খেলা

পিটার শিলটন

পিটার শিলটন

ইংল্যাণ্ডের এক কালজয়ী গোলরক্ষক হিসেবে পিটার শিলটন (Peter Shilton) বিশ্বখ্যাত হয়ে আছেন। অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের থেকে তিনি ইংল্যাণ্ডের পুরুষদের ফুটবল দলে বেশি খেলেছেন এবং ১২৫টিরও বেশি কাপ জিতেছেন তিনি। ২০০০ সালে আইএফএফএইচএস (IFFHS) তাঁকে বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষকের সম্মান দেয়। তাঁর তিরিশ বছরের ক্রীড়া জীবনে ১০০টিরও বেশি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি এবং প্রায় হাজারটি লিগে অংশ নিয়েছেন। নটিংহাম ফরেস্ট ক্লাবের হয়ে খেলার সময় শিলটন ফার্স্ট ডিভিশন চ্যাম্পিয়নশিপ, দুটো ইউরোপিয়ান কাপ, ইউইএফএ কাপ এবং ফুটবল লিগ কাপ জেতেন। ১৯৮০তে ইউইএফএ ইউরো কাপে, ১৯৮২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে এবং ১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যাণ্ডের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন শিলটন। ১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপেই মারাদোনা তাঁর বিপক্ষে দুটি বিতর্কিত ও আশ্চর্য গোল করেছিলেন। ৩২ বছর বয়সের আগে তিনি ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে অংশ নেননি।

১৯৪৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ইংল্যাণ্ডের লেইসিস্টারে পিটার শিলটনের জন্ম হয়। ১৩ বছর বয়সে লেইসিস্টারের কিং রিচার্ড থ্রি বয়েজ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন তিনি। ১৯৬৩ সালে লেইসিস্টার সিটি নামের এক স্থানীয় ক্লাবে খেলতে শুরু করেন পিটার শিলটন। এরপর লেইসিস্টার ক্লাবের প্রথম গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কসের নজরে পড়েন তিনি। তিনিই সেই দলের প্রশিক্ষকের কাছে শিলটনের প্রশংসা করেন। পিটার শিলটন স্যু ফিল্টক্রফটকে বিবাহ করেন ১৯৭০ সালে, কিন্তু তাঁদের ৪০ বছরের দাম্পত্য সম্পর্কেও বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে জ্যাজ গায়িকা স্টেফানি হাওয়ার্ডকে বিবাহ করেন পিটার শিলটন।

১৯৬৬ সালের মে মাসে ১৬ বছর বয়সে লেইসিস্টার ক্লাবের হয়ে পিটার শিলটন প্রথম এভারটনের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর দক্ষতা ও ক্রীড়াশৈলী এতই নজর কাড়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের যে বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কসকে স্টক সিটি ক্লাবে সরিয়ে তরুণ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে দলে স্থায়ী জায়গা দেয়। ১৯ বছর বয়সে ওয়েম্বলের এফ এ কাপে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ গোলরক্ষক। সেই বছর ফাইনালে জিতলেও, এর পরে আর কখনও তিনি এফ এ কাপে অংশ নেননি। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে মাসে ৩ লক্ষ ২৫ হাজার পাউণ্ডের বিনিময়ে শিলটন স্টোক সিটি ক্লাবে যোগ দেন এবং ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে এই ক্লাবের হয়ে মোট ২৬টি ম্যাচ খেলেন তিনি। ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মকালে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ক্লাব ২ লক্ষ ৭৫ হাজার পাউণ্ডের বিনিময়ে গোলরক্ষক শিলটনকে কিনে নিতে চায়, স্টোক সিটি এই শর্তে রাজি হলেও শিলটনের পারিশ্রমিকের শর্তে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড রাজি হননি। সেই সময়ের সর্বাধিক বেতনভুক খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে নটিংহাম ফরেস্ট ক্লাব তাঁকে কিনে নেয় আড়াই লক্ষ পাউণ্ডের বিনিময়ে। ব্রায়ান ক্লঘের ব্যবস্থাপনায় নটিংহাম ফরেস্ট লিগ কাপ জেতে। এই মরশুমে মোট ৩৭টি ম্যাচে অংশ নিয়ে ১৮টি গোল রক্ষা করেছিলেন তিনি। তাঁর সহ-খেলোয়াড়দের নির্বাচনে পিটার শিলটনই সেই বছর ‘পিএফএ প্লেয়ারস প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৯ সালে নটিংহাম ফরেস্ট পুনরায় লিগ কাপ জেতে। ১৯৮০ সালে নটিংহাম ফরেস্ট প্রথমবার ইউরোপিয়ান ফাইনালে অংশ নেয় এবং মাদ্রিদে এসভি হামবুর্গের বিপক্ষে ম্যাচ জেতে। কিন্তু সেই সময়েই শিলটনের পরিবারের জুয়া খেলার নেশা, অন্যদিকে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এবং নেশাতুর অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে ৩৫০ পাউণ্ড জরিমানা করা হয় শিলটনকে। এই বদনামের জন্য বাধ্য হয়ে নটিংহাম ক্লাব ত্যাগ করেন তিনি। সাদাম্পটন ক্লাবে যোগ দেন তিনি এরপরে যেখানে তাঁর আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় বন্ধুদের মধ্যে কিগান আর অ্যালান বেলও খেলতেন। সাদাম্পটনের হয়ে এফ এ কাপ সেমি-ফাইনালে শেষ মুহূর্তের একটি গোল খেয়ে পরাজিত হন তিনি। ডার্বি ছেড়ে ৪২ বছর বয়সে ১৯৯১ সালে হাল সিটি ক্লাবের ম্যানেজার এবং প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পিটার শিলটন। ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্লি মাউথ আর্গিলের খেলোয়াড়দের ব্যবস্থাপক পদে ৩ লক্ষ পাউণ্ডের একটি চুক্তির বিনিময়ে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সেবার বহু চেষ্টা সত্ত্বেও প্লিমাউথকে জেতাতে পারেননি শিলটন। ১৯৯৪ সাল থেকে কেবলমাত্র ব্যবস্থাপনার দিকে মনোনিবেশ করেন তিনি, ঐ বছরই সাদাম্পটনের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

আবার এই বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে প্লিমাউথ ক্লাব ত্যাগ করে ৪৫ বছর বয়সে খেলতে নামেন তিনি। তাঁর নিজের পছন্দের এক গোলরক্ষক হ্যান্স সেগার্স আঘাত পাওয়ার কারণে তাঁর জায়গায় কিছুদিন উইম্বলডনের প্রিমিয়ার লিগে খেলেন শিলটন। পরবর্তীকালে বোল্টন ওয়াণ্ডারার্সের হয়ে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি এবং তারও পরে শিলটন যোগ দেন কভেন্ট্রি সিটি ক্লাবে। ইতিমধ্যে ৯৯৬টি ফুটবল ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ১৯৯৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ব্রাইটন অ্যাণ্ড হোভ অ্যালবিয়নের বিরুদ্ধে পিটার শিলটন তাঁর হাজারতম ম্যাচটি খেলেন। তাঁর এই রেকর্ড গিনেস বুকে স্থান পেয়েছিল। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম আন্তর্জাতিক স্তরে ইংল্যাণ্ডের হয়ে পূর্ব জার্মানির বিরুদ্ধে গোলরক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি। দেশের হয়ে শিলটন প্রথম প্রতিযোগিতাপূর্ণ ম্যাচে নামেন সুইজারল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের পর থেকেই ইংল্যাণ্ডের জাতীয় দলের বিকপ গোলরক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে গর্ডন ব্যাঙ্কস একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারালে ইংল্যাণ্ডের দলে গোলরক্ষক হিসেবে পিটার শিলটনের পাকা আসন তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে ইংল্যাণ্ড উত্তর আয়ারল্যাণ্ড, ওয়েলস এবং স্কটল্যাণ্ডকে পরাজিত করলে সেই ম্যাচগুলিতে মোট তিনটি ক্লিন শিটের স্বাক্ষর রাখেন শিলটন। স্কটল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে কেনি ডালগ্লিশের মারা শট বাঁ দিক থেকে লাফ মেরে ডান হাতে ধরেছিলেন শিলটন এবং এই গোল বাঁচানোর মুহূর্তটিকে তাঁর সেরা কিছু গোলরক্ষণের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ে এবং সুইজারল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে খেলে জয়লাভ করেছিল ইংল্যাণ্ড, তাছাড়া রোমানিয়ার সঙ্গে ড্র হয় এবং হাঙ্গেরিকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ইংল্যাণ্ড। প্রতিটি ম্যাচেই গোলরক্ষক হিসেবে শিলটনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এর ফলেই ইংল্যাণ্ড বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়। ৩২ বছর বয়সে পিটার শিলটন প্রথম তাঁর বিশ্বকাপ জয় করেন। ইংল্যাণ্ডও বিগত বারো বছরের মধ্যে প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপ জয় করে নেয়। রি ক্লেমেন্স নামে আরেক দক্ষ গোলরক্ষক থাকলেও, ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে খেলার জন্য গোলরক্ষক হিসেবে পিটার শিলটনকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল। ববি রবসন ইংল্যাণ্ড দলের ব্যবস্থাপক হয়ে আসলে পিটার শিলটনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার অনেকটাই মাহাত্ম্যে উন্নীত হয়। তাঁর সময়েই ইংল্যাণ্ড দলের হয়ে ১২৫টি ক্যাপের মধ্যে ৬১টি ক্যাপ জিতেছিলেন তিনি। সেই বছরই ইংল্যাণ্ডের হয়ে খেলে ৮০টি ক্যাপ অর্জন সম্পূর্ণ করেন তিনি যা গর্ডন ব্যাঙ্কসের রেকর্ডকেও ছাপিয়ে যায়। ১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপটি তাঁর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বিশ্বকাপেই ইংল্যাণ্ডের অধিনায়কত্ব লাভ করেন তিনি। আর্জেন্টিনার সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের একটি ম্যাচে ফুটবলের কিংবদন্তী মারাদোনা পিটার শিলটনের বিপক্ষে খেলেছিলেন। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো মারাদোনা ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ হলেও ইংল্যাণ্ডও প্রথমার্ধে খুব ভালো খেলেছিল। শিলটন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন ক্রমে, আর দ্বিতীয়ার্ধে এসে মারাদোনা খেলার কৌশলই বদলে দিয়েছিলেন। মারাদোনা এই সময় আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে পেনাল্টি অঞ্চল থেকে বল মেরে পিটার শিলটনের মাথার উপর দিয়ে গোল করেন। বল ধরার জন্য শিলটন এগিয়ে এসেছিলেন বলে সুযোগ হারান তিনি। যদিও পরে শিলটন এবং তাঁর দল দাবি করেছিল যে ঐ কিকের সময় মারাদোনার ডান হাত বলে স্পর্শ করেছিল। এ ছিল বিশ্বের এক অন্যতম বিতর্কিত গোল। ১৯৮৭ সালে গ্র্যাণ্ডস্ল্যাম এন্টারটেইনমেন্ট ‘পিটার শিলটন্স হ্যাণ্ডবল মারাদোনা’ নামে একটি কম্পিউটার গেম নির্মাণ করে। ১৯৯০ সালের ফিফা বিশ্বকাপেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। এই বিশ্বকাপে খেলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজীবনের ২০তম বর্ষপূর্তি করেন পিটার শিলটন। এত দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক স্তরের ফুটবলে অংশ নেওয়ার জন্য এক নতুন রেকর্ড করেন তিনি।

২০১৩ সালে মদ্যপান করে গাড়ি চালানোর অপরাধে ২০ মাস তাঁকে ইংল্যাণ্ডে এবং আন্তর্জাতিক খেলায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে ৪৫ বছরের জুয়া খেলার নেশা থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন।

বর্তমানে পিটার শিলটন ইংল্যাণ্ড সরকারের হয়ে নানাবিধ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকারের জন্য সচেতনতা প্রচারে অংশ নেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়