শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ

সাধারণভাবে ‘পক্ষ’ কথার অর্থ হল ১৫ দিন। প্রতি মাসে সাধারণত তিরিশ দিন থাকে। ফলে অঙ্কের হিসেব অনুযায়ী প্রতি মাসেই দুটি করে পক্ষ থাকে। হিন্দু চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এই পক্ষ আসলে চাঁদের বিশেষ দশা যা কিনা পনেরো দিন ধরে চলে। যে কোন চান্দ্রমাসে দুটি পক্ষ থাকে – শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ । সাধারণত পূর্ণিমার পরের দিন থেকে শুরু করে অমাবস্যা পর্যন্ত একটি পক্ষ ধরা হয় এবং অন্যদিকে অমাবস্যার পরের দিন থেকে শুরু করে পুনরায় পূর্ণিমা পর্যন্ত আরেকটি পক্ষ ধরা হয়। তাহলে প্রতি মাসে দুটি পক্ষ পড়লেও পূর্ণিমা ও অমাবস্যা সংঘটিত হয় মাত্র একবার করেই। প্রতিটি পক্ষের মধ্যে যে পনেরোটি দিন রয়েছে, চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী প্রতিটি দিনের বিশেষ নাম আছে যেগুলিকে ‘তিথি’ বলা হয়। চান্দ্রমাসের দুটি প্রধান পক্ষ শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ সম্পর্কে বিশদে জেনে নেওয়া যাক।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরার সময় প্রতিদিন ১২ ডিগ্রি কোণে আবর্তিত হয়। এভাবে প্রতি মাসের শেষে ৩৬০ ডিগ্রি কোণ ঘোরে অর্থাৎ পৃথিবীকে সম্পূর্ণ এক পাক দেয়। ঠিক এভাবেই চান্দ্র বর্ষপঞ্জিতে এই পক্ষের ধারণা দেওয়া হয়েছে। চাঁদের এই ১২ ডিগ্রি কোণে আবর্তনের ঘটনাকে একেকটি ‘চন্দ্রকলা’ বলা হয়। এই চন্দ্রকলার মধ্যে ষোলোটি কলা আছে। চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী চাঁদের ষোলো কলা পূর্ণ হলে তবেই পূর্ণিমা হয়। প্রত্যেক পক্ষেই এই কলা পূর্ণ হয় বা অবলুপ্ত হয় এবং তার ফলে পক্ষের শেষে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা দেখা যায়। শুরুতে গাণিতিক হিসেবে যে তিরিশ দিনে এক মাসের কথা বলা হল, তা কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেভাবে খাটে না। কারণ সাধারণত এক মাসে ৩০টি সৌরদিন থাকে, কিন্তু চান্দ্রমাস গড়ে ওঠে ২৯.৫ টি সৌরদিন নিয়ে। ফলে চান্দ্র বর্ষপঞ্জিতে মোট দিনসংখ্যা হয় ৩৫৪। এদিকে আমরা সাধারণভাবে জেনেছি এক বছরে মোট ৩৬৫ দিন থাকে। এখানেই স্পষ্ট করে মনে রাখা দরকার, আমাদের দিনক্ষণ হিসেব বা গণনার দুটি বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হয়। ইংরেজি ক্যালেণ্ডার অনুসরণ করে সৌর বর্ষপঞ্জি আর বাংলা পঞ্জিকায় অনুসৃত হয় চান্দ্র বর্ষপঞ্জি। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় খুব সহজে এই বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী চাঁদের একটি পূর্ণিমা থেকে অপর পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়কাল হল ১টি চান্দ্রমাস যাকে ৩০টি দিনে ভাগ করা হলে প্রত্যেক দিন তিথি হিসেবে ধার্য হয়। সৌর বর্ষপঞ্জির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এই তিথিগুলি সৌরদিনের চেয়ে খানিকটা বিস্তারে কম। ঠিক এই রকম ১৫টি করে তিথি নিয়েই গড়ে ওঠে চান্দ্রমাসের দুটি পক্ষ। প্রতিটি তিথির সময় এক রকম হয় না। মোটামুটিভাবে তিথিগুলি ২১.৫ ঘন্টা থেকে ২৬ ঘন্টা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। অন্যদিকে প্রতিটি সৌরদিনই ২৪ ঘন্টার হয়। এখানেই সৌরদিনের সঙ্গে তিথির পার্থক্য। সংস্কৃত ‘শুক্ল’ কথার অর্থ হল গৌর বা ফর্সা বা সাদা। হিন্দু চান্দ্র বর্ষপঞ্জিতে অমাবস্যা থেকে শুরু করে পরবর্তী পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫টি তিথির সময়কালকে বলা হয় শুক্লপক্ষ । এই সময় সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ থেকে ধীরে ধীরে চাঁদ ষোলোটি কলায় বাড়তে থাকে এবং পক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ পূর্ণিমায় একেবারে গোল থালার মতো উজ্জ্বল ছটাবিশিষ্ট চাঁদের দেখা মেলে আকাশে। শুক্লপক্ষের সূচনা লগ্নের অমাবস্যাকে বলা হয় শুক্লা অমাবস্যা এবং এর পরের দিন থেকে তিথিগুলি নামাঙ্কিত হয় এভাবে – প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী এবং শেষ দিনে পূর্ণিমা তিথি।

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ এর মধ্যে শুক্লপক্ষ যেমন অমাবস্যা তিথিতে শুরু হয়ে পূর্ণিমা তিথিতে শেষ হয়, ঠিক তেমনি কৃষ্ণপক্ষও পূর্ণিমা তিথিতে শুরু হয়ে বিপরীতক্রমে অমাবস্যা তিথিতে শেষ হয়। কৃষ্ণপক্ষের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে পূর্ণিমার পরের দিন থেকে প্রতিপদ এবং বাকি তিথিগুলিও শুক্লপক্ষের অনুসারেই পরিগণিত হয়। সংস্কৃত ‘কৃষ্ণ’ কথার অর্থ হল কালো বা অন্ধকার। পুরাণে কৃষ্ণের গায়ের রঙের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই পক্ষের নামকরণ করা হয়েছে কৃষ্ণপক্ষ হিসেবে। প্রতিটি পক্ষের অন্তর্গত তিথিগুলিকে বিশেষ বিশেষ নামে ডাকা হয়ে থাকে, যেমন – শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিকে বলা হয় শুক্লা পঞ্চমী, আবার কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিকে বলা হবে কৃষ্ণা চতুর্দশী ইত্যাদি।

চান্দ্র বর্ষপঞ্জিতে শুক্লপক্ষ, কৃষ্ণপক্ষ বা প্রতিটি তিথি হিন্দুদের কাছে উতসব-অনুষ্ঠান পালনের নির্দেশক হিসেবে কাজ করে বেশি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শুক্লপক্ষকে বেশি পবিত্র, পুণ্যার্হ বলে মনে করেন। ধর্মীয় রীতি-নীতির ক্ষেত্রে প্রতিটি পক্ষের নির্দিষ্ট তিথির বিশেষ তাৎপর্য আছে। বিভিন্ন পূজার তিথি নির্ণয় করা হয় এই পক্ষের হিসেব করেই। কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে দক্ষিণ ভারতে গোবর্ধন পূজা করা হয়, আবার কার্তিক মাসেই শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইদুজ। বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়ার দিনটি অক্ষয় তৃতীয়া নামে বাঙালিদের মধ্যে বহুল জনপ্রিয়। ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীতে সারা উত্তর ভারত জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় গণেশ পূজা। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিটি বিদ্যার্থীদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই তিথিতেই সরস্বতী পূজা হয়ে থাকে। আশ্বিন মাসে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে হিন্দু বাঙালিদের সবথেকে বড়ো পূজা দুর্গাপূজা। এভাবেই কৃষ্ণপক্ষেরও কিছু কিছু তিথি ধর্মীয় দিক থেকে খুবই উল্লেখযোগ্য। যেমন কার্তিক মাসের কৃষ্ণা চতুর্থীতে অবাঙালিরা পালন করেন করবা চৌথ আবার কার্তিক মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দক্ষিণ ভারতীয়রা পালন করে থাকেন নরক চতুর্দশী উৎসব। শ্রাবণ মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথি পালিত হয় জন্মাষ্টমী হিসেবে। ফলে হিন্দুদের কাছে প্রতি মাসের এই পক্ষ এবং তিথিগুলি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে আনে। চান্দ্র বর্ষপঞ্জি কিংবা এই চান্দ্রমাসের হিসেব বহু প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে, আজও তা বহমান।

আপনার মতামত জানান