সববাংলায়

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা

বিভাগঃ , ,

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা (Anandamayi Ma) হিন্দুধর্মের একজন প্রখ্যাত ও মহান সাধিকা। কোনও প্রচলিত গুরুর কাছে আনুষ্ঠানিক দীক্ষা না নিয়েই তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি সকল মানুষের মধ্যে সহজভাবে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। ভারতের বহু সাধু-সন্ত, পণ্ডিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর সান্নিধ্যে এসে তাঁর ভক্ত বা অনুগামী হন। ভক্তদের একাংশ তাঁকে দেবী দুর্গার অবতার বলে মনে করলেও আনন্দময়ী মা নিজেকে পরম ঈশ্বরের একজন সাধারণ সন্তান বলে পরিচয় দিতেন। মায়ের নামে ভারতের উত্তরপ্রদেশে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাঁর প্রেম, করুণা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রভাব ভারত ও বিদেশের বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা জেলার খেওড়া গ্রামে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের জন্ম হয়। বর্তমানে স্থানটি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত। তাঁর প্রকৃত নাম নির্মলা সুন্দরী। তাঁর বাবার নাম বিপিনবিহারী ভট্টাচার্য ও মায়ের নাম মোক্ষদা সুন্দরী দেবী। আনন্দময়ী মায়ের বাবা ভক্তিমূলক গান গাইতেন। তাঁদের পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও ঈশ্বরভক্তির এক সুন্দর পরিবেশের মধ্যে আনন্দময়ী মা বড় হন। মাত্র ১২ বছর বয়সে পুলিশ বিভাগে কর্মরত রমণীমোহন চক্রবর্তীর সাথে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের বিয়ে হয়।

এক নজরে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের জীবনী:

  • জন্ম: ৩০ এপ্রিল, ১৮৯৬
  • মৃত্যু: ২৭ আগস্ট, ১৯৮২
  • কেন বিখ্যাত: বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ভারতীয় নারী সাধিকা, আধ্যাত্মিক শিক্ষাগুরু এবং ভক্তি ও অদ্বৈত বেদান্তের সমন্বয়কারী মহামানবী। তাঁর বিখ্যাত শিষ্যদের মধ্যে হলেন ইন্দিরা গান্ধী, উদয়শঙ্কর প্রমুখ। তাঁর নামে বহু আশ্রম, চিকিৎসালয়, বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই আনন্দময়ী মা কীর্তন, ভজন শুনতে পছন্দ করতেন। কীর্তন বা ভক্তিগীতি শুনলে তিনি গভীর ভাবাবেশ বা সমাধিস্থ অবস্থায় চলে যেতেন। সব পরিস্থিতিতে তিনি নির্মোহ, শান্ত এবং খুশি থাকতেন। এই অদ্ভূত মানসিকতার কারণে তাঁর আত্মীয়-পরিজনরা আনন্দময়ী মায়ের মানসিক অবস্থা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন।

আনন্দময়ী মা মাত্র কয়েক মাস সুলতানপুর এবং খেওড়া গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি আর বেশিদূর পড়াশোনা শিখতে পারেননি।

বিয়ের কিছু বছর পর আনন্দময়ী মা তাঁর স্বামী রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে অষ্টগ্রামে চলে যান। এই সময় তিনি গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগাসন, ভগবানের নাম-জপ ও পুজো করতেন। কোনও কোনও দিন তিনি নিজের সাধনায় মগ্ন হয়ে ভাবসমাধিতেও চলে যেতেন। প্রথম দিকে তাঁর স্বামী এই অলৌকিক ও ভাবময় অবস্থা বুঝতে না পেরে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। তবে পরবর্তীকালে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা তাঁকে পরামর্শ দেন যে, আনন্দময়ী মা কোনও রোগ বা অশুভ আত্মার শিকার নন, বরং তাঁর মধ্যে এক শুভ আধ্যাত্মিক ভাব রয়েছে। অষ্টগ্রামে থাকাকালীন তাঁর ভাবাবেশ ও গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাজিতপুরে থাকার সময় তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা আরও গভীর হয় এবং বিভিন্ন স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া ও ভাবাবস্থার প্রকাশ ঘটে।

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের কোনও লৌকিক গুরু ছিল না। ১৯২২ সালের আগস্ট মাসে পূর্ণিমার রাতে আনন্দময়ী মা নিজেই নিজেকে আত্মদীক্ষায় দীক্ষিত করেন। এরপর তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা আরও গভীর ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে থাকে।

আনন্দময়ী মা ও রমণীমোহন চক্রবর্তীর সংসারজীবন সাধারণ দম্পতির মত ছিল না। পরবর্তীকালে রমণীমোহন তাঁর প্রতি গভীরভাবে অনুগত হয়ে তাঁর সাধনায় সহযোগী ও ভক্তের ভূমিকায় চলে আসেন। আনন্দময়ী মা তাঁকে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত করে ‘ভোলানাথ’ নাম দেন।

আনন্দময়ী মা কিছুদিন তাঁর স্বামীর সাথে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় ছিলেন। সেখানে ভোলানাথ নবাবের বাগানের তত্ত্ববধায়ক হিসেবে কাজ করতেন। এই সময় জ্যোতিষচন্দ্র রায় আনন্দময়ী মায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আনন্দময়ী মা কাউকে গতানুগতিক অর্থে দীক্ষা দিতেন না। নির্দিষ্ট গুরুশিষ্য প্রথার বাইরে তিনি মানুষের মন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের পথ দেখাতেন। মায়ের সান্নিধ্য ও উপস্থিতি ভক্তদের মনের বিভ্রান্তি দূর করে দিত।

জ্যোতিষচন্দ্র রায়ই নির্মলা সুন্দরীকে প্রথম ‘আনন্দময়ী মা’ নাম দেন। আনন্দময়ী কথার অর্থ আনন্দ পরিব্যাপ্ত মা বা পরমানন্দ পরিব্যাপ্ত মা। ১৯২৬ সালে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী আনন্দময়ী মায়ের আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কথিত আছে, এই মন্দিরেই আনন্দময়ী মায়ের দিব্যভাব প্রকাশ পেত। ১৯২৮ সালে সিদ্ধেশ্বরীতে প্রথম আশ্রমগৃহ নির্মাণ শুরু হয়। ১৯২৯ সালে রমনা কালীমন্দির এলাকায় আনন্দময়ী মায়ের আরও একটি আশ্রম গড়ে ওঠে। এরপর আরও বেশি সংখ্যক লোক মায়ের ঐশ্বরিক জীবন্ত প্রতিমূর্তি দেখে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। খুব শীঘ্রই তিনি ‘ঢাকার জীবন্ত কালী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

ভক্তরা শাহবাগ থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের নামে আশ্রম তৈরি করতে শুরু করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বারাণসী, হরিদ্বার, দেরাদুন এবং কলকাতায় গড়ে ওঠা আশ্রমগুলি। আনন্দময়ী মায়ের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রতিটি আশ্রমকে ভক্তরা অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান বলে মনে করেন। ভক্তদের উদ্যোগে ১৯৫০ সালে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংঘটি আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম, প্রতিষ্ঠান ও তাঁর শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। পূর্বে কিছু সময়ের জন্য বারাণসীতে এই সংঘের প্রধান কার্যালয় ছিল। বর্তমানে এই সংঘের প্রধান কার্যালয় উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারের কঙ্খল এলাকায় অবস্থিত। এই সংঘ প্রতিষ্ঠা দিবসে আনন্দময়ী মায়ের পাঁচ হাজারেরও বেশি শিষ্য অংশগ্রহণ করেছিল। মায়ের নামে দেশে ও বিদেশে তাঁর আশ্রমের একাধিক শাখা গড়ে উঠেছে। এই সকল আশ্রমে যজ্ঞ, কীর্তন, নাচ-গান ইত্যাদির মাধ্যমে ঈশ্বরের সাধনা করা হয়। আশ্রম ছাড়াও শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের নামে তাঁর ভক্তরা একাধিক জায়গায় বিদ্যাপীঠ, কন্যাপীঠ এবং দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি করেছেন। বারাণসীতে মা আনন্দময়ীর প্রেরণায় ব্ৰহ্মচারিণীদের জন্য গুরুকুলের আদলে আবাসিক শ্রীশ্রী মা আনন্দময়ী কন্যাপীঠ গড়ে তোলা হয়। এখানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃত, সংগীত ও কারুশিল্প শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়া শিবালায় মাতা আনন্দময়ী হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জন্য দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা নিজের পদ্ধতিতে ধর্ম সাধনা করতেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তিনি সকল মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসতেন ও আধ্যাত্মিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি মানুষকে বোঝাতেন জীবন ও ধর্ম আলাদা কিছু নয়, বরং প্রতিটি কাজ ভগবানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে ধর্ম পালন করা উচিত। তাঁর সাধনার আধার ছিল ভক্তিযোগ। তিনি তাঁর ভক্তদের বলতেন সমাজে সেবা, প্রেম এবং ঈশ্বরের নিরন্তর স্মরণের দ্বারাই ঐশ্বরিক কৃপা লাভ করা যায়। ঈশ্বরীয় সত্তার মতবাদ বা আচার-অনুষ্ঠান পালন করার পরিবর্তে তিনি মানুষের মধ্যেকার ঈশ্বর সাধনার উপর অধিক গুরুত্ব দিতেন। ভক্ত ও অনুরাগীরা তাঁকে জগতের কল্যাণময়ী ও আনন্দদায়িনী জননী রূপে দেখতেন। আনন্দময়ী মায়ের মধ্যে ভক্তরা সনাতন ধর্মের শক্তির জীবন্ত রূপ লক্ষ করতেন।

আনন্দময়ী মা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মন্দিরে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়েছিল; বহু সাধু ও পণ্ডিত তাঁকে অত্যন্ত উচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদা দিতেন। দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করার সময় তিরুভন্নামালাইয় মন্দিরের কর্মকর্তারা আনন্দময়ী মাকে ঐতিহ্যবাহী ‘টেম্পল অনার্স’ বা মন্দির সম্মাননায় ভূষিত করেছিল। এই মন্দিরগুলি ভ্রমণের সময় আনন্দময়ী মাকে দর্শন করার জন্য হাজার হাজার ভক্তের সমাবেশ হত। এছাড়া মা নিজে বিভিন্ন কুম্ভ মেলায় উপস্থিত হয়ে সেখানে আগত সাধু, সন্ন্যাসী ও সাধারণ তীর্থযাত্রীদের সাথে দেখা করতেন।

শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মা পবিত্র ধর্মীয় স্থানের পাশাপাশি গ্রাম, শহরের ভক্তদের সঙ্গেও দেখা করতে যেতেন। বহু বিখ্যাত ও সাধারণ মানুষ তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিল। স্বামী শিবানন্দ ও রামণ মহর্ষির মতো মহান সাধকরা আনন্দময়ী মায়ের উচ্চ আধ্যাত্মিক চেতনার প্রশংসা করেছিলেন। প্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায়, মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ ও ত্রিগুণা সেন-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন। এছাড়া প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর এবং ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের ভক্ত ও অনুরাগী ছিলেন।

তাঁর পরম ভক্ত জ্যোতিষচন্দ্র রায় মায়ের শ্রীমুখের বাণী ও প্রাথমিক জীবনের অমূল্য স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে রচনা করেন ‘মাতৃদর্শন’ নামক প্রামাণ্য গ্রন্থ। জ্যোতিষচন্দ্র রায় ‘মায়ের আত্মপ্রকাশ’ গ্রন্থে মায়ের মুখনিঃসৃত বিভিন্ন অমূল্য বাণী এবং মায়ের জীবনের শুরুর দিকের (১৮৯৬ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত) নানা আধ্যাত্মিক ঘটনা ও সাধনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। বিশ্বখ্যাত ভারতীয় যোগী ও আধ্যাত্মিক গুরু পরমহংস যোগানন্দও আনন্দময়ী মায়ের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘অটোবায়োগ্রাফি অব আ যোগী’ (Autobiography of a Yogi)-র একটি অধ্যায়ে তিনি আনন্দময়ী মা-কে ‘দি বেঙ্গলি জয়-পারমিটেড মাদার’ (The Bengali ‘Joy-Permeated Mother’) বা আনন্দময়ী প্রজ্ঞাময়ী নারী সন্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যোগানন্দের বইয়ের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের পাঠকমহলেও আনন্দময়ী মায়ের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মা নিজে কখনও বিদেশ ভ্রমণ না করলেও আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের বহু ব্যক্তি তাঁর ভক্ত।

হরিদ্বারের গঙ্গার তীরের কঙ্খাল আশ্রমে এখনও তাঁর পবিত্র সমাধি মন্দিরে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে বহু ভক্তরা আসেন।

১৯৮২ সালের ২৭ আগস্ট দেরাদুনের কিশেনপুর আশ্রমে শ্রীশ্রী আনন্দময়ী মায়ের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।