হিদাসপিসের যুদ্ধ (Battle of the Hydaspes) হল যুদ্ধবিশারদ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের এশিয়া অভিযানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ। এই যুদ্ধ ঝিলমের যুদ্ধ বা প্রথম ঝিলমের যুদ্ধ নামেও পরিচিত। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ম্যাসিডোনের সম্রাট আলেকজান্ডার ও ভারতের পৌরব বংশের রাজা পোরাস (Porus) বা পুরুর মধ্যে বর্তমান পাকিস্তানের ঝিলাম নদীর তীরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে ম্যাসিডোনীয় সেনারা জয় লাভ করেছিল, তারা পুরুকে বন্দী করলেও আলেকজান্ডার পুরুর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্ত করে দেন। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের রাজনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের উপর গ্রিক ও ভারতীয়দের এই সংঘর্ষের এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়েছিল।
গ্রিক গ্রন্থ অনুযায়ী, ভারতীয় এই রাজার নাম পোরাস হলেও অনেকে মনে করেন ভারতের ঝিলাম ও চেনাব নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল শাসনকারী ভারতীয় রাজার প্রকৃত নাম ছিল পুরু।
আলেকজান্ডার এক বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে ম্যাসিডনের পূর্ব দিকে অভিযান শুরু করেন। তিনি ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গৌগামেলার যুদ্ধের মাধ্যমে পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করে ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ ভারত অভিযান শুরু করেন। আলেকজান্ডার তাঁর বাহিনীকে নিয়ে খাইবার গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার বর্তমান পাকিস্তানের পীর সারাইয়ের কাছে অবস্থিত দুর্ভেদ্য দুর্গ ‘আওরনোস’ (Aornos) দখল করে নেন। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, হ্যারাক্লিস নামক এক পৌরাণিক ব্যক্তি এই অভেদ্য দুর্গটি দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আলেকজান্ডার ভারত অভিযানের সময় এই লোককথা দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পূর্বসূরি হ্যারাক্লিস যা পারেননি, তা করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে।
এরপর ম্যাসিডোনীয় সেনাবাহিনীর শক্তিতে ভীত হয়ে ওই অঞ্চলের বেশিরভাগ স্থানীয় রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নেয় এবং কর প্রদান করতে রাজি হয়। সেই সময় তক্ষশিলার শাসক অম্বি নিজের প্রতিপক্ষ রাজা পুরু বা পোরাসের বিরুদ্ধে আলেকজান্ডারের সহায়তা পাওয়ার আশায় আত্মসমর্পণ করেন। এমনকি আলেকজান্ডারের সাথে পুরুর যুদ্ধের সময় তিনি আলেকজান্ডারকে প্রচুর সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন।
অন্যদিকে, রাজা পুরু আলেকজান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে ও কর দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। সেই মুহূর্তে পুরুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করলে ভারতীয় শাসকদের ওপর আলেকজান্ডারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই আলেকজান্ডার এই যুদ্ধে জয়লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং এর ফলেই হিদাসপিসের যুদ্ধ শুরু হয়।
যুদ্ধের সময় আলেকজান্ডার ঝিলম নদীর উত্তর তীরে তাঁর শিবির স্থাপন করেছিলেন। বর্ষার কারণে নদীটি তখন ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত, গভীর ও খরস্রোতা। সাধারণ উপায়ে নদী পার হওয়া অসম্ভব দেখে আলেকজান্ডার বিকল্প স্থান খোঁজার চেষ্টা করেন। তাঁর সেনারা প্রতি রাতে নদীর তীরে এমনভাবে শোরগোল করত, যাতে পুরু ভাবেন গ্রিকরা বুঝি রাতেই নদী পার হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আলেকজান্ডার নিজে গোপনে অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে নদী পারাপারের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বেড়াতেন। অবশেষে তিনি তাঁর শিবির থেকে প্রায় ১৭ মাইল দূরে জনবসতিহীন, জঙ্গলে ঢাকা একটি উপযুক্ত স্থান খুঁজে পান এবং সেখান দিয়েই নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি গোপন রাখার জন্য তিনি সেনাপতি ক্র্যাটেরাসকে (Craterus) বেশিরভাগ সেনাসহ মূল তাঁবুতেই রেখে যান।
প্রথম দিকে পুরু সতর্ক থাকলেও, প্রতি রাতে গ্রিক সেনাদের নদী পারাপারের এই মিথ্যা অভিনয় দেখে একসময় তিনি নজরদারি কমিয়ে দেন। এই সুযোগে আলেকজান্ডার নিজে একটি শক্তিশালী দল নিয়ে নদী পার হন। সেদিন রাতের এক প্রবল ঝড়ের কারণে তাঁদের চলাচলের শব্দ একেবারেই চাপা পড়ে গিয়েছিল। পৌরবদের নজরদারি এড়িয়ে আলেকজান্ডারের এই ঝিলাম নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্তকে সামরিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৌশল বলা হয়।
নদী পার হওয়ার পর আলেকজান্ডার তাঁর সমস্ত অশ্বারোহী এবং পদাতিক তীরন্দাজদের নিয়ে পুরুর শিবিরের দিকে অগ্রসর হন। ভোর হলে পৌরব সেনারা বুঝতে পারে যে গ্রিক বাহিনী নদী পার হয়ে গেছে। আলেকজান্ডারকে আটকানোর জন্য পুরু তাঁর পুত্রের নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল পাঠান। তবে আলেকজান্ডারের সুকৌশলী আক্রমণের সামনে পড়ে সেই দল দ্রুত পরাজিত ও ছত্রভঙ্গ হয়।
এরপর পুরু নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আলেকজান্ডারের মুখোমুখি হন। পৌরব বাহিনীর দুই পাশে ছিল অশ্বারোহী সেনা, সামনে বিশাল রথবাহিনী এবং কেন্দ্রে ছিল পদাতিক বাহিনী। পদাতিক বাহিনীকে সুরক্ষার জন্য রণহস্তীগুলোকে সমান্তরালভাবে এক লাইনে দাঁড় করানো হয়েছিল। পুরু ভেবেছিলেন, হাতির ভয়ে গ্রিক বাহিনী সরাসরি আক্রমণ করতে পারবে না এবং তাদের ঘোড়াগুলো পিছিয়ে যাবে। এই যুদ্ধে পৌরব বাহিনীর হাতির পিঠে ‘হাওদা’ (তীরন্দাজ ও বর্শাধারীদের বসার আসন) থাকলেও তিনি সাধারণ সৈন্যদের মতো আড়ালে না থেকে উঁচু হাতির পিঠে চড়ে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন যাতে সবাই তাঁকে দেখতে পায়। এই যুদ্ধে পুরুর সেনারা জমকালো রঙের পোশাক, ইস্পাতের হেলমেট ও বিশেষ ধরনের কোমরবন্ধনী ব্যবহার করেছিল। অস্ত্র হিসাবে তাদের প্রধান ভরসা ছিল কুঠার, বর্শা ও গদা।
আলেকজান্ডার তাঁর ভারী অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে প্রথমে পুরুর অশ্ববাহিনীর দুর্বল অংশে আঘাত হানেন। একদিক থেকে আলেকজান্ডার তাঁর অশ্বারোহী তীরন্দাজদের নিয়ে আক্রমণ চালান, অন্যদিকে সেনাপতি ক্র্যাটেরাস নদী পার হয়ে অন্য পাশ থেকে চড়াও হন। এই দ্বিমুখী আক্রমণের ফলে পৌরব বাহিনী চরম চাপে পড়ে যায়। রাজা পুরুর রণকৌশলগুলো যথাযথভাবে কাজে না আসায় সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তাঁদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
তবে আলেকজান্ডারের বাহিনীকে পুরুর বিশাল হাতি বাহিনীর সামনে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ম্যাসিডোনীয় পদাতিক বাহিনী সাহসিকতার সাথে লড়াই চালিয়ে যায়। তারা হাতির চোখ ও মাহুতদের লক্ষ করে বর্শা নিক্ষেপ করে হাতি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে। যন্ত্রণায় উন্মত্ত পশুগুলো রণক্ষেত্রে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে শত্রুসেনার পাশাপাশি পুরুর নিজেদেরও অনেক পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যকে পিষে মারে। অবশেষে আলেকজান্ডারের সুদক্ষ নেতৃত্বে ম্যাসিডোনীয় বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পৌরব সেনাবাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।
পুরুর পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল আলেকজান্ডারের চতুর কৌশল ও উন্নত সামরিক ব্যবস্থা। গ্রিকদের সুদক্ষ অশ্বারোহী বাহিনীর কাছে পুরুর রথ ও অশ্ববাহিনী টিকতে পারেনি। নদীর তীরের কাদার কারণে রথগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল। এমনকি পিচ্ছিল মাটির কারণে ভারতীয় ধনুর্বিদদের ভারী বর্ম-ভেদকারী ধনুকগুলোও ঠিকমতো কাজ করেনি। আলেকজান্ডারের মতো সুসংগঠিত সামরিক পরিকাঠামো পুরুর ছিল না। ফলে দুর্বল ধাতব বর্ম ও তলোয়ার নিয়ে পৌরব পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী ম্যাসিডোনীয়দের আধুনিক রণকৌশলের সামনে দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি।
ঐতিহাসিকদের মতে, আলেকজান্ডারের বাহিনীতে আনুমানিক ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ পদাতিক এবং ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। এই যুদ্ধে তাঁর নিজের বাহিনী ছাড়াও তক্ষশিলার রাজা অম্বি ও অন্যান্য মিত্ররাজাদের সেনারাও যোগ দিয়েছিল। অন্যদিকে, রাজা পুরুর বাহিনীতে প্রায় ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ পদাতিক, ৪,০০০ অশ্বারোহী, ১,০০০ রথ এবং ৮০ থেকে ২০০টি রণহস্তী ছিল বলে ধারণা করা হয়।
যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর পুরুকে বন্দী করে আলেকজান্ডারের সামনে উপস্থিত করা হয়। কথিত আছে, পরাজিত হয়েও পুরু কর দিতে অস্বীকার করেন এবং আলেকজান্ডারের কাছে একজন স্বাধীন রাজার মতো আচরণ দাবি করেন। আলেকজান্ডার পুরুর এই বীরত্ব, সততা ও সাহসিকতা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি পুরুকে সসম্মানে তাঁর নিজের রাজ্য ফিরিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, আলেকজান্ডার নিজের বিজিত আরও কিছু অতিরিক্ত অঞ্চল পুরুর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে তাঁকে একজন ‘মিত্র রাজা’ বা ‘স্বায়ত্তশাসিত শাসক’ হিসেবে মর্যাদা দেন।
এই যুদ্ধের পর আলেকজান্ডার মগধের শক্তিশালী নন্দ বংশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অবিরাম যুদ্ধ করার কারণে ম্যাসিডোনীয় সৈন্যদের মধ্যে তীব্র ক্লান্তি ও অসন্তোষ দেখা দেয়। তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও বর্ম জীর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তারা ভারতের বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে আর অগ্রসর হতে রাজি হয়নি। নিরুপায় হয়ে আলেকজান্ডার তাঁর পূর্বমুখী অভিযানের পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং পশ্চিমে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। এই ফেরার পথেই ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে মাত্র ৩২ বছর বয়সে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়।
সমগ্র এশিয়া অভিযানের মধ্যে এই হিদাসপিসের যুদ্ধেই আলেকজান্ডারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল। পুরুর পদাতিক ও হস্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরক্ষায় ম্যাসিডোনীয় বাহিনীর প্রায় ১,০০০ সেনা নিহত হয়। অন্যদিকে পৌরব বাহিনীর প্রায় ১২,০০০ সৈন্য নিহত এবং ৯,০০০-এরও বেশি যোদ্ধা বন্দী হয়। এছাড়া এই যুদ্ধে আশিটিরও বেশি হাতি মারা যায়। হিদাসপিসের যুদ্ধে পুরুর দুই পুত্রসহ তাঁর বহু মিত্রও প্রাণ হারান।
আলেকজান্ডার এই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মরণে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে ‘নিকাইয়া’ শহর এবং এই যুদ্ধে নিহত তাঁর প্রিয় ঘোড়ার নামানুসারে ‘বুকেফালা’ শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ভারতের পরবর্তী রাজনীতিতে হিদাসপিসের যুদ্ধ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে ফলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ওই অঞ্চলগুলি সহজে জয়লাভ করতে পেরেছিলেন।
মহান কূটনীতিবিদ ও রণকৌশলবিদ কৌটিল্য (চাণক্য) এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থায়ী ও সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তাঁরই পরামর্শে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একটি সুদক্ষ স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং ভারতীয় সামরিক ব্যবস্থায় প্রাচীন রথবাহিনীর ব্যবহার ক্রমশ কমতে শুরু করে।
এই যুদ্ধের পর গ্রিক ও ভারতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ভারতীয় উপমহাদেশে বিখ্যাত ‘গান্ধার শিল্পরীতি’র (Greco-Buddhist art) সূচনা হয়। এছাড়া গ্রিক স্থাপত্য, জ্যোতিষশাস্ত্র ও মুদ্রা ব্যবস্থা ভারতের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। আলেকজান্ডারের এই অভিযানের ফলেই পশ্চিমা বিশ্ব ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত জানতে পারে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান