সববাংলায়

দক্ষিণেশ্বর মন্দির

হিন্দুদের কাছে  দক্ষিণেশ্বর মন্দির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মস্থান। এই মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন রানি রাসমণিদেবী। এই মন্দিরে দেবী কালীকে “ভবতারিণী” নামে পূজা করা হয়।

ভারতবর্ষে যে ক’টি কালী সাধনা স্থল আছে, দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির তাদের মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি ইতিহাস আছে। ১৮৪৭ সালে কলকাতার জানবাজারের রানি রাসমণিদেবী কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজন করেন। ২৪টি নৌকা আত্মীয়স্বজন, দাসদাসী সবকিছু প্রস্তুত। যাত্রার ঠিক আগের দিন রাতে রানি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পান যে তার কাশী যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি মন্দিরে কালী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা করলে দেবী সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই পূজা গ্রহণ করবেন। তখন রানি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ২০ একরের প্লটটি জন হেস্টি নামে এক ইংরেজের কাছ থেকে কেনেন। জায়গাটাকে সবাই বলত ‘সাহেবান বাগিচা’। এর একটি অংশ ছিল মুসলমানদের কবরখানা। জমিটি দেখতে কচ্ছপের পিঠের মত তাই তন্ত্রমতে স্থানটি শক্তি উপাসনার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। ১৮৪৭ সালে এই বিরাট মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৮৫৫ সালে। খরচ হয়েছিল ৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা, যার মধ্যে শুধু উদ্বোধনের দিনই খরচ হয়েছিল ২ লক্ষ টাকা।

তবে মন্দির উদ্বোধন নিয়ে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তিনি জাতিতে শূদ্র হওয়ায় সামাজিক প্রথা অনুযায়ী কোন ব্রাহ্মণই মন্দির প্রতিষ্ঠা ও দেবীকে ভোগ দিতে রাজি হলেন না। সবাই এই কাজকে অশাস্ত্রীয় বলেন। একমাত্র কলকাতার ঝামাপুকুর চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত রামকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন প্রতিষ্ঠার আগে যদি কোন ব্রাহ্মণকে ঐ মন্দির দান করা যায় এবং সেই ব্রাহ্মণ যদি ঐ মন্দিরে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন তবে তা অশাস্ত্রীয় হবে না। রামকুমার তাঁর ভাই রামকৃষ্ণকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হন এবং মূর্তির প্রতিষ্ঠা করেন। সারা দেশ থেকে একলক্ষেরও বেশী ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত ছিল। দাদা রামকুমার মারা গেলে তাঁর ভাই রামকৃষ্ণের ওপর পূজা করার দায়িত্ব এসে জোটে। তবে চাকরিতে ঠাকুর রামকৃষ্ণের আগ্রহ কখনওই ছিল না। কিন্তু রানির জামাই মথুরবাবু একপ্রকার জোর করেই তাঁকে পূজার দায়িত্ব দিলেন এবং ভাগ্নে হৃদয়কে দুই ভাইয়ের সাহায্যকারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। কিছুকাল বাদে ঠাকুরের পুজো দেখে মথুরবাবু শাশুড়ি রাসমণিকে বললেন, “অদ্ভুত পূজারী পাওয়া গিয়েছে, দেবী বোধহয় শীঘ্রই জাগ্রতা হয়ে উঠবেন।

কথামৃত রচয়িতা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ফুটনোটে বলেছেন “১৮৫৮ সালে রানি রাসমণির বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী ঠাকুর ওরফে রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় মাইনে পাচ্ছেন মাসিক পাঁচ টাকা। (পরে তা হয় সাত টাকা।) তাঁর ভাগ্নে ‘পরিচারক’ হৃদয় মুখার্জির বেতন সাড়ে তিন টাকা। এঁর বাড়তি দায়িত্ব ছিল ফুল তোলার। এ ছাড়া বরাদ্দ তিন জোড়া কাপড়, যার মূল্য সাড়ে চার টাকা। সেই সঙ্গে প্রতিদিনের খোরাকি হিসেবে সিদ্ধ চাল, ডাল, তামাক, কাঠ।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দের প্রার্থনা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৮৮৪ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংস নরেন্দ্রনাথ দত্তকে (স্বামী বিবেকানন্দের আগের নাম) দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে আর্থিক উন্নতির জন্য প্রার্থনা করতে পাঠিয়েছিলেন।কিন্তু আর্থিক সমস্যা দূর করার উদ্দেশ্যে তিন বার কালীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে গিয়ে তিন বারই নরেন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছিলেন: “মা, জ্ঞান ও ভক্তি ছাড়া আর কিছুই আমি চাই না।
বিবেকানন্দের জীবনীকার বি. আর. কিশোরের মতে, “এই ঘটনা নরেন্দ্রনাথের ভক্তি ও জ্ঞানে নতুন মাত্রা যোগ করে। এর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূর্তিপূজার বিরোধী। তিনি দিব্যজননীকে গ্রহণ করতে অসম্মত ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি মায়ের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হলেন।

মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্যশৈলীর নবরত্ন স্থাপত্যধারায় নির্মিত। মূল মন্দিরটি তিন তলা। উপরের দুটি তলে এর নয়টি চূড়া বণ্টিত হয়েছে। মন্দির দক্ষিণমুখী। একটি উত্তোলিত দালানের উপর গর্ভগৃহটি স্থাপিত। এই দালানটি ৪৬ বর্গফুট প্রসারিত ও ১০০ ফুট উঁচু। মূল মন্দিরের দক্ষিণদিকে রয়েছে নাটমন্দির। এছাড়াও মন্দির চত্বরে আরও একাধিক মন্দির রয়েছে। মন্দির চত্বরের উত্তর-পূর্বদিকে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ মন্দির বা রাধাকান্ত মন্দির এবং গঙ্গার ধারে রয়েছে দ্বাদশ শিবমন্দির। দ্বাদশ শিবমন্দির হল আটচালা স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বারোটি শিবমন্দির। মন্দিরগুলো সবকটা পূর্বমুখী এবং গঙ্গাঘাটের দুইদিকে অবস্থিত। মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে রামকৃষ্ণ পরমহংসের বাসগৃহ।

গর্ভগৃহে রুপোর তৈরি হাজার পাপড়ির পদ্মের উপর রাখা আছে শায়িত শিবের বুকে মা কালীর মূর্তি। এখানে কালীকে ভবতারিণী রূপে পূজা করা হয়। একটি পাথর থেকেই তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ মূর্তি, যা ১৮৫৫ সালের ৩১ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই দিনটি ছিল জগন্নাথের স্নানযাত্রার দিন।

কালীপূজা এখানের প্রধান উৎসব। প্রতি বছরই এই দিন ভোর থেকে কয়েক হাজার ভক্তদের ভিড়ে ভরে যায় মন্দির চত্বর। মন্দির চত্বরে লাগানো বড় পর্দায় ভবতারিণীর পূজা দেখানো হয়। ভক্তেরা নাটমন্দির এবং মন্দির সংলগ্ন চাতালে বসে সেই পূজা দেখে। চতুর্থ প্রহরে পূজা শেষ হওয়ার পরে সকালে প্রসাদ নিয়ে মন্দির থেকে বাড়ি ফেরে তারা।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading