সববাংলায়

ভাইরাস

সাধারণভাবে আমরা জীব ও জড় এই দুই ধরণের বস্তু দেখতেই অভ্যস্ত। এই জড় ও জীবের মাঝামাঝি একটা পর্যায়ে পড়ে ভাইরাস (virus)। ভাইরাস শব্দটি ল্যাটিন থেকে নেওয়া যার অর্থ বিষ, কারণ ভাইরাস জীবদেহে বিভিন্ন রোগসৃষ্টি করে।

ভাইরাস কি তা সহজ ভাবে বলতে গেলে বলা যায় – ভাইরাস হল অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব  যা শুধুমাত্র জীবিত কোষের ভিতরেই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়। ভাইরাস আকারে এতই ছোট যে বেশিরভাগকেই সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায় না এবং শুধুমাত্র ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েই দেখা সম্ভব। ভাইরাসের ব্যাস ২০ থেকে ৩০০ ন্যানোমিটার হয়ে থাকে। এদের আকার বিভিন্ন রকম হতে পারে যেমন গোলাকার, দণ্ডাকার, বর্তুলাকার, সূত্রাকার, বহুভুজাকার, ব্যাঙ্গাচি আকার ইত্যাদি।

ভাইরাস সমস্ত রকম জীব কোষ অর্থাৎ উদ্ভিদ, প্রাণী এমনকি ব্যাকটেরিয়ার দেহেও অবস্থান করতে পারে, পাশাপাশি জড় পদার্থের উপরও অবস্থান করতে পারে। সাধারণ ভাবে জীবের গুণগুলি সজীব কোষে থাকার সময় প্রকাশ পায় যেমন বংশবৃদ্ধি বা বিভাজনের মাধ্যমে নিজেদের সংখ্যা বাড়ানো আর জীব কোষের বাইরে জড় পদার্থের মতোই নিষ্ক্রিয়ভাবে থাকে।

ভাইরাস আবিস্কারের পথে কিছু মাইলফলকের কথা জেনে নেওয়া যাক। ১৮৮৬ সালে হল্যান্ডের প্রাণরসায়নবিদ এডলফ মেয়ার তামাক গাছের মোজাইক রোগ নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেন। রাশিয়ান জীববিজ্ঞানী দিমিত্রি ইভানোভস্কি ১৮৯২ সালে তামাক গাছের মোজাইক রোগ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন, রোগাক্রান্ত তামাক পাতার রস ব্যকটেরিয়ারোধক দিয়ে ফিল্টার করার পরও সুস্থ তামাক গাছে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।তখন তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন যে, তামাক গাছে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ব্যাকটেরিয়া হতে নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ কিংবা এর চেয়েও ছোট কোনও জীবাণু। ডাচ জীবাণুবিদ মারটিনিয়াস বাইজেরিনিক ১৮৯৮ সালে অনুমান করেন, তামাকের এ রোগের কারণ হয়ত এক ধরনের সংক্রমণশীল জীবন্ত তরল পদার্থ। তিনিই সর্বপ্রথম এ পদার্থকে ভাইরাস নাম দেন। এর পর মার্কিন জীব-রসায়নবিদ ডব্লু এম স্ট্যানলি ১৯৩৫ সালে তামাকের মোজাইক ভাইরাসকে পৃথক করে কেলাসিত করতে সক্ষম হোন। এ অবদানের কারণে তিনি ১৯৪৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। 

ভাইরাসের দেহে কোন নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম নেই; কেবল প্রোটিন এবং নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে তৈরি, তাই ভাইরাসকে অকোষীয় বলে। ভাইরাসের বংশগতির উপাদান অর্থাৎ নিউক্লিক অ্যাসিড দু’রকমেরই হতে পারে অর্থাৎ ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ (DNA) এবং রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা আরএনএ (RNA) তবে কোন এক প্রজাতির ভাইরাসে যেকোন এক ধরণের নিউক্লিক অ্যাসিড অর্থাৎ DNA বা RNA থাকতে পারে। ভাইরাসের বাইরের প্রোটিন আবরণকে ক্যাপসিড বলা হয় যা নিউক্লিক অ্যাসিডকে ঘিরে রাখে।

ভাইরাস কেবলমাত্র উপযুক্ত পোষকদেহের অভ্যন্তরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এই কারণে একই ভাইরাস সব প্রাণী বা উদ্ভিদের ক্ষতি করতে পারে না। ভাইরাসের প্রভাবে বেশ কিছু রোগ হয় যেমন এইডস, ডেঙ্গুজ্বর, পোলিওমায়োলাইটিস, হেপাটাইটিস, জলাতঙ্ক, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মাম্পস, হাম, বসন্ত বা পক্স, হারপিস, এনসেফালাইটিস ইত্যাদি। উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও ধান, তামাক, টমেটো, আলু, ফুলকপি ও ফলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজ ফসলের রোগ সৃষ্টি করে ভাইরাস। মানুষের মধ্যে কিছু ভাইরাস ঘটিত রোগ বিভিন্ন সময়ে মহামারী বা অতিমারী হিসেবে ছড়িয়েছে, যেমন ২০১৯-২০ সালে করোনা ভাইরাস – ২০১৯, ১৯৮১ সাল থেকে এইডস, ইবোলা ২০১৪ সালে ইত্যাদি।

তবে একথাও সত্যি, সব ভাইরাসই কিন্তু ক্ষতিকর নয়, বেশ কিছু উপকারী ভাইরাসও আছে যেমন ব্যাকটেরিওফাজ ভাইরাসগুলি ব্যাকটেরিয়ার দেহে বাসা বেঁধে সেগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের অন্ত্রে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে এরকম ফাজ ভাইরাসগুলি মেরে ফেলে বা তাদেরকে বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে আমাদেরকে সুস্থ রাখে। ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও ভাইরাসের প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা চলছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়া গেছে।

ক্ষতিকর ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে অনেক সময় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে টিকা দেওয়া হয়। টিকা কিভাবে কাজ করে তা জানতে এখানে দেখুন। কিছু কিছু ভাইরাসঘটিত রোগে অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধও দেওয়া হয়ে থাকে।

ভাইরাস সাধারণত সংক্রামক হয় অর্থাৎ এক দেহ থেকে অন্য দেহে সহজেই স্থানান্তরিত হয় তবে সবই একই ভাবে এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় না। এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমণের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি হলঃ বায়ুবাহিত (ফ্লু, মাম্পস), জলবাহিত (ডাইরিয়া, হেপাটাইটিস), মশাবাহিত (ডেঙ্গি, চিকেনগুনিয়া, জিকা) ইত্যাদি।

ভাইরাস ক্ষুদ্র হলেও জীবজগতে এর প্রভাব অপরিসীম, ভাইরাস নিয়ে গবেষণা ও পড়াশোনার জন্যেই একটি শাখা রয়েছে যাকে ভাইরোলজি (virology) বলে। এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হল একটি প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading