ধর্ম

ইতু পূজা

ইতু পূজা কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে শুরু করে সারা অগ্রহায়ণ মাসের  প্রতি রবিবার পালন করা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির দিন পুজো শেষ হয়। কুমারী, সধবা, বিধবা সবাই এই ব্রত করতে পারে। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক দেশে এক গরিব বামুন তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে বাস করত। বামুন ভিক্ষে করে যা পেত তা দিয়েই তার সংসার চলত।বামুনের একদিন পিঠে খাবার ইচ্ছে হয়। সে অতি কষ্টে ভিক্ষে করে চাল, নারকেল, গুড়, তেল সব যোগাড় করে বামুনিকে পিঠে তৈরি করতে বলে আর বলে যেন কাউকে একটাও পিঠে না দেয়। এর পর বামুন রান্না ঘরের পিছনে লুকিয়ে বসে থাকে, আর বামুনি কড়াতে একটা করে পিঠে ভাজলে তার ছ্যাক ছ্যাক শব্দে বামুন দড়িতে একটা করে গিঁট দিয়ে কতগুলো পিঠে হলো তা গুনে রাখে।এর পর বামুনী বামুন কে পিঠে খেতে দিলে বামুন দড়ির গিঁট খুলতে খুলতে দেখে দুটো পিঠে কম। বামুনের রাগ দেখে বামুনি ভয়ে তার দুই মেয়েকে দুটো পিঠে দেবার কথা বলে। এই শুনে বামুন তার দুই মেয়েকে তাদের মাসির বাড়ি রেখে আসবে বলে। মেয়ে দুটির নাম উমনো আর ঝুমনো।

পরের দিন ভোর বেলা উমনো আর ঝুমনোকে সঙ্গে করে বামুন বাড়ি থেকে বের হয়। দিনটা ছিল কার্তিক মাসের সংক্রান্তির আগের দিন। সারা দিন চলতে চলতে তারা এক জঙ্গলে এসে উপস্থিত হয়। সেখানে বামুন তাদের ঘুম পাড়িয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। গভীর রাতে বাঘ,ভালুক এর শব্দে উমনো আর ঝুমনোর ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে তারা খুব কাঁদতে থাকে। কাতর স্বরে ভগবানকে ডাকতে থাকে। শেষে এক বট গাছের কাছে গিয়ে হাত জোর করে দুজনে বলে "হে বট বৃক্ষ! মা আমাদের দশ মাস দশ দিন গর্ভে স্থান দিয়েছেন। তুমি আজ রাতের জন্য তোমার কোটরে স্থান দাও।"
এর পর বট গাছ দু ফাঁক হয়ে গেলে তারা দু বোনে বট গাছের কোটরে রাত কাটায়,সকাল হতে তারা বট গাছকে প্রণাম করে জঙ্গলের পথ ধরে চলতে শুরু করে। চলতে চলতে তারা দেখে সামনে একটা বাড়ি। সেখানে মাটির সরা করে মেয়েরা পুজো করছে। বাড়ির কাছে পৌঁছলে দুটো ফুটফুটে মেয়ে দেখে বাড়ির গিন্নি তাদের সব কথা জিজ্ঞেস করলে তারা কাঁদতে কাঁদতে সব কথা খুলে বলে। বাড়ির মেয়েরা ঘটে করে কি পূজা করছে জিজ্ঞেস করলে গিন্নি জানায় এর নাম ইতু পুজো। আগের দিন উপোষ করে থাকলে তবেই ইতু পুজো করা যায়। এই কথা শুনে উমনো ঝুমনো বলে কাল থেকে তারা তো কিছুই খায়নি।  তখন গিন্নি তাদের পুজোর জোগাড় করে দিলে তারাও কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে ইতু পুজো করে। তাদের নিষ্পাপ ভক্তি দেখে ইতু ভগবান অর্থাৎ সূর্যদেব তাদের বর প্রার্থনা করতে বলে। তারা তাদের বাবার দুঃখ দূর হবার প্রার্থনা জানায়। সূর্যদেব তাদের মনকামনা পূরণ হবার আশীর্বাদ করেন। তারপর তারা অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবারে ভক্তি সহকারে ইতু পুজো করে সূর্য দেবের কাছ থেকে আশীর্বাদ পেতে থাকে।

ওই দিকে বামুনের ঘর ধনে ভরে উঠলেও বামুনির মুখে হাসি নেই। সে খালি মেয়েদের কথা ভাবে আর চোখের জল ফেলে। এই ভাবেই দিন যায়। এক দিন উমনো আর ঝুমনো বাড়ি ফিরে আসে। তা দেখে বামুন বামুনির আনন্দের শেষ থাকেনা। বামুনের অবস্থা তখন ভালই তাই তার মেয়েদের যত্নের শেষ নেই। কিন্তু তারা ইতু পুজোর কথা ভোলে নি,বাড়ি ফিরে তারা আবার পুজো আরম্ভ করে দেয়। তা দেখে বামুন তাদের কি পুজো করছে তা জানতে চায়।তারা ইতু পুজোর কথা বলে,আর সূর্য দেবের আশীর্বাদেই যে তাদের বাবার অবস্থা ভালো হয়েছে সেটাও বলে। তা শুনে বামুনিও ইতু পূজা শুরু করে দেয়। তাদের অবস্থা ক্রমশ ভালো হতে থাকে। এই ভাবে দিকে দিকে এই ইতু পূজার মাহাত্য ছড়িয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৩১
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৭১
  3. https://incepnow.com/story-of-itu-puja/

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!