ধর্ম

পৌষ মাসের লক্ষ্মী পূজা ব্রতকথা

বলা হয় পৌষ মাসের লক্ষ্মী পূজা পালন করলে সংসারে কোনো দিন অভাব বলে কিছু থাকে না। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক দেশে এক গরিব বামুন বামুনি তার পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাস করত। হঠাৎ বামুন মারা যাওযায় বামুনি খুব অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের বাচ্চাগুলোর মধ্যে মেয়ে ছিল সবচেয়ে বড়। তাদের কোনোদিন আহার জোটে তো কোনোদিন আহার জোটে না। তবে তাদের মামার অবস্থা ভালো ছিল। একদিন মেয়েটি তার মাকে বলে, "মা তুমি মামার বাড়ি যাও না, মামা যদি আমাদের সাহায্য করে।"
বামুনি অনেক ভেবে বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বাপের বাড়ি গেল,কিন্তু গিয়ে দেখে ভাই বাড়িতে নেই। অনেক দিন পর ননদ কে দেখে বামুনির ভাজ বলে এতদিন পর হঠাৎ কি মনে করে সে এল!  বামুনি তার দুঃখের কথা সব বলল। তাই শুনে ভাজ তাকে বলল, " তা তোমার ভাই তো এখন বাড়ি নেই। তুমি বরং রোজ এসে চাল ঝেড়ে দেবে আর ক্ষুদ কুঁড়ো যা বাঁচবে তাই নিয়ে যাবে।"
বামুনির এই বিপদের দিনে বামুনি তার ভাজের এই প্রস্তাবে রাজি হল। ক্ষুদসিদ্ধ করেই অন্তত বাচ্চাদের সে আধপেটা তো খেতে দিতে পারবে। এই ভেবে সে তার ভাজের রোজ চাল ঝেড়ে দিয়ে যায় আর ক্ষুদ কুঁড়ো যা বাঁচে তা তার বাড়ি নিয়ে যায়। এক দিন বামুনির মেয়ে তার মাকে বলে, "মা রোজ ভাইয়েরা শুধু ক্ষুদ সিদ্ধ খেতে পারে না। তুমি মামির কাছ থেকে একটু তরকারি নিয়ে আসবে।"
বামুনি তার ভাজের কাছে সে কথা জানালে ভাজ বলে তরকারি হবে না। বামুনি তারপর লাউগাছের দুটো পাতা চায় তা দিয়ে তরকারি রাঁধবে বলে। তা শুনে ভাজ বলে, " তোমার ভাই তো লাউগাছের পাতা সব গুনে রেখেছে গো! ওতে হাত দেওয়া যাবে না।"
এই শুনে বামুনি আর কিছু বলে না। এই ভাবেই কদিন কেটে যায়। বামুনিকে একদিন তার ভাজকে তার মাথার উকুন বেছে দিতে বলে। তাকে বলে যদি সে উকুন বেছে দেয় তাহলে তাকে গোটাকতক লাউপাতা দেবে। তা শুনে বামুনি বলে, " এমা! আজ তো লক্ষ্মীবার। আজ তো উকুন বাঁচতে নেই। আর অনেক বেলা হয়েছে।  ছেলেমেয়েরা খিদেয় ছটফট করছে। আমি বরং কাল উকুন বেছে দেব।"
তা শুনে তার ভাজ রেগে বলে, "বাহ নিজের বেলায় তো খুব ভালো বোঝো! আজ লক্ষ্মীবার হলে ক্ষুদ নিয়ে যাচ্ছ কেন? এতে ভাইয়ের অমঙ্গল হবে তো!"
এই বলে বামুনির কাছ থেকে সে সব ক্ষুদ কেড়ে নেয়। বামুনি তারপর কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসার সময় ভাবে সেদিন যাবার পথে যা পাবে তাই কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সিদ্ধ করে খাবে। কিন্তু তার এমনই ভাগ্য, যে সে যাবার পথে দেখে এক মস্ত বড় মরা সাপ পরে আছে। বামুনি তাই কুড়িয়ে নিয়ে ভাবে সেটাই সে সিদ্ধ করে খেয়ে সবাই একসাথে মরবে। সাপটাকে নিয়ে গিয়ে কেটে নুন দিয়ে সিদ্ধ করার সময় দেখে সাপটাকে যত ফোটানো হয় তার থেকে তত সোনার ফেনা বেরোয়। এই ভাবে গোটা ঘর সোনার ফেনায় ভরে যায়। বামুনি সেই সোনার ফেনা তুলে একটা মাটির হাড়িতে ভরে সেই ফেনা তার ছেলেদের দিয়ে স্যাকরার কাছে বিক্রির জন্য পাঠায়। স্যাকরা ভালো সোনা দেখে তা ভালো দাম দিয়ে কিনে নেয়। সেই দিন লক্ষ্মীবার ছিল। বামুনি টাকা পেয়ে আগে পুজোর জোগাড় করে ঘটা করে লক্ষ্মী পুজো করে। তারপর প্রতিবেশীদের ভালো করে প্রসাদ বিতরণ করে। ছেলেমেয়েদের প্রসাদ খাইয়ে তারপর নিজে খায়।

এইভাবে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে তাদের আর অভাব থাকে না। বড় বাড়ি ,পালকি ,ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বামুনির সব কাজ সম্পূর্ণ হয়। বামুনির অবস্থার কথা লোকমুখে প্রচার হতে হতে তার ভাজের কানেও পৌছায়। কি ব্যাপার তা বুঝতে না পেরে সে তার ননদ, ননদের ছেলে বউদের তার বাড়িতেএকদিন নেমন্তন্ন করলো। তখন বামুনিও তার বৌমাদের গা ভর্তি গয়না পরিয়ে পালকি করে ভাজের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে গেল। তাদের এমন অবস্থা দেখে ভাজের ভারী হিংসে হল। কিন্তু মুখে হাসি রেখে তাদের সোনার বাটি, রুপোর থালা করে খেতে দিল। তখন তারা তাদের সোনার গয়না খুলে রেখে বলতে লাগল
‌"সোনাদানা হিরে মুক্তা ধন্য মান্য গণ্য
‌যাদের কল্যাণে আজ মোদের নেমন্তন্ন"
‌ভাজ কিছু বুঝতে না পেরে তার ননদকে জিজ্ঞাসা করলে ননদ বলল, "ওরা বলতে চাইছে যখন আমাদের দুঃখ ছিল তখন দুটো ক্ষুদ আর লাউয়ের পাতাও প্রানভরে দিতে পারোনি। এখন আমাদের অবস্থা ফিরেছে বলে সোনার থালা বাটি করে খেতে দিচ্ছ।"
ভাজ তখন লজ্জায় তার ননদের হাত ধরে ক্ষমা চাইলো। এরপর বামুনি তার ছেলে বৌমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। অনেক দিন সুখে সংসার করে তার বৌমাদের লক্ষ্মী পুজোর সব নিয়ম শিখিয়ে দিয়ে অবশেষে বামুনি স্বর্গে পাড়ি দিল। এই ভাবে আস্তে আস্তে পৌষ মাসের লক্ষ্মী পূজা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ২২
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৬৫

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!