ধর্ম

পেঁচা পেঁচীর ব্রত

পেঁচা পেঁচীর ব্রত ভাদ্র মাসে পালিত হয়। বলা হয় কোন নারী ভাদ্র মাসে এই লক্ষ্মী পুজো পালন করলে তার ঘরে সর্বদা মা লক্ষ্মী বিরাজ করেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক দেশে বিধবা বামনী বাস করতো,তার একটি ছোট ছেলে ছিল। তারা খুব গরিব,কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পায় তাই দিয়েই তাদের চলে যায়। তাদের কুঁড়ে ঘরের সামনে একটা বটগাছ ছিল, বামনির ছেলে সেই গাছের নিচে খেলা করত। এক দুপুরে ছেলেটা উঠোনে খেলা করছিল, এমন সময় ক্ষীরওয়ালা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তা দেখে সে মায়ের কাছে পয়সা চাইল, কিন্তু বামুনি কেঁদে বলল তারা যে গরিব পয়সা পাবে কোথায়। তা শুনে ছেলেও কাঁদতে থাকল, তাই দেখে ক্ষীরওয়ালা এমনিই এক ভাঁড় ক্ষির দিয়ে যায়। ক্ষীর পেয়ে মনের আনন্দে সে গাছ তলায় গিয়ে বসল। সেই গাছে পেঁচা পেঁচির দুটি ছানা থাকত। ক্ষীর দেখে তারাও ক্ষির খাবার জন্য চেঁচামেচি করতে লাগলো। বামুনির ছেলে গাছে উঠে তাদের নিচে নামিয়ে পেট ভরে ক্ষীর খাওয়াল, তারপর তাদের বাসায় তুলে ঘুম পাড়িয়ে দিল।পেঁচা পেঁচি বাসায় ফিরে দেখে তাদের ছানারা আরামে ঘুমচ্ছে। তাদের ডেকে খাওয়াতে গেলে তারা বলে, "ওই গরিব বামুনের ছেলেটা আমাদের ক্ষীর খাইয়েছে। বামুনের জিনিস খেয়ে থাকতে নাই, তুমি ওদের অবস্থা ফিরিয়ে দাও।"
তা শুনে পেঁচি হেসে বলে,  "আমি মা লক্ষ্মীর কাছে ওদের দুঃখের কথা জানবো।"

এই ভাবে প্রতিদিন পেঁচা পেঁচি তার বাচ্ছাদের রেখে যায় আর বাসায় ফিরে দেখে বাচ্চারা নিশ্চিন্তে ঘুমোছে। ছানারা তার মা বাবার কাছে ওদের দুঃখের কথা রোজ রোজ বলে আর পেঁচা পেঁচির দুঃখে মন ভরে যায়।
একদিন ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবারে বামনী অনেক কষ্ট করেও লক্ষ্মী পুজো করছিল। তার ছেলে প্রাসাদ এনে পেঁচা পেঁচির ছানাদের খাওয়াল। তারপর যখন পেঁচা পেঁচি ফিরল, তখন ছানারা তাদের বলল, "আমরা আর তোমাদের কাছে খাবো না,ওই ছেলেটা যেখান থেকে যা পায় তা থেকে আমাদের খাইযে যায়, তোমরা ওর দুঃখ কেন ভালো করে দিচ্ছ না।"
পেঁচা পেঁচি তার ছানাদের বলল, "আজ ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার, বামনী লক্ষ্মী পুজো করেছে মা ওদের দুঃখ ঠিক দূর করে দেবে।"

সকালে ছেলেটা যখন গাছের নিচে বসেছিল, পেঁচা এসে তাকে বলে,  " শোন ছেলে! তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো,তুমি যাবে?"
ছেলেটা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। পেঁচা পেঁচি তাকে বলল, "তুমি ওই ডালটার উপর গিয়ে বস আমরা দু দিক দিয়ে ধরে তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবো। যেখানে নামাবো সেখানে কেউ যদি তোমাকে সোনা ধন দৌলত দিতে চায় তুমি নেবে না। শুধু বলবে তিল ধুবড়ি দিতে। "
কথামতো পেঁচা পেঁচি ছেলেটাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মা লক্ষ্মীর বাগানে নামিয়ে দিল। ছেলেটা সেখানে মা লক্ষী কে দেখতে পেয়ে প্রনাম করল। ছেলেটিকে দেখে মা লক্ষ্মীর খুব দয়া হল। মা জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কে ?"
ছেলেটি বলল, " মা আমরা খুব গরিব। আপনার কাছে তিলধুবড়ি নিতে এসেছি।"
মা তাকে অনেক ধন সোনা দেখালেন, কিন্তু তার মধ্যে রাখা তিলধুবড়িতাই সে নিতে চাইল। মা বললেন, " তুমি এটা নাও কিন্তু রোজ ভক্তি ভরে এটাকে পুজো করবে তাহলে তোমাদের আর কোনো দুঃখ অভাব থাকবে না।"

পেঁচা পেঁচি আবার তাকে কুঁড়ে ঘরের সামনে নামিয়ে দিল। সে তার মাকে সব খুলে বলল। বামনী ঘর পরিষ্কার করে একটা পিড়ি পেতে তাতে আল্পনা দিয়ে তার উপর ঘটে তিলধুবড়ি রেখে পুজো করল। তারপর থেকে রোজ ভক্তি ভরে পুজো করতে থাকল। দেখতে দেখতে দিন পাড় হল, মা লক্ষ্মীর দয়ায় তাদের প্রচুর ধনসম্পদ হল।

তাদের হঠাৎ এত প্রতিপত্তি দেখে পাড়ার লোকে খুব আশ্চর্য হল। এমনকি রাজার কানেও তাদের কথা গেল। তারা হঠাৎ করে কিভাবে এত ধনী হল জানবার জন্য পাড়ার লোকে উৎসুক হয়েছিল। তারপর তারা জানতে পারল বামুনির তিল ধুবড়ি পুজোর কথা। রাজা সেটা জানতে পেরে ভাবল যখন তাদের এত সম্পত্তির বহর বাড়ছে, তখন কোনদিন রাজার রাজত্বও কেড়ে নিতে পারে। এই ভেবে বামুনির ঘর লুট করে তিল ধুবড়ি নিয়ে চলে গেল। আসলে মা লক্ষ্মীর ছলনাতেই মা লক্ষ্মীর জিনিস মা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারেই ফিরে গেল। আর বামুনি আর তার ছেলে তাদের আগের অবস্থাতেই ফিরে গেল।

এই দেখে পেঁচা পেঁচির ছানারা খুব কষ্ট পেয়ে তাদের মাকে বলল, "ওদের কি দোষ ছিল মা? রাজা তো ভয়ে এসব করল। তুমি আবার মা লক্ষ্মীকে বলে কিছু ব্যবস্থা করে দাও না!"
কিন্তু পেঁচি বলল, "এখন তো কিছু করা যাবে না। ওরা তো রাখতে পারল না।"
কিন্তু ছানারা মায়ের কথা শোনে না আর কাঁদতে থাকল। তখন বাধ্য হয়ে পেঁচি আবার ছেলেটিকে নিয়ে মা লক্ষ্মীর কাছে গেল। মা লক্ষ্মী প্রথমে রাজি না হলেও নারায়ণের কথায় আবার তাদের তিল ধুবড়ি দিয়ে বললেন, "এবারে কিন্তু রাখতে না পারলে আর পাবে না।"
ছেলেটা মা লক্ষ্মীকে প্রণাম করে আবার পেঁচির সাহায্যে বাড়ি ফিরে এল। ফিরে এসে মাকে আবার সব কথা বলল। আগের মতই বামুনি ভক্তিভরে পুজো করতে লাগল। দেখতে দেখতে আবার তারা আগের মত ধনী হয়ে উঠল।

এই দেখে রাজা আবার ভয় পেল। কিন্তু এবারে বামুনির ঘর লুট না করে বরং বামুনির ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করল। তারপর তাদের বিয়ের পরে ছেলেটিও মস্ত বড় রাজা হল। আর পেঁচা পেঁচির ছানাদেরও রোজ খাবারের বন্দোবস্ত করে দিল। তারপর একসময় বামুনির যখন মৃত্যুকাল উপস্থিত হল তখন বৈকুণ্ঠ থেকে তার জন্য রথ নেমে এল। বামুনি রথে উঠবার আগে বউমাকে ডেকে ভাদ্র, কার্ত্তিক, পৌষ আর চৈত্র মাসে মা লক্ষ্মীর পুজো করতে বলল। সঙ্গে বলল পুজোর নিয়মাবলী। বামুনি মারা গেলে ছেলে বউ খুব ঘটা করে তার শ্রাদ্ধ করল। তারপর তারা ভক্তিভরে মা লক্ষ্মীর পুজো করতে থাকল। তাদেরও যখন মৃত্যুকাল উপস্থিত হল, তারা তাদের ছেলেমেয়েদের লক্ষ্মী পুজোর কথা বলে রথে চেপে বৈকুণ্ঠে চলে গেল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১০১

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!