রাধাষ্টমী ব্রত

রাধাষ্টমী ব্রত

হিন্দুধর্মে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের আরাধ্য রাধা-কৃষ্ণ পরস্পরের পরিপূরক। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষে যেমন শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব দিবস হিসেবে জন্মাষ্টমী পালন করা হয় মহা ধুমধাম করে, ঠিক তেমনই ঐ একই মাসের শুক্লপক্ষে শ্রীমতি রাধার জন্ম হওয়ায় পালিত হয় রাধাষ্টমী ব্রত (Radhastami)। জন্মাষ্টমী এবং রাধাষ্টমী দুইই সমান গুরুত্ব সহকারে পালন করে থাকেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।

ভিডিওতে রাধাষ্টমী ব্রত

রাধাষ্টমী ব্রত ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পালন করা হয়। শ্রীরাধিকা এই দিন পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এই বিশেষ ব্রতের পিছনেও রয়েছে একটি প্রচলিত কাহিনী। চলুন জেনে নেওয়া যাক।

পদ্মপুরাণেই মূলত রাধাষ্টমীর পৌরাণিক কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে। সেই কাহিনীতে বলা আছে, বহু বহু কাল আগে সূর্যদেব একদিন পৃথিবী ভ্রমণ করতে এসে পৃথিবীর রূপ, সৌন্দর্য, অনাবিল আনন্দের ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং মন্দার পর্বতের গুহায় গভীর তপস্যায় মগ্ন হন। এইভাবে অনেকদিন কেটে যায়। সূর্যের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সূর্যালোক ছাড়া যে পৃথিবী বাঁচতেই পারবে না। তখন বাধ্য হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত স্বর্গের দেবতারা শ্রীহরির শরণাপন্ন হন সাহায্যের জন্য। শ্রীহরি অর্থাৎ শ্রীবিষ্ণু তাঁদের সকলকে আশ্বস্ত করে ফিরে যেতে বলেন। তারপর মন্দার পর্বতের গুহায় তপস্যারত সূর্যের সামনে উপস্থিত হন তিনি। সূর্যদেব খুবই আনন্দিত-আহ্লাদিত হয়ে বলেন যে, শ্রীহরির দর্শন পেয়ে তাঁর এতদিনের তপস্যা সার্থক হয়েছে। সূর্যদেবের সাধনায় তুষ্ট হয়ে শ্রীহরি তাঁকে বর দিতে চাইলে সূর্যদেব বলেন, ‘আমাকে এমন একটি গুণবতী কন্যার বর প্রদান করুন যার কাছে আপনি চিরকাল বশীভূত থাকবেন’। শ্রীহরি সূর্যদেবকে সেই বরই দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর ভার লাঘবের জন্য আমি বৃন্দাবনের নন্দালয়ে কৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করবো। তুমি সেখানে বৃষভানু রাজা হয়ে জন্মাবে আর তোমার কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করবে শ্রীমতি রাধা। এই ত্রিলোকে আমি একমাত্র শ্রীরাধিকারই বশীভূত থাকবো। রাধা ও আমার মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকবে না। সকলকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা আমার আছে কিন্তু এই জগত সংসারে একমাত্র শ্রীরাধিকাই আমাকে আকর্ষণ করতে পারেন’। এরপর শ্রীহরি তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুসারে মর্ত্যের নন্দালয়ে জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণের রূপে। সূর্যদেব বৈশ্যকুলে জন্মগ্রহণ করে বৃষভানু রাজা হন এবং গোপকন্যা কীর্তিদার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তারপর যথাকালে ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষে অষ্টমী তিথিতে ধরিত্রীকে পবিত্র করে কীর্তিদার গর্ভে শ্রীমতি রাধা জন্মগ্রহণ করেন। শ্রীরাধিকার এই আবির্ভাব তিথিই রাধাষ্টমী নামে পরিচিত।

আবার জনশ্রুতিতে অন্য এক কাহিনীও প্রচলিত আছে। সেখানে বলা হচ্ছে, বর্ষাণার রাভেল স্থানটির পাশ দিয়ে সেকালে কুলুকুলু ধ্বনিতে বয়ে যেতো যমুনা। একদিন রাজা বৃষভানু এলেন নদীতে স্নান করতে। কিন্তু স্নানের জন্য জলে নামতেই আশ্চর্য হয়ে গেলেন তিনি। শত-সহস্র সূর্যালোকের ন্যায় জ্যোতির্ময় এক স্বর্ণপদ্ম ঠিক যমুনা নদীর মাঝখানে ফুটে আছে দেখলেন বৃষভানু আর তারই মধ্যে একটি শিশুকন্যাকেও লক্ষ করলেন তিনি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন বৃষভানু। ঠিক তখনই ভগবান ব্রহ্মা এসে বিস্মিত রাজাকে জানালেন যে, রাজা বৃষভানু ও তাঁর পত্নী কীর্তিদা পূর্বজন্মে ভগবান বিষ্ণুর পত্নীকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তার ফলস্বরূপই এই জন্মে রাজা স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর পত্নীকে কন্যারূপে পেয়েছেন। এরপর রাজা বৃষভানু সেই শিশুকন্যাকে নিয়ে এসে তার পত্নী কীর্তিদার হাতে তুলে দিলেন। আনন্দিত হয়ে উঠলো রাজার অন্দরমহল। কিন্তু শিশুটি কিছুতেই চোখ খুলছিল না দেখে তাঁরা ভাবলেন শিশুকন্যা বোধহয় অন্ধ। তখন নারদমুনি রাজা বৃষভানুর কাছে এসে রাজাকে শিশুটির জন্মের জন্য আনন্দের উৎসব করতে বললেন। নারদ মুনির কথা অনুযায়ী রাজা বৃষভানু উৎসবের আয়োজন করলেন। সমগ্র বৃন্দাবন খুশিতে ভরে উঠলো নতুন সদস্যের আগমনে। সেই উৎসবে নন্দ মহারাজ শিশু কৃষ্ণসহ সপরিবারে এসেছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানে শিশু কৃষ্ণ যখন হামাগুড়ি দিয়ে শিশু রাধারাণীর দিকে এগিয়ে এলেন, সেই মুহুর্তে রাধারাণী চোখ খুলে প্রথমে দেখলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। বৃন্দাবনের নিকটবর্তী বর্ষাণা এলাকার অন্তর্গত পবিত্র রাভেল নামক জায়গায় রাধারাণী আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার আবির্ভাবের দিনটিকে রাধাষ্টমী দিবস হিসাবে পালন করা হয়। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, অনেক আগে লীলাবতী নামে এক পতিতা নগর ঘুরতে এসে এক সুসজ্জিত মন্দির দেখতে পায় যেখানে মহা ধুমধাম করে রাধারানীর উপাসনা চলছিল। সেই পতিতা এগিয়ে গিয়ে ব্রতীদের এই উৎসবের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা রাধারানীর রাধাষ্টমী ব্রত পালনের কথা সবিস্তারে তাকে বলে। লীলাবতী তখন সেই ব্রত পালন করেন অন্য ব্রতীদের সঙ্গে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পরদিনই সর্প-দংশনে তার মৃত্যু হলে যমদূতেরা ওই পতিতাকে নিয়ে যমলোকে যাত্ৰা করে। সেখানে শ্রীহরির অনুচরবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন যারা তাকে বন্ধনমুক্ত করে বৈকুণ্ঠলোকে নিয়ে যায়। এক পতিতার এভাবে বৈকুণ্ঠে গমন তার পুণ্যের পরিচয় এই বিশ্বাসে লীলাবতী নামে পতিতা নারীর রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে সর্বপাপ মুক্ত হওয়ার কাহিনী লোকমুখে প্রচারিত হয়েছে।

হিন্দু সমাজে রাধাষ্টমী মহাসমারোহে পালন করা হয়। ভাগবত পুরাণে বর্ণিত আছে, কোনো ব্যক্তি একবার অন্তত এই রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার কোটি জন্মের ব্রহ্মহত্যার পাপের স্খালন হয়। হিন্দুরা মনে করেন, শত শত একাদশী ব্রত পালনে যে পুণ্যফল অর্জন হয়, একটি রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার থেকেও বেশি পুণ্যলাভ হয়ে থাকে। ভারতের মথুরা, বৃন্দাবন, দ্বারকা, পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত মায়াপুর, শান্তিপুর, নবদ্বীপ ইত্যাদি স্থানে কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপনের পাশাপাশি মহাসমারোহে রাধাষ্টমীও পালিত হয়। বৈষ্ণব মন্দিরগুলিতে এই দিন ভজন, কীর্ত্তন, কথাপাঠ সহ শ্রীরাধার মঙ্গলারতি হয়। রাধামাধবের একত্র বৈকালিক আরতির পরে ভোগ বিতরণ করা হয়ে থাকে। রাধাষ্টমী ব্রত চলাকালীন ভক্তেরা অর্ধদিন নির্জলা উপবাসে থাকেন। বর্ষণায় রাধিকার উপাসনার জন্যে বর্তমানে শ্রী রাধারানী মন্দির স্থাপিত হয়েছে। এই দিনটির আরেকটি তাৎপর্য আছে। হিন্দু-রীতিতে ‘মনিমহেশ যাত্রা’র একটা প্রচলন রয়েছে বহুকাল আগে থেকেই। বহু হিন্দু ভক্ত জন্মাষ্টমীর দিন হিমাচল প্রদেশের মণিমহেশ হ্রদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে রাধাষ্টমীর দিন সেখানে পৌঁছায় শৈব আরাধনার লক্ষ্যে, একেই মণিমহেশ যাত্রা বলা হয়। প্রসঙ্গ পৃথক হলেও এই অভিযাত্রার সময় নির্ধারিতভাবে শেষ হয় রাধাষ্টমীর দিন।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৯৪
  2. বেণীমাধব শীলের সচিত্র ফুলপঞ্জিকা, ১৪২৫, পৃষ্ঠা ২৬২
  3. https://sanatandharmatattva.wordpress.com/
  4. https://iskconvrindavan.com/

আপনার মতামত জানান