ইতিহাস

পেলে

বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হলেন পেলে (Pele)। ব্রাজিলের হয়ে তিন তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের খেতাব নিয়ে তিনি নিজেকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সবথেকে বেশি আলোচিত ও জনপ্রিয় অন্যতম সফল ফুটবলার ছিলেন পেলে। ফিফা-র (FIFA) তথ্য অনুযায়ী সারা জীবনে ১৩৬৩টি ম্যাচে মোট ১২৮৩টি গোল করে ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’-এ জায়গা করে নিয়েছেন পেলে। ২০০০ সালে আই.এফ.এফ.এইচ.এস (International Federation of Football History & Statistics)-এর তত্ত্বাবধানে সাংবাদিক ও বহু খেলোয়াড়দের ভোটের মাধ্যমে পেলে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হন। খেলা থেকে অবসর নেবার পর পেলে বহু টিভি সিরিজ এবং চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন যার মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত হল ১৯৮১ সালে নির্মিত ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ (Escape to Victory)।

১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক বস্তিতে জন্মেছিলেন পেলে। পেলের পুরো নাম ‘এডসন অ্যারানটিস দো নাসিমেন্তো’ (Edson Arantes Do Nasimento) । তাঁর বাবার নাম জোয়াও রামোস দো নাসিমেন্তো (Joao Ramos Do Nasimento) ওরফে ডনডিনহো (Dondinho) এবং মায়ের নাম সেলেস্তে আরান্তেস (Seleste Arantes)। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে পেলে ছিলেন সবার বড়। পেলের বাবাও ছিলেন একজন ফুটবলার, ব্রাজিলের ফ্লুমিনিস ক্লাবের হয়ে তিনি খেলতেন। পেলেকে ফুটবল খেলা শিখিয়েছিলেন তাঁর বাবাই, এক অর্থে তাঁর বাবাই ছিলেন পেলের ফুটবল খেলার আদর্শ। বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের নামের সঙ্গে মিল রেখে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘এডসন’। বস্তির বন্ধুরা পেলেকে চিনতো ‘ডিকো’ নামে। সাও পাওলোর বাউরু (Bauru) দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে পরিবারের অভাব অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই পেলেকে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। এছাড়া রেলস্টেশন ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি কিছুদিন জুতা পরিষ্কারের কাজও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। ফুটবল কেনার টাকা ছিল না বলে মোজার ভিতর কাপড়-কাগজ ভরে ফুটবল খেলা অভ্যাস করতেন পেলে তাঁর বস্তির গলিতে। ফুটবলে তাঁর সেই সহজাত প্রতিভা গলির ভিতর থেকেও চোখে পড়েছিল সান্তোসের (Santos) গ্রেট ওয়ালডেমার ডি ব্রিটো’র (Great Waldemar De Brito)। ব্রিটো ১৫ বছর বয়সী পেলেকে গলি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন স্যান্টোস ক্লাবে এবং অন্তর্ভুক্ত করেন স্যান্টোসের ‘বি’ টিমে। ১৯৫৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেলে সান্তোসের মূল দলের হয়ে ব্রাজিলের পেশাদার ‘সাও পাওলো ফুটবল লীগ’-এ সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ছিনিয়ে নেন। এরপরই ইউরোপের রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাসের মতো বড় বড় দলগুলোতে তাঁকে নেবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

পেলের পেশাদার ফুটবলার জীবন শুরু হয় ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস বয়সে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ২-১ গোলের ব্যবধানে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গেলেও, পেলে আন্তর্জাতিক স্তরে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার বিশ্বজোড়া সম্মান পান। সুইডেনে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ওয়েলসের বিপক্ষে পেলে একমাত্র গোল করে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয় ব্রাজিলকে। তারপর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে দুটি রেকর্ড গড়েন– সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এবং সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিকদাতা। এই বিশ্বকাপের পরে পেলেকে ব্রাজিল সরকার জাতীয় সম্পদ বলে ঘোষণা করে। ইউরোপীয়ান ক্লাবগুলি থেকে বহু সুযোগ এলেও তাঁর আর সেসব ক্লাবে খেলা হয়ে ওঠেনি এই কারণে। এরপর একে একে ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ খেলেন পেলে। এর মধ্যে তিনটে বিশ্বকাপ জয় করে (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) পেলে খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপে ২৮ বছর পর প্রথম পেলের দক্ষতায় ব্রাজিল বিশ্বকাপ জয় করে ১৯৫৮তে। মনে রাখতে হবে চারটি বিশ্বকাপে মোট ১৪ টি ম্যাচ খেলে ১২টি গোল, ১০টি সহযোগী গোল। বিশ্বকাপের দুটি ফাইনালে গোলের রেকর্ড একমাত্র রয়েছে পেলের ঝুলিতে। ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জিতে ‘জুলে রিমে ট্রফি’টি ব্রাজিলকে স্থায়ীভাবে এনে দিতে পেরেছিলেন পেলে। আর এই বিশ্বকাপের মধ্যে দিয়েই পেলের বিশ্বকাপ-কেরিয়ার শেষ হয়। বিশ্বকাপের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে ‘কোপা লিবার্তোদোস’, ‘ইন্টার-কন্টিনেন্টাল কাপ’ ইত্যাদিতে ১৩০টি ম্যাচে মোট ১৪২টি গোল করার কৃতিত্ব রয়েছে পেলের। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছরে জিতেছেন ব্রাজিলিয়ান লীগ, কাপ আর আন্তর্জাতিক ক্লাব টুর্নামেন্টের ২৭টি ট্রফি। ১৯৬৯ সালের ‘ভাস্কো দা গামা’ ক্লাবের বিপক্ষে ব্রাজিলের সান্তোস ক্লাবের হয়ে পেলে তাঁর ফুটবল-জীবনের হাজারতম গোলটি সম্পূর্ণ করেছিলেন।  

পেলের বিদ্যুৎ-গতির পাস চালনা, অনবদ্য গোল করার দক্ষতা তাঁকে জনপ্রিয় করেছে। বিশেষ জায়গায় বিপক্ষের খেলোয়াড়ের মনোভাব বুঝে সুযোগ না দিয়ে টেক্কা দেওয়াতে পেলে ছিলেন ‘মাস্টারপিস’। আদ্যন্ত পরিশ্রমী খেলোয়াড় হিসেবে সংক্ষিপ্ত পাস চালনার মধ্যে দিয়ে দলের সকলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের শৈলীতে পেলে সমগ্র ফুটবল খেলাটিকে দৃশ্যত আনন্দের করে তুলতেন। কেরিয়ারের শুরুর দিকে আক্রমণাত্মক পজিশনে খেললেও পরে পেলে স্ট্রাইকার অথবা সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনেই খেলতেন। তাছাড়া আক্রমণাত্মক মিড-ফিল্ডের মতো অন্য যেকোনো পজিশনে স্বচ্ছন্দে খেলতে পারতেন তিনি। তাঁর হেডিং কৌশল ছিল অসামান্য। অন্যান্য ডিফেন্ডারের থেকে বেশি উচ্চতায় লাফিয়ে উঠে হেড দিতে পারতেন তিনি। সর্বোপরি তাঁর অতি পরিচিত বেণ্ডিং শট ফ্রি কিক ও পেনাল্টি কিক নিতে সাহায্য করতো। বিখ্যাত ফুটবলার ক্রুয়েফ বলেছিলেন, ‘পেলে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন’। আবার ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ-জয়ী পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক বেকেনবাওয়ার বলেছিলেন, ‘পেলে সর্বকালের সেরা একজন খেলোয়াড়। কুড়ি বছর ধরে তিনি ফুটবল দুনিয়ায় রাজত্ব করেছেন। তাঁর সঙ্গে কারোরই তুলনা হয় না’। পেলের জনপ্রিয়তা এতই তুঙ্গে ছিল যে ১৯৬৭ সালে তিনি তাঁর দলসহ নাইজেরিয়ায় গেলে, পেলেকে দেখার জন্য নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ ৪৮ ঘন্টার জন্য স্থগিত ছিল। ১৯৭৪ সালে পেলে তাঁর ক্রীড়াজীবন থেকে অবসর নেবার কথা ঘোষণা করলেও ১৯৭৫-এ ‘নিউ ইয়র্ক কসমস’ (New York Cosmos)-এর সঙ্গে তিন বছরের চুক্তিতে লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলেন এবং অবসরের আগে এটাই তাঁর শেষ খেলা। দেশের স্বার্থের কথা ভেবে ইউরোপের লীগে খেলে বহু অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন ত্যাগ করেছিলেন পেলে। দারিদ্র্যে কাটানো নিজের ছোটোবেলাকে কখনো ভোলেননি তিনি। তাই ব্রাজিলের দরিদ্র শিশুদের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিশেষ ফাউণ্ডেশন।

খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পরে ইউনিসেফ-এর (UNICEF) বিশেষ দূত (Goodwill Ambassador), কখনো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ, কখনো আবার জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক দূত-এর কাজও নিষ্ঠা সহকারে সামলেছেন তিনি। পেলে ক্রীড়ামন্ত্রী থাকাকালীন ব্রাজিলের ফুটবলে দূর্নীতি বন্ধ করার জন্য বিশেষ আইন পাস হয় যা পরে ‘পেলে আইন’ নামে পরিচিত হয়। দুই আমেরিকান পরিচালক মাইকেল ও জেফ জিমবালিস্ট-এর তৈরি পেলের জীবনী-নির্ভর চলচ্চিত্রটিতে ১২-১৩ বছর বয়সী পেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন লিওনার্দো লিমা কারভালহো। চলচ্চিত্রটির নাম ‘পেলে’ যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৭ সালে। চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যদিও অনেক আগেই পেলের সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘ওস এস্ত্রানহো’তে প্রথম দেখা গিয়েছিল ‘কালো মুক্তো’- বিশ্বের ফুটবল সম্রাটকে। তাছাড়াও ১৯৮১তে ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ ছবিতে মাইকেল কেইন, সিলভেস্টার স্ট্যালোন-এর পাশাপাশি সমান দক্ষতায় অভিনয় করেছিলেন পেলে। প্রায় ১৫ কেজি ওজনের একটি আত্মজীবনী-বই লিখেছেন পেলে। তাঁর ফুটবলজীবনে মোট ১২৮৩টি গোল করেছেন বলে তিনি নিজের বইটির নাম রেখেছেন ‘১২৮৩’। পেলের এই বইয়ে রয়েছে তার ফুটবলজীবনকে মূর্ত করা দুর্লভ ছবির সমাহার। ছবির সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। আরো রয়েছে ৫০০ পৃষ্ঠায় ১২৮৩টি টেক্সট। বইটি ছাপানো হয়েছে ১২৮৩ কপি। প্রতিটি বই বিখ্যাত ফুটবলারদের অটোগ্রাফ-সংবলিত। বইটির মূল্য ধরা হয়েছে এক হাজার ২২৫ ইউরো। সারাজীবনে বহু পুরস্কার, বহু সম্মাননা পেয়েছেন পেলে। তার মধ্যে সবথেকে বেশি উল্লেখযোগ্য ১৯৯৯ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্স (Reutars) তাঁকে ‘শতাব্দীর সেরা অ্যাথলিট’ (Athelete of the Century) খেতাব দেয়। একই বছর, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও তাঁকে একই খেতাবে ভূষিত করে।  

কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে এখনও জীবিত। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮০ বছর।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন