লালকেল্লা (Red Fort, Lal Qila) ভারতের পুরোনো দিল্লিতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও শৈল্পিক দুর্গ। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলের শিল্পসুষমার এক অনন্য স্থাপত্যের নিদর্শন এটি। মূলত রাজপরিবারের বসবাসের জন্য সম্রাট এই দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গের নকশা তৈরি করেন তাজমহলের স্থাপত্যকার ওস্তাদ আহমদ লাহোরি। এখানে পারস্য এবং ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ দেখা যায়। লালকেল্লাকে প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ আইন, ১৯০৪ (Ancient Monuments Preservation Act, 1904) -এর অধীনে ব্রিটিশ আমলে সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতি বছর লালকেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার লাহোরি দরজাতে স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত করা হয়। এছাড়া এই কেল্লার স্থাপত্য সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিবেচনা করে ২০০৭ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) লালকেল্লা কমপ্লেক্সকে (Red Fort Complex) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।
লালকেল্লা কোথায়
লালকেল্লা ভারতের রাজধানী দিল্লির পুরাতন দিল্লিতে অবস্থিত। এই কেল্লার কাছে ঐতিহাসিক চাঁদনি চক মার্কেট, এশিয়ার বৃহত্তম পাইকারি মশলা বাজার খারি বাওলি, ভারতের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ জামা মসজিদ, এবং মহাত্মা গান্ধীর সমাধি রাজঘাট আছে।
লালকেল্লার ইতিহাস
মুঘল সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৮ সালে আগ্রা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করে যমুনা নদীর তীরে শাহজাহানাবাদ নামে একটি নতুন শহর স্থাপন করেন। এখান থেকে তিনি সুষ্ঠুভাবে ভারতের বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করার জন্য একটি দুর্গ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এই কারণে ১৬৩৯ সালে তিনি রাজকীয় সুযোগ-সুবিধাসহ দুর্গ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। লালকেল্লার নকশা তৈরি করেন স্থপতি ওস্তাদ আহমদ লাহোরি। যমুনার তীরে এই দুর্গ নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৬৪৮ সালে। তারপর মুঘল সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ শাসনকেন্দ্রে পরিণত হয় এই লালকেল্লা।
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল রাজবংশের শাসন কাঠামো একেবারে ভেঙে পড়ে আর এরপর লালকেল্লারও অবক্ষয় শুরু হয়। ১৭৩৯ সালে পারস্যের শাসক নাদির শাহ মুঘল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে লালকেল্লার প্রচুর ধনরত্ন লুঠ করেছিলেন। এরপর ১৭৫২ সালের মুঘল-মারাঠা চুক্তির মাধ্যমে মারাঠারা মুঘল সাম্রাজ্যের রক্ষকের ভূমিকা নেয় এবং উত্তর ভারতে তাদের প্রভাব বাড়ে।
তবে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আফগান শাসক আহমেদ শাহ আবদালির কাছে পরাজিত হয় মারাঠা শক্তি। তখন আবার লালকেল্লাসহ দিল্লি লুঠ করেন আবদালি। তবে কিছু বছর পর শক্তি সঞ্চয় করে মারাঠারা আবার ফিরে এসে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে এনে দিল্লির সিংহাসনে বসায়। এরপর দ্বিতীয় শাহ আলম মারাঠাদের হাতের পুতুল হয়ে দীর্ঘদিন রাজত্ব পরিচালনা করেন। ১৭৮৩ সালে বাঘেল সিংয়ের নেতৃত্বে শিখ বাহিনী দিল্লিতে প্রবেশ করে এবং লালকেল্লা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে। পরে মুঘলদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দিল্লিতে গুরুদ্বার নির্মাণের অনুমতি পায়। তবে মারাঠাদের প্রবল পরাক্রমের কারণে শেষ পর্যন্ত শিখরা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। তবে এই সময় তারা দিল্লিতে সাতটি শিখ গুরুদ্বার নির্মাণ করার অনুমতি আদায় করেছিল। এরপর বহু বছর লালকেল্লা ও দিল্লিতে কায়েম ছিল মারাঠা শাসন। এই সময় লালকেল্লায় মারাঠারা নিজেদের পতাকা ওড়ানোর অনুমতি পেয়েছিল।
এরপর ১৮০৩ সালে দ্বিতীয় ইংরেজ-মারাঠা যুদ্ধে সিন্ধিয়া, ভোঁসলে ও পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও সমন্বিত মারাঠা শক্তি ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয়। এরপর মারাঠাদের এক বিশাল অঞ্চলের পাশাপাশি লালকেল্লার দখল করে নেয়। তবে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা দিল্লির লালকেল্লার অনেক অংশ ধ্বংস করে দুর্মূল্য রত্ন, বিরল ভাস্কর্য, দামি আসবাবপত্র, মার্বেলফলক থেকে শুরু করে অসংখ্য জিনিসপত্র লুঠ করেছিল। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশরা এই দুর্গে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের বিচার করে তাঁকে তৎকালীন বর্মার রেঙ্গুন নির্বাসিত করেছিল। পরবর্তীকালে এই দুর্গটি একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হত। তারপর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন লালকেল্লাসহ ভারতের বেশ কিছু পুরানো স্থাপত্য পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু লালকেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার লাহোর গেটের উপরে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এছাড়া ভারতের স্বাধীনতার পর লালকেল্লাকে সামরিক সেনানিবাস হিসেবে ব্যবহার করা হত। এমনকি ২০০৩ সাল পর্যন্ত লালকেল্লার একটি বড় অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারপর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সংরক্ষণের জন্য লালকেল্লার দায়িত্ব নেয়।
লালকেল্লার গঠনশৈলী
দিল্লির লালকেল্লার প্রথম নাম ছিল ‘কিলা-ই-মুবারক’। দুর্গটি মূলত লাল বেলেপাথরে নির্মিত বলে এই দুর্গটি লালকেল্লা নামে পরিচিত হয়।
মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে এই দুর্গে প্রবেশের জন্য প্রধান দুটি প্রবেশ পথ নির্মাণ করা হয়েছিল। লাহোরি গেট ও দিল্লি গেট হল লালকেল্লার ঐতিহ্যবাহী দুটি প্রবেশ পথ। এই দুটি গেটেই অসাধারণ সুন্দর কারুকার্য লক্ষ করা যায় তবে দিল্লি গেটের দুই পাশে একে অপরের মুখোমুখি দুটি পাথরের হাতির মূর্তি আছে। লালকেল্লার ভাস্কর্য ও শৈল্পিক উপস্থাপনা এককথায় অনবদ্য। এখানে আছে বিশ্বমানের অলংকরণ ও শিল্পকর্ম। পারস্য, ইউরোপীয় ও ভারতীয় শিল্পকলার সংমিশ্রণে এক অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল এই স্থাপত্য। প্রায় ২৫০ একরের বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত লালকেল্লাকে ঘিরে আছে প্রায় আড়াই কিলোমিটার লম্বা প্রাচীর।
এই অষ্টভুজাকার স্থাপত্য মার্বেল, ফুলের সজ্জা এবং দ্বৈত গম্বুজগুলি অসাধারণ রূপ দেয়। এই লালকেল্লায় রুপোর ছাদের নিচে ময়ূর সিংহাসনে বিশ্বখ্যাত কোহিনুর হীরাটি বসানো ছিল।
তবে স্থাপত্যশিল্পীরা শুধু লালকেল্লা নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এই কেল্লার চারিদিকে তৈরি করা হয়েছিল বিশাল পরিখা। কেল্লার চতুর্দিকে নির্মাণ করা হয় এই পরিখার জল আসত যমুনা নদী থেকে। কথিত আছে, ওই পরিখায় কুমিরও রাখা হত। তারপরও যদি কেউ সেই পরিখা অতিক্রম করত তাহলে কেল্লার দেওয়ালের পিচ্ছিলতার কারণে কেউ কেল্লার ভিতরে পৌঁছাতে পারত না। এছাড়া দুর্গের সুরক্ষার জন্য সারা দিন-রাত পালাক্রমে প্রহরী নিয়োজিত রাখা হত।
মুঘল আমলে লালকেল্লার ছাত্তা চকে বসত বাজার। এখানে শাহজাহানের আমলের রাজপরিবারের নারী ও অভিজাতরা কেনাকাটা করত। এখানে রেশম, মখমল, সোনা-রুপোর গয়না, মূল্যবান রত্ন এবং নানান কারুশিল্প বিক্রি করা হত। এছাড়া নহবতখানাতে মুঘল রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হত সঙ্গীত অনুষ্ঠান। এখানে সম্রাট ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আসতেন। লালকেল্লার দেওয়ান-ই-আমে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শুনতেন মুঘল সম্রাট। আবার দেওয়ান-ই-খাস ছিল শুধুমাত্র সম্রাট এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মানুষদের বিশেষ কক্ষ। এই কক্ষগুলিতে ছিল মূল্যবান শ্বেতপাথর, অপরূপ স্তম্ভ, কারুকার্য খোদাই করা খিলান, সূক্ষ্ম কারুকার্য, সোনা ও রূপার অলংকরণ, সোনার জল ব্যবহার করে আঁকা ছবি, মণি-মুক্তার কাজ এবং ছোট ছোট আয়নার টুকরো কাজ। এছাড়া বিশেষ কাচ ও মোজাইক দিয়ে সাজানো মুমতাজমহল, রংমহল ছিল সম্রাজ্ঞী এবং মুঘল সম্রাটের বেগমদের কক্ষ। আর খাসমহল ছিল সম্রাটের নিজস্ব জায়গা, যেখানে তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারত না। এছাড়াও ছিল বাওলি বা ধাপকুয়ো। এই বাওলিকে ব্রিটিশরা কারাগারে রূপান্তরিত করেছিল। ১৯৪৫ সালে INA Trial বা আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিছু INA অফিসারকে সেখানে আটক রাখা হয়। এছাড়া লালকেল্লার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ছিল মতি মসজিদ, হীরামহল, হায়াত বকশ বাগ নামক বাগান, যা ব্রিটিশরা নষ্ট করে দিয়েছিল।
মহাবিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ লালকেল্লায় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। এই সময় দুর্গের অনেক কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছিল। সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত পাথরের পর্দাগুলো ব্রিটিশরা পুরোপুরি ভেঙে ফেলে। মনে করা হয় এই সময় অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ইংরেজরা মার্বেলের খচিত ফুলের নকশা, দেয়ালের মূল্যবান পাথরের কাজ, কেল্লার সমস্ত রাজকীয় আসবাবপত্র, সোনা-রূপার অলংকার, রত্ন, মূল্যবান গালিচা, অস্ত্রাগার থেকে কামান ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র লুঠ করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যায়। এমনকি এই সময় কেল্লার ভেতরের বাগানগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তীকালে লর্ড কার্জন এই কেল্লা সংস্কার করেন। তিনি এখানে নতুন করে একটি আধুনিক জলসেচ ব্যবস্থাসহ সুন্দর বাগান তৈরি করেছিলেন। এছাড়া তিনি লালকেল্লার স্থাপত্যগুলি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেন। এখন সেখানে দেখা যায় সৌন্দর্যময় দুর্গপ্রাচীর, প্রধান ফটক ও সভাকক্ষ। তবে সাম্প্রতিক ইতালি ও ভারতের গবেষকদের গবেষণা অনুসারে, পরিবেশ দূষণের কারণে লালকেল্লার রঙ লাল থেকে কালো হয়ে যাচ্ছে।
জনজীবনে লালকেল্লার প্রভাব
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ১৫ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এখন ভারতের নতুন ৫০০ টাকার নোটে এই দুর্গটি দেখা যায়। প্রতিবছর বহু পর্যটক লালকেল্লার অপরূপ স্থাপত্য শৈলী ও বিভিন্ন মিউজিয়াম দেখতে এখানে আসে। এখানকার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মিউজিয়ামের মধ্যে একটি হল ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। লালকেল্লার নহবতখানার কিছুটা অংশ এবং পুরাতন মমতাজ মহলকে নিয়ে এই মিউজিয়াম তৈরি করা হয়। যেসব ভারতীয় সৈনিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়। এই জাদুঘরে যুদ্ধকালীন সৈনিকদের ব্যবহৃত নানা অস্ত্রশস্ত্র, কামান, তলোয়ার, বর্ম, পোশাক ইত্যাদি সব রাখা আছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘ইয়াদ-ই-জালিয়ান’ নামক একটি জাদুঘর তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ এবং দিল্লি আর্ট গ্যালারির একটি যৌথ উদ্যোগ এখানে ভারতীয় শিল্পকলা প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া এখানে রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কিত জাদুঘর। এই সকল কারণে বর্তমানে পুরানো দিল্লির বৃহত্তম ঐতিহ্যময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই লালকেল্লা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান