ধর্ম

গুরুপূর্ণিমা

'গুরু' শব্দটি 'গু' এবং 'রু' এই দুটি সংস্কৃত শব্দ দ্বারা গঠিত; 'গু' শব্দের অর্থ "অন্ধকার" / "অজ্ঞতা" এবং 'রু' শব্দের অর্থ "যা অন্ধকারকে দূরীভূত করে"। অর্থাৎ, 'গুরু' শব্দটি দ্বারা এমন ব্যক্তিকে নির্দেশ করা হয় যিনি অন্ধকার দূরীভূত করেন। প্রাচীন আর্য সমাজে শিক্ষক বা গুরুর স্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল‚ বোঝা যায় যখন ছাত্র-শিক্ষক বা গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে সম্মানিত করতে একটি দিন উৎসর্গ করা হয়| এই দিনটি হল গুরুপূর্ণিমা।

 গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু‚ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ |
গুরুরেব পরং ব্রহ্মম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ  |

গুরুর সম্মানে একটি পূর্ণিমা উদ্‌যাপন করার এই রীতিটি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অবদান। বর্ষাবাস নামে পরিচিত এই পূর্ণিমার দিনটিতে সারা ভারতে বর্ষা শুরু হত। নবীন-প্রবীণ সমস্ত শ্রমণকে জনপদ ছেড়ে পাহাড়ের গুহায় বা মঠে গিয়ে জড়ো হয়ে শুরু করতেন ছত্রিশ সপ্তাহের  পাঠ গ্রহণ সূচি। ওই সময় জৈনধর্মেও ‘চাতুর্মাস’, বা চার মাসের ধর্মনিষ্ঠার পর্ব শুরু হত। জৈনরা বিশ্বাস করেন যে, গুরুপূর্ণিমা এর দিনেই গান্ধারের গৌতম স্বামীকে, মহাবীর তাঁর প্রধান শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন ও দীক্ষা দেন। বুদ্ধও, তাঁর বোধিজ্ঞান লাভের এক মাস পর, এই আষাঢ়ের পূর্ণিমাতেই, সারনাথে গিয়ে তাঁর পাঁচ প্রাক্তন সঙ্গীকে প্রথম উপদেশ দিয়েছিলেন, যাকে বলে ধম্ম-চক্কপবত্তন সুত্ত। তার পরেই তিনি বর্ষার চার মাস কাটিয়েছিলেন মূলগন্ধ-কুটিতে, এই সময়টাই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অনুসারীদের আত্মসংযমের সময়, যখন মাংস বা মাছ বা অন্যান্য কিছু খাবার থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হয়। সিংহলিরা এখনও এই বর্ষাবাস পালন করেন, তাঁদের ক্যালেন্ডারে যখন বর্ষা আসে সেই অনুযায়ী, আর তাইল্যান্ডের বৌদ্ধরা একে বলেন ফানসা এবং জুলাই থেকে অক্টোবর অবধি এটি বেশ অনুগত ভাবেই পালন করেন।ভিয়েতনাম, তিব্বত ও কোরিয়ায় বেশ কিছু বৌদ্ধ গোষ্ঠী এই সময়টিতে একটি জায়গা ছেড়ে অন্যত্র যান না।হিন্দুরা আবার মনে করেন আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষ(পূর্ণিমা) তিথিতে মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস, যিনি হিন্দুদের কাছে মহাভারত রচয়িতা 'বেদ ব্যাস' নামে পরিচিত, তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বেদ ব্যাস  বেদকে শতশাখাযুক্ত চার ভাগে বিভক্ত করেন বলেই তাঁর নাম  বেদ ব্যাস।  'ব্যাস' এর অর্থ ভাগ করা। তাঁর স্মরণে এই দিনটি হিন্দু সন্ন্যাসীরা বেদব্যাস কে সর্বশ্রেষ্ঠ গুরু মেনে ২১৬ স্তোত্রের 'গুরুগীতা' (যা কিনা বেদব্যাস স্বয়ং রচনা করেন এবং উৎসর্গ করেন সমস্ত গুরুদের উদ্দেশ্য) থেকে স্তোত্র পাঠের মাধ্যমে বেদব্যাস এর পুজো করেন যা 'ব্যাস পূজা' নামে পরিচিত। এটা মনে করা হয় যে মহর্ষি বেদব্যাসের সময় থেকেই গুরু শিষ্যের সম্পর্কের সূত্রপাত। এই দিনটিকে তাই গুরুর উদ্দেশ্যে শিষ্যের সম্মান প্রদর্শনের দিন হিসেবে পালন করা হয়।আবার হিন্দু পুরাণে আছে শিবের মাহাত্ম্য | মহাদেব হলেন আদি গুরু | তাঁর প্রথম শিষ্য হলেন সপ্তর্ষির সাতজন ঋষি—-অত্রি‚ বশিষ্ঠ‚ পুলহ‚ অঙ্গীরা‚ পুলস্থ্য‚মরীচি এবং ক্রতু | আদিযোগী শিব এই তিথিতে আদিগুরুতে রূপান্তরিত হন | তিনি এদিন ওই সাত ঋষিকে মহাজ্ঞান প্রদান করেন | নেপালে এই দিনটি শিক্ষক দিবস ও জাতীয় ছুটি হিসেবে পালিত হয়। ভারতেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই দিন ছাত্র ছাত্রীরা তাদের জীবনে শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকে।

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: ৫ই সেপ্টেম্বর ।। শিক্ষক দিবস | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!