ধর্ম

দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির

হিন্দুদের কাছে  দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  ধর্মস্থান। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে ‘স্নানযাত্রার দিন’- হুগলী নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত  দক্ষিণেশ্বর নামক জায়গায় অবস্থিত এই মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন রানি রাসমণিদেবী।এই মন্দিরে দেবী কালীকে “ভবতারিণী” নামে পূজা করা হয়।

ভারতবর্ষে যে ক’টি কালী সাধনা স্থল আছে, দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির তাদের মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি ইতিহাস আছে। ১৮৪৭ সালে কলকাতার জানবাজারের রানি রাসমণিদেবী অন্নপূর্ণার পুজো দেবেন বলে কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজন করেন। ২৪টি নৌকা আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী সবকিছু প্রস্তুত। যাত্রার ঠিক আগের দিন রাতে রানি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পান যে তার কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি মন্দিরে কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা করলে দেবী সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই পূজা গ্রহণ করবেন।”

অবশেষে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ২০ একরের প্লটটি জন হেস্টি নামে এক ইংরেজের কাছ থেকে কেনেন রানি। সবাই বলত– ‘সাহেবান বাগিচা’। এর একটি অংশ ছিল মুসলমানদের কবরখানা।জমিটি দেখতে কচ্ছপের পিঠের মত তাই তন্ত্রমতে স্থানটি শক্তি উপাসনার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। ১৮৪৭ সালে এই বিরাট মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়; শেষ হয় ১৮৫৫ সালে। খরচ হয়েছিল ৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা, যার মধ্যে শুধু উদ্বোধনের দিনই খরচ হয়েছিল ২ লক্ষ টাকা। ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরের গর্ভগৃহে সহস্র পাপড়ির রৌপ্য-পদ্মের উপর শায়িত শিবের বুকে দেবী কালী দাঁড়িয়ে। একটি পাথর থেকেই তৈরি হয়েছে এই দেবীমূর্তি।

তবে মন্দির উদ্বোধন নিয়ে বেশ কিছু জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছিল।  শোনা যায়, দক্ষিণেশ্বর মন্দির-উদ্বোধনের নিমন্ত্রণের চিঠি পেয়ে রামকৃষ্ণের দাদা রানির প্রতিনিধিদের বলেন, রানি কৈবর্ত জাতি। তাঁর নিমন্ত্রণ ও দান গ্রহণ করলে তাঁকে ‘একঘরে’ হতে হবে। রানির বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ কর্মীরা তাঁকে বোঝান রানি কিন্তু কৈবর্ত নন, মাহিষ্য সম্প্রদায়ের। শেষ পর্যন্ত রামকুমার রাজি হন এবং তাঁর ভাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা দিবসের এক দিন আগে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হন। সারা দেশ থেকে ১ লক্ষেরও বেশী ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত ছিল। দাদা দক্ষিণেশ্বরের প্রসাদ গ্রহণ করলেও গদাধর বাজার থেকে এক পয়সার মুড়ি-মুড়কি কিনে খেয়ে, ঝামাপুকুরে ফিরে আসেন। পরে দাদার নির্দেশে পঞ্চবটীতলে নিজের হাতে রান্না করে খেতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দুপুরে পঞ্চবটীতে পাক করলেও রাত্রে প্রসাদী লুচি খেতেন এবং জগদম্বাকে বলতেন, “মা, আমাকে কৈবতের্র অন্ন খাওয়ালি।” সেইসময় গরিব কাঙালরাও দক্ষিণেশ্বরে খেতে আগ্রহী ছিল না এবং খাওয়ার লোক না জোটায় প্রসাদী অন্ন গরুকে দেওয়া হত বা গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হত।চাকরিতে ঠাকুরের আগ্রহ কখনওই ছিল না। কিন্তু রানির জামাই মথুরবাবু একপ্রকার জোর করেই তাঁকে বিষ্ণুঘরের পূজার দায়িত্ব দিলেন। এবং ভাগ্নে হৃদয়কে দুই ভাইয়ের সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। কিছুকাল বাদে ঠাকুরের পুজো দেখে মথুরবাবু শাশুড়ি রাসমণীকে বললেন, “অদ্ভুত পূজক পাওয়া গিয়েছে, দেবী বোধহয় শীঘ্রই জাগ্রতা হয়ে উঠবেন।”

কথামৃত রচয়িতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ফুটনোটে বলেছেন — ১৮৫৮ সালে রানি রাসমণির বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী ঠাকুর ওরফে রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় মাইনে পাচ্ছেন মাসিক পাঁচ টাকা। (পরে তা হয় সাত টাকা।) তাঁর ভাগ্নে ‘পরিচারক’ হৃদয় মুখার্জির বেতন সাড়ে তিন টাকা। এঁর বাড়তি দায়িত্ব ছিল ফুল তোলার। এ ছাড়া বরাদ্দ তিন জোড়া কাপড়, যার মূল্য সাড়ে চার টাকা। সেই সঙ্গে প্রতিদিনের খোরাকি হিসেবে সিদ্ধ চাল, ডাল, তামাক, কাঠ।।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দের প্রার্থনা হল স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।১৮৮৪ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংস নরেন্দ্রনাথ দত্তকে (স্বামী বিবেকানন্দের আগের নাম) দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে  আর্থিক উন্নতির জন্য প্রার্থনা করতে পাঠিয়েছিলেন।কিন্তু আর্থিক সমস্যা দূর করার উদ্দেশ্যে তিন বার কালীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে গিয়ে তিন বারই নরেন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছিলেন: “মা, জ্ঞান ও ভক্তি ছাড়া আর কিছুই আমি চাই না।”বিবেকানন্দের জীবনীকার বি. আর. কিশোরের মতে, “এই ঘটনা নরেন্দ্রনাথের ভক্তি ও জ্ঞানে নতুন মাত্রা যোগ করে। এর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী। তিনি দিব্যজননীকে গ্রহণ করতে অসম্মত ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি মায়ের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হলেন।”

মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্যশৈলীর নবরত্ন স্থাপত্যধারায় নির্মিত। মূল মন্দিরটি তিন তলা। উপরের দুটি তলে এর নয়টি চূড়া বণ্টিত হয়েছে। মন্দির দক্ষিণমুখী। একটি উত্তোলিত দালানের উপর গর্ভগৃহটি স্থাপিত। এই দালানটি ৪৬ বর্গফুট প্রসারিত ও ১০০ ফুট উঁচু। মূল মন্দিরের কাছে যে বারোটি একই প্রকার দেখতে পূর্বমুখী শিবমন্দির রয়েছে সেগুলি আটচালা স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।গর্ভগৃহে শিবের বুকের ওপর মা ভবতারিণীর  মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত। দুটি মূর্তিই একটি রুপোর সহস্রদল পদ্মের উপর স্থাপিত। গঙ্গার একটি ঘাটে দুই ধারে এই মন্দিরগুলি দণ্ডায়মান। মন্দির চত্বরের উত্তর-পূর্বে রয়েছে বিষ্ণুমন্দির বা রাধাকান্ত মন্দির।

মন্দির খোলা থাকার সময়ঃ

অক্টোবর থেকে মার্চ-     ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০টা – বিকেল ৩ টে থেকে সন্ধ্যে ৮.৩০ টা

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর – ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২.৩০টা – বিকেল ৩ টে থেকে রাত ৯টা

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।