পেঁচা পেঁচী ব্রত ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার সকালে পালিত হয়। বলা হয় কোন নারী ভাদ্র মাসে এই লক্ষ্মী পুজো পালন করলে তার ঘরে সর্বদা মা লক্ষ্মী বিরাজ করেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।
২০২৬ সালের পেঁচা পেঁচী ব্রত কবে?
- বাংলা তারিখ: ২ ভাদ্র, ১৪৩৩ এবং ৯ ভাদ্র, ১৪৩৩
- ইংরাজি তারিখ: ২০ আগস্ট, ২০২৬ এবং ২৭ আগস্ট, ২০২৬
এক দেশে বিধবা বামনী বাস করতেন, তার একটি ছোট ছেলে ছিল। তারা খুব গরিব, কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পায় তাই দিয়েই তাদের চলে যায়। তাদের কুঁড়ে ঘরের সামনে একটা বটগাছ ছিল, বামনির ছেলে সেই গাছের নিচে খেলা করত। এক দুপুরে ছেলেটা উঠোনে খেলা করছিল, এমন সময় একজন ক্ষীরওয়ালা সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই দেখে সে মায়ের কাছে পয়সা চাইল, কিন্তু বামুনি কেঁদে বললেন তারা যে গরিব পয়সা পাবে কোথায়! তা শুনে ছেলেও কাঁদতে থাকল। তাই দেখে ক্ষীরওয়ালা ছেলেটিকে এমনিই এক ভাঁড় ক্ষীর দিয়ে যায়।
ক্ষীর পেয়ে মনের আনন্দে সে গাছ তলায় গিয়ে বসল। সেই গাছে পেঁচা পেঁচির দুটি ছানা থাকত। ক্ষীর দেখে তারাও ক্ষীর খাবার জন্য চেঁচামেচি করতে লাগল। বামুনির ছেলে গাছে উঠে তাদের নিচে নামিয়ে পেট ভরে ক্ষীর খাওয়াল, তারপর তাদের বাসায় তুলে ঘুম পাড়িয়ে দিল। পেঁচা পেঁচী বাসায় ফিরে দেখে তাদের ছানারা আরামে ঘুমোচ্ছে। তাদের ডেকে খাওয়াতে গেলে তারা বলে, “ওই গরিব বামুনের ছেলেটা আমাদের ক্ষীর খাইয়েছে। বামুনের জিনিস খেয়ে থাকতে নাই, তুমি ওদের অবস্থা ফিরিয়ে দাও।”
তা শুনে পেঁচি হেসে বলে, “আমি মা লক্ষ্মীর কাছে ওদের দুঃখের কথা জানাবো।”
এই ভাবে প্রতিদিন পেঁচা পেঁচী তার বাচ্ছাদের রেখে যায় আর বাসায় ফিরে দেখে বাচ্চারা নিশ্চিন্তে ঘুমোছে। ছানারা তার মা বাবার কাছে ওদের দুঃখের কথা রোজ রোজ বলে আর পেঁচা পেঁচীর দুঃখে মন ভরে যায়।
একদিন ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবারে বামনী অনেক কষ্ট করেও লক্ষ্মী পুজো করছিলেন। তার ছেলে প্রাসাদ এনে পেঁচা পেঁচীর ছানাদের খাওয়াল। তারপর যখন পেঁচা পেঁচি ফিরল, তখন ছানারা তাদের বলল, “আমরা আর তোমাদের কাছে খাবো না, ওই ছেলেটা যেখান থেকে যা পায় তা থেকে আমাদের খাইযে যায়, তোমরা ওর দুঃখ কেন ভালো করে দিচ্ছ না?”
পেঁচা পেঁচী তার ছানাদের বলল, “আজ ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার, বামনী লক্ষ্মী পুজো করেছে। মা লক্ষ্মী ওদের দুঃখ ঠিক দূর করে দেবে।”
সকালে ছেলেটা যখন গাছের নিচে বসেছিল, পেঁচা এসে তাকে বলল, ” শোন ছেলে! তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। তুমি যাবে?”
ছেলেটা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। পেঁচা পেঁচী তাকে বলল, “তুমি ওই ডালটার উপর গিয়ে বসো। আমরা দু দিক দিয়ে ধরে তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবো। যেখানে নামাবো সেখানে কেউ যদি তোমাকে সোনা ধন দৌলত দিতে চায় তুমি নেবে না। শুধু বলবে তিল ধুবড়ি দিতে। “
কথামতো পেঁচা পেঁচী ছেলেটাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মা লক্ষ্মীর বাগানে নামিয়ে দিল। ছেলেটা সেখানে মা লক্ষ্মীকে দেখতে পেয়ে প্রনাম করল। ছেলেটিকে দেখে মা লক্ষ্মীর খুব দয়া হল। মা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে ?”
ছেলেটি বলল, “মা আমরা খুব গরিব। আপনার কাছে তিলধুবড়ি নিতে এসেছি।”
মা তাকে অনেক ধন সোনা দেখালেন, কিন্তু তার মধ্যে রাখা তিলধুবড়িটাই সে নিতে চাইল। মা বললেন, ” তুমি এটা নাও কিন্তু রোজ ভক্তি ভরে এটাকে পুজো করবে তাহলে তোমাদের আর কোনো দুঃখ অভাব থাকবে না।”
পেঁচা পেঁচী আবার তাকে কুঁড়ে ঘরের সামনে নামিয়ে দিল। সে তার মাকে সব খুলে বলল। বামনী ঘর পরিষ্কার করে একটা পিড়ি পেতে তাতে আল্পনা দিয়ে তার উপর ঘটে তিলধুবড়ি রেখে পুজো করলেন। তারপর থেকে রোজ ভক্তি ভরে পুজো করতে থাকলেন। দেখতে দেখতে অনেক দিন গেল, মা লক্ষ্মীর দয়ায় তাদের প্রচুর ধনসম্পদ হল।
তাদের হঠাৎ এত প্রতিপত্তি দেখে পাড়ার লোকে খুব আশ্চর্য হল। এমনকি রাজার কানেও তাদের কথা গেল। তারা হঠাৎ করে কিভাবে এত ধনী হল জানবার জন্য পাড়ার লোকে উৎসুক হয়েছিল। তারপর তারা জানতে পারল বামুনির তিল ধুবড়ি পুজোর কথা। রাজা সেটা জানতে পেরে ভাবল যখন তাদের এত সম্পত্তির বহর বাড়ছে, তখন কোনদিন রাজার রাজত্বও কেড়ে নিতে পারে। এই ভেবে বামুনির ঘর লুট করে তিল ধুবড়ি নিয়ে চলে গেল। আসলে মা লক্ষ্মীর ছলনাতেই এটা হল। মা লক্ষ্মীর জিনিস মা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারেই ফিরে গেল। আর বামুনি আর তার ছেলে তাদের আগের অবস্থাতেই ফিরে গেল।
এই দেখে পেঁচা পেঁচীর ছানারা খুব কষ্ট পেয়ে তাদের মাকে বলল, “ওদের কি দোষ ছিল মা? রাজা তো ভয়ে এসব করল। তুমি আবার মা লক্ষ্মীকে বলে কিছু ব্যবস্থা করে দাও না!”
কিন্তু পেঁচী বলল, “এখন তো কিছু করা যাবে না। ওরা তো রাখতে পারল না।”
কিন্তু ছানারা মায়ের কথা শোনে না আর কাঁদতে থাকল। তখন বাধ্য হয়ে পেঁচী আবার ছেলেটিকে নিয়ে মা লক্ষ্মীর কাছে গেল। মা লক্ষ্মী প্রথমে রাজি না হলেও নারায়ণের কথায় আবার তাদের তিল ধুবড়ি দিয়ে বললেন, “এবারে কিন্তু রাখতে না পারলে আর পাবে না।”
ছেলেটা মা লক্ষ্মীকে প্রণাম করে আবার পেঁচীর সাহায্যে বাড়ি ফিরে এল। ফিরে এসে মাকে আবার সব কথা বলল। আগের মতই বামুনি ভক্তিভরে পুজো করতে লাগলেন। দেখতে দেখতে আবার তারা আগের মত ধনী হয়ে উঠল।
এই দেখে রাজা আবার ভয় পেল। কিন্তু এবারে বামুনির ঘর লুট না করে বরং বামুনির ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করলেন। তারপর তাদের বিয়ের পরে ছেলেটিও মস্ত বড় রাজা হলেন। আর পেঁচা পেঁচীর ছানাদেরও রোজ খাবারের বন্দোবস্ত করে দিলেন। তারপর একসময় বামুনির যখন মৃত্যুকাল উপস্থিত হল তখন বৈকুণ্ঠ থেকে তার জন্য রথ নেমে এল। বামুনি রথে উঠবার আগে বউমাকে ডেকে ভাদ্র, কার্ত্তিক, পৌষ আর চৈত্র মাসে মা লক্ষ্মীর পুজো করতে বললেন। বামুনি মারা গেলে ছেলে বউ খুব ঘটা করে তার শ্রাদ্ধ করলেন। তারপর তারা ভক্তিভরে মা লক্ষ্মীর পুজো করতে থাকলেন। তাদেরও যখন মৃত্যুকাল উপস্থিত হল, তারা তাদের ছেলেমেয়েদের লক্ষ্মী পুজোর কথা বলে রথে চেপে বৈকুণ্ঠে চলে গেলেন।
ধীরে ধীরে পেঁচা পেঁচীর ব্রত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১
- মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১০১


আপনার মতামত জানান