বিবিধ

লকডাউন

লকডাউন (Lockdown) হল একটি আপৎকালীন বা জরুরিভিত্তিক পদক্ষেপ বা পরিস্থিতি যখন কোন নির্দিষ্ট স্থান বা প্রতিষ্ঠান থেকে ঢোকা ও বেরোনো দুইই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই অচলাবস্থা জারি করার ক্ষমতা কেবল প্রশাসনিক প্রধানের থাকে। এটি মূলত একটি নিরাপত্তা মূলক পদক্ষেপ যেটি কোন জরুরি অবস্থার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কোন স্থানে লকডাউন জারি করার অর্থ সাময়িক সময়ের জন্য যে যেখানে আছে তাকে সেখানেই থাকতে হবে। সেই স্থান ছেড়ে কোন ভাবেই বেরোনো যাবে না।

লকডাউন সাধারণত দু ধরণের হয়ে থাকে। ১) প্রতিরক্ষামূলক ২) জরুরি ।

প্রতিরক্ষামূলক লকডাউন বলতে বোঝায় কোন নজিরবিহীন বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে জনগণ বা কোন সংস্থা বা কোন ব্যবস্থাকে বাঁচাতে আগাম প্রতিরক্ষামূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এই ধরণের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হল সম্ভাব্য সবরকম ঝুঁকি বা বিপদকে এড়ানো জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে।

জরুরি লকডাউন বলতে বোঝায় কোন অবশ্যম্ভাবী বিপদ যার দ্বারা জনগণের প্রবল ক্ষতি সাধন হতে পারে তা রোধ করতে আপৎকালীন ভিত্তিতে যে লকডাউন জারি করা হয়।

তবে এদুটি ছাড়াও আরও একটি ধরণের লকডাউন সম্প্রতি দেখা গেছে। সেটি সংক্রামিত রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়। সম্প্রতি করোনা ভাইরাস অতিমারীর সংক্রমণ ঠেকাতে চীন, আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, ভারত সহ বহুদেশ এই ব্যবস্থা প্রয়োগ করে।

কোন প্রতিষ্ঠান, অঞ্চল, শহর বা দেশে যখন এই ব্যবস্থা বলবৎ হয় সেখানে জনগণের গতিবিধি এবং যাতায়াত প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা (যেমন- রোজকার নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান, রেশন দোকান, সবজি বাজার, দুধ, মাছ, মাংসের দোকান, ওষুধের দোকান, ব্যাঙ্ক, তথ্য প্ৰযুক্তি পরিষেবা ইত্যাদি) ছাড়া সমস্ত অনাবশ্যক পরিষেবা (যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,রেস্তোরাঁ, হোটেল, সিনেমা হল, পাব, বার, ইত্যাদি) এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

সম্প্রতি ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস (corona virus) অতিমারী সংক্রমণ রোধ করতে চীন উহান শহরে প্রায় দুমাস ব্যাপী লকডাউন ব্যবস্থা জারি রাখে। চীনের পাশাপাশি অন্যান্য অনেক দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এদের মধ্যে গণ কোয়ারানটাইন (quarantine) এর নিরিখে বৃহত্তম হল ভারত। ভারত সংক্রমণ ঠেকাতে ২১ দিনের জন্য সারা দেশব্যাপী লকডাউন জারি করে এবং এর সাথে সারা দেশ জুড়ে মহামারী আইন, ১৮৯৭ ও জারি করে। লকডাউন চলাকালীন আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখব কেবল সংক্রামিত রোগের ক্ষেত্রেই নয় অন্যান্য বিশেষ ক্ষেত্রেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা জারি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চেরনোবিল এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের কথা বলা যায়। উত্তর ইউক্রেনের প্রিপায়াত শহরের কাছে অবস্থিত চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রে ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। পারমাণবিক বিকিরণ যাতে শহরের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে সেই কারণে ওই শহর এবংশহর লাগোয়া বিশাল অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই ব্যবস্থা জারি করে তৎকালীন সোভিয়েত সেনা।

জাপানের ফুকুশিমা দাইচিতেও যখন এরকম পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটে সেখানেও একইরকম ব্যবস্থা জারি করা হয় যতক্ষণনা বাতাসে পারমাণবিক বিষক্রিয়ার পরিমাণ কমছে।

কেবল দুর্ঘটনা নয় জঙ্গি আক্রমণেও লকডাউন করা হয়ে থাকে। যেমন করা হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নিউ ইয়র্কে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আক্রমণের পর আমেরিকা তিনদিনের জন্য আমেরিকার আকাশ সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবার জন্য লকডাউন করে দেয়। ফলে আমেরিকা মুখী সমস্ত বিমান কানাডার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। গোটা নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডি.সি পুরোপুরি লকডাউন করে দেওয়া হয়।

ঠিক একই কারণে বেলজিয়াম সরকার চারদিনের জন্য ব্রাসেলস শহরে লকডাউন ঘোষণা করে ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জঙ্গী হানার পর।

লকডাউন মানেই ঘরবন্দী হয়ে জীবন কাটানো। প্রাত্যহিক জীবনের রোজনামচা এক নিমেষে থেমে যায়। বাধ্য হয়েই মানুষকে ঘরে থাকতে হয় যতদিন না এই ব্যবস্থা উঠছে। কেউ একচিলতে ঘরেই গাদাগাদি করে থাকে আবার কেউ প্রাসাদোপম বাড়িতে বন্দী জীবন কাটায়। জার্মান সংবাদপত্র জেইট.দে (Zeit.de) র ২০১৪ সালে গড়পড়তা ঘরের আয়তন নিয়ে পৃথিবীর সাতটি দেশে করা একটি সমীক্ষায় একটি তথ্য উঠে আসে। এই তথ্যে দেখা যায় একজন আমেরিকান যেখানে ৮০৭ বর্গফুট জায়গা নিয়ে বসবাস করে সেখানে একজন নাইজেরীয় মাত্র ৬৫ বর্গফুটের মধ্যেই জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। দিনের পর দিন একটি নিৰ্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে থাকতে থাকতে মানুষের ব্যবহারগত আচরণে পরিবর্তন ঘটে যায়। মনস্তত্ববিদদের মতে মানুষ বন্দী অবস্থা একেবারেই পছন্দ করেনা। এর সঙ্গে তার চাহিদা অনুযায়ী সামগ্রীর অপ্রতুলতা তাকে ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহী করে তোলে। লকডাউনের সময় বন্দী মানুষ নিজেকে কারারুদ্ধ বন্দীর মত ভাবতে থাকে। ফলে সরকারী পদক্ষেপের প্রতি একরকম রাগ জন্মায়, আ্যড্রিনালিন(adrenaline) এবং স্ট্রেস হরমোন(stress hormone) কর্টিসোলের (cortisol) ক্ষরণ বেড়ে যায়। সে হিংস্র হয়ে ওঠে। সমস্ত আইন ভেঙে ফেলতে চায়। বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থার সময় তাই হামেশাই লকডাউন ভেঙে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে দাঙ্গা হাঙ্গামা লেগে যাওয়ার উদাহরণও পাওয়া যায়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।