ধর্ম

সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রত

বৈশাখ মাসের সংক্রান্তি অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসে সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রত পালন করা হয়। এই দিন সাবিত্রী, সত্যবান ও ধর্ম রাজার পূজা করা হয়। বলা হয় এই ব্রত পালন করলে বৈধব্য যন্ত্রনা ভোগ করতে হয় না। সধবা মহিলারা এই ব্রত পালন করে থাকে। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক কালে মদ্র নামে এক রাজ্য ছিল সেই রাজ্যের রাজা অশ্বপতি-এর কোনো সন্তান না হওয়ায় সে পত্নী সহকারে সাবিত্রী দেবীর আরাধনা করে। চোদ্দ বর্ষ ব্রত পালন করে ব্রত উদযাপনের সময় তাদের আরাধনায় খুশি হয়ে সাবিত্রীদেবী তাদের আশীর্বাদ করেন যে সর্বসুলক্ষণাযুক্ত এক কন্যা জন্মগ্রহণ করবে। কালের নিয়মে রানী মালবী এক সুন্দর কন্যা সন্তান প্রসব করে এৰং তার নাম সাবিত্রী রাখে। দেখতে দেখতে সাবিত্রী বড় হয়ে বিবাহের যোগ্য হয়ে ওঠে। একদিন সাবিত্রী তার সখীদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে শাল্ব দেশের রাজ্যচ্যুত রাজা দ্যুমৎসেনের আশ্রমে এসে হাজির হয়। সেখানে তার পুত্র সত্যবানকে দেখে মনে মনে তাকে বর হিসাবে স্বীকার করে নেয় সে।

এই সময় যখন মহামুনি নারদ অশ্বপতির সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন রাজা নারদ মুনির সামনে তার কন্যাকে তার কোন পাত্র পছন্দ করা আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে সে সত্যবান-এর কথা জানায়। অশ্বপতি তখন নারদ মুনি কে সত্যবান এর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে নারদমুনি জানায় সে রাজা দ্যুমৎসেনের পুত্র। দ্যুমৎসেন এখন রাজ্য ছাড়া এবং তারা পতি পত্নী দুজনেই অন্ধ। আর সবচেয়ে বর কথা তাদের পুত্র সত্যবান তার বিয়ের ঠিক এক বছরের মাথায় মৃত্যু বরণ করবে।

এই শুনে অশ্বপতি বিবাহ দিতে রাজি না হলেও সত্যবতী সত্যবান কেই বিবাহ করবে বলে মনস্থির করে। অগত্যা রাজা অশ্বপতি ভালো দিন দেখে সত্যবান এর সাথে সাবিত্রী এর বিয়ে দেয়। সাবিত্রী বনে সত্যবানের আশ্রমে এসে তার অন্ধ শ্বশুর শাশুড়ি এর সেবা যত্ন করে সকলের প্রিয় হয়ে ওঠে আর মন দিয়ে সংসার করতে থাকে। কিন্তু নারদ মুনির ভবিষ্যৎ বাণী তার মনে খোঁচাতে লাগলো। যখন তাদের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র তিন দিন বাকি, তখন সাবিত্রী তিন দিন উপবাস থেকে ব্রত পালনের ইচ্ছেয় শ্বশুর শাশুড়ির অনুমতি নিয়ে বনের মধ্যে গেল। সত্যবানও তার সাথে বনে গেল। সে ফল ও কাঠ আনার জন্য বনের মধ্যে গেল আর তারপর সন্ধ্যে নামলে সত্যবান ক্লান্তি ও মাথা ব্যথার কারণে অসুস্থ হয়ে সাবিত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।

দেখতে দেখতে তার দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যায়। সেই দিন কৃষ্ণ চতুর্দশী থাকায় ঘন অন্ধকারে স্বামীর মরদেহ নিয়ে সাবিত্রী মাতা সাবিত্রীদেবীর এর নাম জপ করতে থাকে আর তার দেহ থেকে এক প্রকার আলো বেরোতে থাকে। তা দেখে যমদুতেরা সত্যবান এর প্রাণ বায়ু না নিয়ে যমালয়ে গিয়ে ধর্মরাজ কে জানায়। এই দিকে ধর্মরাজ সত্য বান এর প্রাণ বায়ু নিয়ে যাবার সময় দেখে সাবিত্রী তার পিছনে আসছে। ধর্মরাজ তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে ধর্ম রাজ এর স্তব করতে থাকে। তাতে খুশি হয়ে ধর্ম রাজ তাকে তিনটে বর দিতে চায়। সাবিত্রী তখন তার শ্বশুর শাশুড়ি এর চোখের জ্যোতি, শ্বশুরের রাজ্য আর তার বাবার একশত পুত্র হবার বর চায়।

ধর্মরাজ খুশি মনে তথাস্তু বলে তাকে বর দিয়ে আবার চলতে থাকে। চলতে চলতে দেখে সাবিত্রী আবার তার পিছনে আসছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে আবার সে ধর্মরাজ এর নাম জপ করতে থাকে। আবার খুশি হয়ে ধর্মরাজ সাবিত্রী কে বর দিতে চান। সাবিত্রী তখন বলে আমায় এই বর দিন যে সত্যবান এর ঔরসে আমার গর্ভে যেন শত পুত্রের জন্ম হয়। ধর্মরাজ তথাস্তু বলে চলে গেলে আবার তার পিছনে সাবিত্রী কে দেখতে পায় ধর্ম রাজ জিজ্ঞাসা করাতে সাবিত্রী বলে আপনি যে আমাকে সত্যবানএর ঔরসে পুত্র হবার আশীর্বাদ করলেন তাহলে আপনার ধর্ম রক্ষা পাবে কি করে, আপনি সত্যবান এর প্রাণ বায়ু ফিরিয়ে দিন আর আপনার ধর্ম রক্ষা করুন। এই শুনে ধর্মরাজ লজ্জায় পড়ে যায় আর সত্যবান এর প্রাণ বায়ু ফিরিয়ে দেন।

সাবিত্রীর স্বামী তারপরে জেগে ওঠে। ওদিকে  রাজা দ্যুমৎসেন এবং তার স্ত্রী জেগে সবকিছু দেখতে পান। তার মন্ত্রী এসেও খবর দেয় তার শত্রুবিনাশ হয়েছে। রাজাও রাজ্য ফিরে পায়। এইভাবে সাবিত্রী এই ব্রতর মাধ্যমে সব ফিরে পায়।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৬৬
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Savitri_Brata
  3. http://www.indiamarks.com/when-is-vat-savitri-in-2017/ (ছবিসুত্র)

 
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!