খেলা

ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটবিশ্বের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান (Sir Donald George Bradman) বা ডন ব্র্যাডম্যান। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জগতকে শাসন করেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য টেস্ট ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪ এর রেকর্ড আজ পর্যন্ত কোন ব্যাটসম্যানই চূর্ণ করতে সমর্থ হননি। অস্ট্রেলিয়াতে এমন কাহিনী প্রচলিত আছে যে তিনি ছোটবেলায় ক্রিকেটের একটি স্টাম্প এবং একটি গলফ বল নিয়ে অনুশীলন করতেন। বাইশতম জন্মদিনের আগেই তিনি সর্বোচ্চ স্কোরসহ আরো বেশ কিছু রেকর্ড করে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে কিছু রেকর্ড আজও কেউ ছুঁতে পারেননি। দীর্ঘ সময় ক্রিকেট জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি প্রশাসক, নির্বাচক এবং লেখক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কোটামুন্ড্রাতে একটি ইংরেজ পরিবারে ডন ব্র্যাডম্যানের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল জর্জ ব্র্যাডম্যান এবং মায়ের নাম ছিল এমিলি ব্র্যাডম্যান। পরবর্তীকালে তাঁরা মিটাগং-এর কাছে বাওরালে চলে যান। তিনি বাওরাল পাবলিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। এই বিদ্যালয়ের হয়ে মিটাগং উচ্চ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ১১৫ রানে অপরাজিত থেকে তিনি জীবনের প্রথম সেঞ্চুরিটি করেন।

ব্র্যাডম্যান অমানুষিক অধ্যাবসায় নিয়ে ব্যাটিং অনুশীলন করতেন কিশোর বয়স থেকেই। তিনি একা একা, কারও সঙ্গ ছাড়াই ক্রিকেট খেলার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ক্রিকেট স্টাম্পকে ব্যাট হিসেবে এবং গলফ বলকে ক্রিকেট বল হিসেবে ধরে তাঁর বাড়ির সামনে রাখা জলের ট্যাঙ্ক রাখার স্ট্যান্ডে বলটি ছুঁড়তেন। সেই বল যখন স্ট্যান্ডে লেগে বিভিন্ন গতির সাথে বিভিন্ন দিক বেঁকে তাঁর দিকে আসত তিনি সেই হাতে ধরা স্টাম্পের মাধ্যমে বলটি মারতেন। তাঁর এই স্বতন্ত্র ব্যাটিং অনুশীলন পদ্ধতি পরবর্তীকালে তাঁর ব্যাটিং দক্ষতাকে শিল্পের পর্যায় নিয়ে গেছিল।

১৯২০-২১ সিজনে তিনি স্থানীয় বাওরাল দলের হয়ে খেলতেন। এই সময়েই তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে পঞ্চম অ্যাশেস টেস্ট ম্যাচ (The Fifth Ashes Test Match) দেখতে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে যান। সেদিনই ব্র্যাডম্যান নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, “এই মাঠে না খেলা অবধি আমি কখনও তৃপ্ত হব না।” ১৯২২ সালে স্কুল ছেড়ে তিনি স্থানীয় একটি রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছে কাজ শুরু করেন যিনি তাঁকে খেলাতে উৎসাহ দিতেন। টেনিসের জন্য তিনি দু বছর ক্রিকেট খেলা বন্ধ রাখেন, কিন্তু ১৯২৫-২৬ সাল নাগাদ তিনি আবার ক্রিকেটের দুনিয়ায় ফিরে আসেন।

স্থানীয় বাওরাল দলে ধারাবাহিকভাবে তিনি ভাল ফল করতে থাকেন। অল্পদিনের মধ্যেই ডন ব্র্যাডম্যান নিউ সাউথ ওয়েলস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে যান। তাঁদের হয়ে খেলতে গিয়ে ১৯২৬-২৭ সাল নাগাদ তিনি সিডনিতে সেন্ট জর্জের হয়ে গ্রেড ক্রিকেট খেলার ডাক পান। পরবর্তী সিজনে ব্র্যাডম্যান ক্রমশ উন্নতি করতেই থাকেন এবং ক্রিকেট জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করে নিতে থাকেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে অ্যাডিলেড ওভালে (Adelaide Oval) ডন ব্র্যাডম্যান ফার্স্ট-ক্লাস খেলায় আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম দিনেই ১১৮ রান করে তিনি প্রমাণ করে দেন যে ভবিষ্যতে পায়ের দ্রুত কাজ, ধীরস্থির মানসিকতা এবং দ্রুত রান করার ক্ষমতা তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হতে চলেছে।

ফার্স্ট-ক্লাস খেলায় সাফল্যের পরে তাঁকে টেস্ট খেলাতেও সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথম টেস্টে বিশেষ সুবিধা করতে না পারায় দ্বিতীয় টেস্টে তিনি সুযোগ পাননি। তৃতীয় টেস্টে আবার সুযোগ পেলে তিনি দুটি ইনিংসে যথাক্রমে ৭৯ এবং ১১২ রান করেন এবং সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন। গোটা সিজনে তাঁর সঞ্চয় ছিল ১৬৯০ ফার্স্ট-ক্লাস রান, সঙ্গে গড়ে ৯৩.৮৮ রান। শেফিল্ড শিল্ড (Sheffield Shield) খেলায় তাঁর একাধিক সেঞ্চুরি এবং ভিক্টোরিয়ার বিরুদ্ধে অপরাজিত ৩৪০ রান সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে নতুন রেকর্ড তৈরি করে। এই মাঠেই কুইন্সল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪১৫ মিনিটে অপরাজিত ৪৫২ রান করে আরও একটি রেকর্ড করেন তিনি।

ওরসেস্টারে ২৩৬ রানের মাধ্যমে তিনি ১৯৩০ সালের যে ইংল্যান্ড সফর শুরু করেন এবং মে মাসের শেষে তা ১০০০ ফার্স্ট-ক্লাস রানে পৌঁছে যায়। বিশ্বের পঞ্চম ক্রিকেটার এবং প্রথম অস্ট্রেলীয় হিসেবে এটি তাঁর একটি অন্যতম রেকর্ড। এই সফরেই একদিনে তিনি ৩৩৪ রান করেন, যা অ্যান্ডি সান্ধামের ৩২৫ রানের রেকর্ডকে ভেঙে দেয়। এর সাথেই তিনি একদিনের ক্রিকেটে ৩০০ রান করা একমাত্র টেস্ট খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ডটি করেন। সেভাবে ক্রিকেটের কোনো প্রশিক্ষণ না থাকা ২২ বছরের তরুণ ডন ব্র্যাডম্যান এইভাবেই একের পর এক রেকর্ড করে ক্রিকেটের জগতে নিজের জায়গাটি সুনিশ্চিত করে তুলতে থাকেন।

যত সময় এগিয়েছে ডন ব্র্যাডম্যান তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর ক্রিকেটীয় দক্ষতাকে আরও পরিশীলিত এবং তীক্ষ্ণ করে তুলেছিলেন। তাঁকে আটকে রাখা কার্যত অসম্ভবের সমান হয়ে গিয়েছিল। বাউন্সারের সামনে ব্র্যাডম্যান সমস্যায় পড়েন একথা মাথায় রেখে তাঁকে আউট করতে ১৯৩২-১৯৩৩ সালে ইংল্যান্ডের অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন শর্ট-পিচ বোলিং-এর সঙ্গে চিরাচরিত লেগ থিওরিকে মিশিয়ে একটি বিশেষ পদ্ধতির বোলিং কৌশল হাজির করেন। এই কৌশলটি ক্রিকেটীয় পরিভাষায় বডিলাইন (Bodyline) নামে পরিচিত। প্রথমে ব্র্যাডম্যান কিছুটা সমস্যার সম্মমুখীন হলেও পরে তিনি নাটকীয়ভাবে প্রত্যাবর্তন করেন।

তিনি তাঁর জীবনের সবথেকে ধারাবাহিক ক্রিকেট খেলেছেন ১৯৩৮ সালের ইংল্যান্ড সফরের সময়। অধিনায়কত্বের চাপ থাকা সত্ত্বেও তাঁর খেলায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। একজন অভিজ্ঞ, দায়িত্ববান এবং সর্বোপরি একজন চরম প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে ততদিনে তিনি প্রতিষ্ঠিত। একচেটিয়া মাঠ শাসনের জন্য তখন তাঁর নাম হয়ে উঠেছে ‘ডন ব্র্যাডম্যান’। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তাঁর ১৯৩৯-১৯৪০ সালের সিজনটি অত্যন্ত সফল বছর হয়ে থেকেছে। কিন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় সমস্ত রকমের ক্রিকেটের সফর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলে এই কিংবদন্তির ক্রিকেটীয় স্বর্ণযুগের অবসান হয়।

১৯৪০ সালের ২৮ জুন তিনি রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সে যুক্ত হন এবং এয়ার ক্রিউ ডিউটিতে যোগদান করার জন্য উপযুক্ত নির্বাচিত হন। পরে ভিক্টোরিয়ার ফ্র্যাঙ্কস্টোনের সামরিক বিদ্যালয়ে শারীরিক প্রশিক্ষণের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তাঁর পদোন্নতি হয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর ফাইব্রোসাইটিস ধরা পড়ে, যার ফলে ১৯৪১ সালে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে হয়। এরপরে তিনি স্টকব্রোকিং-এর ব্যবসা শুরু করেন, যা থেকে ১৯৫৪ সালে অবসর নেন।

১৯৫০ সালে তাঁর একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয় যার নাম ‘ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট’। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্তিম বই ‘দ্য আর্ট অফ ক্রিকেট’ (The art of Cricket)। এই বইটিকে যেকোনো ক্রিকেটারের নির্দেশমূলক সারগ্রন্থ বলা যেতে পারে।

১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে জেসি মেঞ্জিসের (Jessie Menzies) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

১৯৪৯ সালে ক্রীড়াজগতে তাঁর অবদানের জন্য প্রথম অস্ট্রেলীয় হিসেবে তিনি ‘নাইট ব্যাচেলর’ উপাধি পান। আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রীড়াজগতের একাধিক সম্মান তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর ছবিসহ কিছু ডাকটিকিট এবং মুদ্রা প্রকাশ করা হয়। ২০০৯ সালে মরণোত্তরকালে তাঁকে ‘আইসিসি ক্রিকেট হল অফ ফেম’-এরঅন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০০০ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে নিউমনিয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নতুন বছরে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু ২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রাণপুরুষ ডন ব্র্যাডম্যানের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।