তিনি। পাঁচ জন ইংরেজ ফুটবলারকে কাটিয়ে তাঁর দেওয়া গোল শতাব্দীর সেরা গোলের শিরোপা পায়। কিন্তু আবার এই ম্যাচেই প্রথম গোলটিকে সকলে হ্যাণ্ডবল বলে দাগিয়ে দেয়, মারাদোনা নিজে যাকে বলেছিলেন ‘হ্যাণ্ড অফ গড’। এই গোলটি নিয়ে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ফাইনাল খেলায় ৩-২ গোলে জয়লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। সেরা গোলদাতার সম্মান হিসেবে মারাদোনা অর্জন করেন সোনার বুট। সমগ্র বিশ্বে আর্জেন্টিনার দিয়েগো মারাদোনা হয়ে ওঠেন ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, কারো কাছে তিনিই ফুটবলের ঈশ্বর। পরবর্তীকালে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মারাদোনা সেই হ্যাণ্ড অফ গডের আসল সত্যটি উন্মোচন করেন। একইসঙ্গে নিন্দিত ও নন্দিত হয়েছেন তিনি এই গোলটির জন্য। তাঁর সম্মানে স্তাদিও আজতেকা কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামের সামনে মারাদোনার শতাব্দীর সেরা গোলের একটি প্রতিমূর্তি স্থাপন করে। নাপোলি ক্লাবের হয়ে খেলেও পরপর ম্যাচে নাপোলিকে জিতিয়ে যাচ্ছেন মারাদোনা। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ইতালির মাঠে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে খেলে নজর কাড়তে পারেননি নিষ্প্রভ মারাদোনা। এই বছরই ডোপিং কাণ্ডে ধরা পড়লেন মারাদোনা এবং ১৫ মাসের জন্য ইতালিতে খেলা থেকে নির্বাসিত হলেন তিনি। ইতালি থেকে দেশে ফিরে কোকেন সেবনের অপরাধে গ্রেপ্তার হন তিনি। শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে ৭০ হাজার ডলার জরিমানা হয় তাঁর। শোনা যায় নাপোলির সাধারণ মানুষই চাঁদা তুলে এই জরিমানার অর্থ সংগ্রহ করেছিল। পরপর দুটি বছর খেলার মাঠ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৯২ সালে স্পেনের সোভিয়া ক্লাবে যোগ দিলেও ২৬টি ম্যাচে মাত্র ৫টি গোল করে দেশে ফিরে আসেন মারাদোনা। ১৯৯৪ সালের আমেরিকা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার খেলতে নামেন মারাদোনা। এফেড্রিন সেবনের অপরাধে ফিফা থেকেও ১৫ মাসের জন্য নির্বাসিত হন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জীবনে মোট ৯১টি ম্যাচে ৩৪টি গোল করেছেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে সম্পূর্ণভাবে খেলা থেকে অবসর নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন মারাদোনা। কিন্তু খেলোয়াড় মারাদোনার থেকে প্রশিক্ষক মারাদোনা দক্ষতায় অনেক পিছনে ছিল। তার ফলে তাঁর প্রশিক্ষণে ২০১০ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে পরাজিত হয় আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের কোচ থেকেও ইস্তফা দেন তিনি এবং ২০১৩ সালে একটি স্থানীয় দলের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরিসংখ্যানের হিসেবে ১৭ বছরের ক্রীড়া জীবনে ৬৭৮টি ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ছিল ৩৪৫টি।

২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে অসুস্থ হয়ে দিয়েগো মারাদোনার মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও