নতুন বইয়ের সুবাস কিংবা পুরনো লাইব্রেরির সেই পরিচিত, মন কেমন করা গন্ধ— বইপ্রেমীদের কাছে এর চেয়ে প্রিয় অনুভূতি খুব কমই আছে। নতুন বই হাতে নিয়ে তার পাতা উল্টে গন্ধ শুঁকে দেখার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। পুরনো কোনও বইয়ের তাক খুললে যে সোঁদা, কিছুটা মিষ্টি এবং কাঠের মতো গন্ধ বের হয়, তাও আমাদের এক নিমেষে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ডিজিটাল যুগে ই-বুক বা পিডিএফের দাপট যতই বাড়ুক না কেন, একটা নতুন বইয়ের পাতা ওল্টানোর আনন্দ আর তার গন্ধের জাদু কোনো স্ক্রিন দিতে পারে না। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, নতুন বই এবং পুরনো কাগজের আলাদা গন্ধের পিছনে আসল কারণ কী?
কাগজ তৈরি হয় কী দিয়ে?
প্রথমে জানতে হবে কাগজের মূল উপাদান কী। সাধারণত কাগজ তৈরি হয় কাঠের মণ্ড বা পাল্প থেকে। কাঠের মধ্যে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে — সেলুলোজ (Cellulose), হেমিসেলুলোজ (Hemicellulose), লিগনিন (Lignin)।
এর মধ্যে সেলুলোজ কাগজের মূল কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু লিগনিন নামক জৈব যৌগটি কাগজের গন্ধ তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া কাগজ তৈরির সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, আঠা, রং এবং প্রলেপও ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি, ছাপার কালি এবং বাঁধাইয়ের উপকরণও গন্ধের উৎস হয়ে ওঠে।
নতুন বইয়ের গন্ধ কোথা থেকে আসে?
নতুন বইয়ের গন্ধ মূলত কাগজ, কালি, আঠা এবং মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে উৎপন্ন হয়।
কাগজ তৈরির সময় এবং মুদ্রণের পরে বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ ধীরে ধীরে বাতাসে মিশতে থাকে। এই যৌগগুলিকে বলা হয় উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compounds)। এই যৌগগুলো ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই খুব সহজে বাতাসে বাষ্পীভূত হতে শুরু করে। আমরা যখন নতুন বইয়ের পাতা ওল্টাই, তখন এই বাষ্পীভূত হওয়া রাসায়নিকগুলোই আমাদের নাকের ঘ্রাণেন্দ্রিয়তে পৌঁছায় এবং আমরা একটি চমৎকার ‘নতুন বইয়ের গন্ধ’ পাই।
নতুন বইয়ে যে উদ্বায়ী জৈব যৌগগুলি বেশি পাওয়া যায়, সেগুলি হল — টলুইন (Toluene), ইথাইলবেনজিন (Ethylbenzene), বিভিন্ন ধরনের অ্যালডিহাইড, কালি ও আঠা থেকে নির্গত জৈব যৌগ
বই ছাপার পর প্রথম কয়েক মাসে এই যৌগগুলির নির্গমন তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তাই সদ্য কেনা বইয়ের গন্ধ সাধারণত সবচেয়ে তীব্র মনে হয়।
পুরনো বইয়ের গন্ধ কেন আলাদা?
নতুন বইয়ের গন্ধ যদি হয় রাসায়নিকের তাজা সুবাস, তবে পুরনো বইয়ের গন্ধ হল “সময়ের রসায়ন”। পুরনো বইয়ের গন্ধটাকে অনেকেই বর্ণনা করেন ভ্যানিলা, বাদাম কিংবা হালকা মাটির সোঁদা গন্ধের মিশ্রণ হিসেবে। এই গন্ধ নতুন বইয়ের গন্ধের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর কারণ হল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হতে থাকে।
বছরের পর বছর ধরে যখন একটা বই আলমারিতে বা তাকে বন্দি থাকে, তখন বাতাসে থাকা অক্সিজেন, আর্দ্রতা এবং আলোর সংস্পর্শে এসে কাগজের এই সেলুলোজ ও লিগনিন ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় রাসায়নিক অবক্ষয় (Chemical Degradation)। এর ফলে কাগজগুলো শুধু যে হলদেটে হয়ে যায় তাই নয়, সেই সাথে বেশ কিছু নতুন উদ্বায়ী যৌগ (VOC) বাতাসে মুক্ত হয়।
রসায়নবিজ্ঞানীদের মতে, পুরনো বই থেকে প্রধানত নিচের যৌগগুলো তৈরি হয়, যা এই বিশেষ গন্ধের জন্য দায়ী:
১. ভ্যানিলিন (Vanillin): লিগনিন যখন ভেঙে যায়, তখন তা থেকে ভ্যানিলিন উৎপন্ন হয়। এটি ঠিক সেই উপাদান যা আমরা ভ্যানিলা আইসক্রিম বা কেকের সুগন্ধ তৈরিতে ব্যবহার করি। এই কারণেই পুরনো বইয়ে একটু মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়।
২. বেনজালডিহাইড (Benzaldehyde): এই যৌগটি ভাঙনের ফলে তৈরি হয় এবং এটি বইয়ের গন্ধে একটি মিষ্টি বাদাম বা অ্যালমন্ডের মতো সুবাস যোগ করে।
৩. ফারফিউরাল (Furfural): এটি কাগজ ভাঙার আরেকটি অন্যতম উপাদান, যা থেকে হালকা মিষ্টি এবং পাউরুটির মতো একটা চেনা গন্ধ আসে।
৪. টুলুইন এবং ইথাইল বেনজিন: এগুলো বইয়ে একটি হালকা মিষ্টি এবং মাটির মতো সোঁদা গন্ধের অনুভূতি এনে দেয়।
অনেক সময় দীর্ঘদিন আর্দ্র পরিবেশে রাখা বইয়ের পাতায় ছত্রাক বা ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে। এই অণুজীবগুলিও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে, যা এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে বা ছোপধরা গন্ধ সৃষ্টি করে।
তবে বইপ্রেমীরা যে ক্লাসিক “পুরনো বইয়ের গন্ধ” পছন্দ করেন, তার প্রধান উৎস ছত্রাক নয়; বরং কাগজের রাসায়নিক অবক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন উদ্বায়ী জৈব যৌগ।
সহজ কথায়, একটি পুরনো বই আসলে সময়ের সাথে সাথে নিজে নিজেই খুব ধীর গতিতে ক্ষয়ে যেতে থাকে এবং সেই ক্ষয়ের সুবাসই আমাদের মুগ্ধ করে।
মানুষ এই গন্ধ পছন্দ করে কেন?
এ তো গেল রাসায়নিক সমীকরণের কথা, কিন্তু মানুষের মন এই গন্ধটাকে এত ভালবাসে কেন? বিজ্ঞানের ভাষায় বইয়ের গন্ধের প্রতি এই গভীর ভালবাসাকে বলা হয় বিলিওসমিয়া (Bibliosmia)।
আমাদের মস্তিষ্কে ঘ্রাণ নেওয়ার যে অংশটি রয়েছে (Olfactory Bulb), সেটি সরাসরি যুক্ত আমাদের স্মৃতি ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দু অ্যামিগডালা (Amygdala) এবং হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)-এর সাথে। একে বিজ্ঞানে বলা হয় “প্রুস্টোনিয়ান ফেনোমেনন” (Proustian Phenomenon)। এর মানে হলো, অন্য যেকোন ইন্দ্রিয়ের (যেমন দেখা বা শোনা) চেয়ে গন্ধ মানুষের স্মৃতিকে সবচেয়ে দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে জাগিয়ে তুলতে পারে। যখন আপনি কোন বইয়ের গন্ধ পান, আপনার মস্তিষ্ক হয়ত অবচেতনভাবেই আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আপনার শৈশবের কোনও অলস দুপুরে, স্কুলের পুরনো লাইব্রেরিতে, কিংবা দাদু-ঠাকুমার ঘরের সেই কাঠের আলমারির সামনে। গন্ধটা আসলে একটা টাইম মেশিনের মতো কাজ করে।
বইয়ের গন্ধ থেকে বইয়ের বয়স
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এই গন্ধকে শুধু অনুভবই করেন না, গবেষণার কাজে ব্যবহারও করেন।
বিভিন্ন উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে বই বা কাগজ কতটা পুরনো হয়েছে, তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিছু গবেষক এই পদ্ধতিকে মজার ছলে “Sniffing Books” বা “বই শুঁকে বয়স নির্ধারণ” বলেও উল্লেখ করেছেন।
গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে সংরক্ষিত দুর্লভ বই এবং ঐতিহাসিক নথিপত্রের অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগে।
অবশেষে বলা যায়, নতুন বইয়ের গন্ধ এবং পুরনো কাগজের গন্ধ আসলে এক জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল। নতুন বইয়ের ক্ষেত্রে কালি, আঠা এবং অন্যান্য উপকরণ থেকে নির্গত উদ্বায়ী জৈব যৌগ গন্ধ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে পুরনো বইয়ের গন্ধ তৈরি হয় সেলুলোজ ও লিগনিনের ধীর রাসায়নিক অবক্ষয়ের ফলে উৎপন্ন বিভিন্ন যৌগ থেকে, যার মধ্যে ভ্যানিলিন অন্যতম।
তাই পরের বার যখন কোনও নতুন বইয়ের পাতা উল্টে তার গন্ধ নেবেন, অথবা কোনও পুরনো গ্রন্থাগারের ধুলোমাখা বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজে সেই পরিচিত সুবাস অনুভব করবেন, তখন মনে রাখবেন—আপনার নাকে ধরা পড়ছে আসলে সময়, রসায়ন এবং ইতিহাসের এক অদৃশ্য গল্প।
বিজ্ঞানের এই ধরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক বা “কেন” বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে এখানে দেখুন। আর আপনার মাথায় এরকম কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান