বিজ্ঞান

করোনা ভাইরাস

করোনা ভাইরাস একটি সাধারণ ভাইরাস প্রজাতি যা মানুষসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ইত্যাদিকে রোগাক্রান্ত করতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে শ্বসন তন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং যার প্রভাব সাধারণত মৃদু হলেও কখনও কখনও খুব ভয়াবহ হতে পারে। এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনও টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি।

করোনা শব্দটি ল্যাটিন থেকে এসেছে যার অর্থ ক্রাউন বা মুকুট কারণ ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটি দেখতে অনেকটা মুকুটের মত।  এই ভাইরাস  নিডোভাইরাস (Nidovirales) শ্রেণীর করোনাভাইরিডা ( Coronaviridae) পরিবারভুক্ত অর্থকরোনা ভাইরিনা  (Orthocoronavirinae) উপগোত্রের একটি সংক্রমক ভাইরাস প্রজাতি। এ ভাইরাসের জিনোম সিঙ্গেল স্ট্রান্ডেড আরএনএ দিয়ে গঠিত। এর জিনোমের আকার সাধারণত ২৬ থেকে ৩২ কিলো বেসপেয়ার (Kilo Base-pair) এর  মধ্যে হয়ে থাকে যা এ ধরনের আরএনএ ভাইরাসের মধ্যে সর্ববৃহৎ।

করোনা ভাইরাস ১৯৬০ এর দশকে আবিষ্কৃত হয়। এখনও অবধি ৭ রকমের প্রজাতির করোনা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়েছে যা মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে প্রথমবার এই ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় সাধারণ ঠান্ডা লাগা, সর্দির ক্ষেত্রে এবং সেই প্রজাতির নাম দেওয়া হয় হিউম্যান করোনা ভাইরাস ২২৯ই (human corona virus 229E) এবং হিউম্যান করোনা ভাইরাস ওসি ৪৩ (human coronavirus OC43)। এই ভাইরাসের প্রভাবে সাধারণ ঠান্ডা লাগা থেকে শুরু করে জ্বর, নিউমোনিয়া, ব্রোঙ্কাইটিস ইত্যাদি হতে পারে।

তবে এখনও পর্যন্ত পাওয়া এর প্রজাতিগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হয়েছিল ২০০৩ সালে আবিষ্কৃত  সার্স ভাইরাস (severe acute respiratory syndrome – SARS) যার প্রাদুর্ভাবে ৭৭৪ জন মারা গিয়েছিল এবং ২০১২ সালে আবিষ্কৃত করোনা প্রজাতির মার্স ভাইরাস (Middle East respiratory syndrome – MERS) যার প্রভাবে ৮৫৮ জন মারা গিয়েছিল। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে সার্স বা মার্স ভাইরাস আক্রমণের কোন খবর নথিবদ্ধ হয়নি।

এরপর ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের য়ুহান শহরে নতুন করোনা ভাইরাস প্রজাতির আক্রমণের প্রমান পেয়েছেন, যার নাম রাখা হয়েছে নভেল করোনা ভাইরাস (2019-nCoV)।  এই ভাইরাস কয়েদিনের মধ্যেই মহামারীর আকার নিয়েছে এবং মাত্র এক মাসের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আক্রান্তের খবর মিলেছে যাঁরা য়ুহান প্রদেশে গিয়েছিলেন বা কোন আক্রান্তের সংস্পর্শে এসেছেন। এই ভাইরাসের অস্তিত্ব জানার দেড় মাসের মধ্যেই প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং সেই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (WHO)পরিস্থিতির বিচারে তীব্র সতর্কতা জারি করেছে এবং চীনের য়ুহান প্রদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

করোনা ভাইরাস আক্রান্তের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ ঠান্ডা লাগার মতই শুরু হয় অর্থাৎ প্রথম দিকে সর্দি, কাশি, জ্বর দিয়ে শুরু হয়। তবে এই ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হল, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে।  এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনও কোনও রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার। চিকিৎসকের  পরামর্শ যত শীঘ্র সম্ভব নেওয়া দরকার এবং সাম্প্রতিক ভ্রমণের ইতিহাস জানানো দরকার বিশেষ করে চীনে গিয়ে থাকলে বা সেখান থেকে আসা কারোর সাথে মেলামেশা থাকলে।

এই ভাইরাসের এখনও কোনও প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। তাই আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া বেশি জরুরী। WHO কিছু প্রাথমিক সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছে, সেগুলি হল –

  • ঘনঘন সাবান বা এলকোহল জাতীয় তরল দিয়ে হাত ধোওয়া।
  • হাঁচি/কাশি হলে টিস্যু বা হাত দিয়ে ঢেকে ফেলতে হবে এবং টিস্যুটি সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিতে হবে ও হাত ধুয়ে নিতে হবে।
  • যার জ্বর, সর্দি, কাশি হয়েছে তার সঙ্গে যথাসম্ভব দূরত্ব রাখতে হবে।
  • কাঁচা প্রাণীজ খাবার গ্রহণ না করা।
  • জ্বর, সর্দি, কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • সংক্রমিত অঞ্চলের প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি স্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।