ভারতের ওড়িশা রাজ্যের রাজধানী হল ভুবনেশ্বর। ‘ভারতের মন্দির নগরী’ এই ভুবনেশ্বরে একসময় প্রায় ৭০০০ মন্দির ছিল বলে অনুমান করা হয়, তার মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ও অন্যতম প্রাচীন মন্দির হল লিঙ্গরাজ মন্দির (Lingaraja Temple)।
লিঙ্গরাজ মন্দিরে একটি স্বয়ম্ভূ লিঙ্গের পূজা করা হয়। কেউ মনে করেন ওই লিঙ্গটি আসলে শিব আবার কারো কারো মতে মন্দিরে হরি ও হর অর্থাৎ বিষ্ণু ও শিব একসঙ্গে একই লিঙ্গে পূজিত হন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী বিষ্ণু পালনকর্তা আর শিব সংহারকর্তা। ভারতের হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান দুই শাখা শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের মেলবন্ধন দেখা যায় এই মন্দিরে। লিঙ্গরাজ মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশাধিকার নেই। তবে, বাইরের একটি মঞ্চ থেকে মন্দিরের অপূর্ব স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দেখে মুগ্ধ হতে পারেন অহিন্দু দর্শনার্থীরা। এছাড়া এই মন্দিরের মধ্যে ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের অসাধারণ মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। বিদেশিরা এই মন্দিরকে ‘দি গ্রেট টেম্পেল’ নামে অভিহিত করেছিলেন।
ব্রহ্মপুরাণ অনুযায়ী ভুবনেশ্বরের প্রাচীন নাম হল একাম্র ক্ষেত্র। লিঙ্গরাজ মন্দির সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, অতীতে এই একাম্র ক্ষেত্রে একটি ঐশ্বরিক বন ছিল। হিন্দু ধর্মের অন্যতম উপপুরাণ একাম্র পুরাণের মতে বহুকাল আগে থেকে একাম্র ক্ষেত্রের একটি আম গাছের নীচে একটি লিঙ্গ পূজিত হত। লোক বিশ্বাস অনুযায়ী এই লিঙ্গ আসলে হর ও হরির মিলিত রূপ, আবার কিছু মানুষের মতে লিঙ্গটির মাধ্যমে ভগবান শিব প্রথম থেকেই এখানে এক ঐশ্বরিক শক্তি রূপে আবির্ভূত ছিলেন।
লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠার সময়কাল নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকগণ স্বীকার করেছেন যে কোনও একক ব্যক্তি কর্তৃক এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মোটামুটি ভাবে একথা বলা যায় যে মন্দিরটি সোমবংশীয় রাজা নির্মাণ করা শুরু করেছিলেন আর পরবর্তীকালে গঙ্গাবংশীয় রাজারাও এই মন্দির নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ঐতিহাসিক জেমস ফারগুসন (James Fergusson)-এর মতে সোমবংশীয় রাজা ললাট ইন্দু কেশরী মন্দিরটি তৈরি করা শুরু করেন, যিনি ৬১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। অর্থাৎ সপ্তম শতকে মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল বলে ফারগুসন মনে করতেন। তবে মন্দিরের জগমোহন, গর্ভগৃহ ও মিনার তৈরি করা হয়েছিল একাদশ শতকের দিকে। এছাড়া ১০৯৯ সাল থেকে ১১০৪ সালের মধ্যে নাটমন্দির ও দ্বাদশ শতকে ভোগমণ্ডপ তৈরি করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, একাদশ শতকেই লিঙ্গরাজ মন্দির নির্মাণ করেন সোমবংশীয় রাজা প্রথম যযাতি বা যযাতি কেশরী। তিনি নিজের রাজধানী জাজপুর থেকে একাম্র ক্ষেত্র বা ভুবনেশ্বরে নিয়ে চলে যান আর সেখানেই তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তবে কে.সি.পাণিগ্রাহি (K.C.Panigrahi) এই মত স্বীকার করেননি। তাঁর মতে প্রথম যযাতির সময়ে এই মন্দির নির্মাণ করা সম্ভব নয়। বরং তাঁর ছেলে অনন্ত কেশরী এবং উদ্যোত কেশরী বা দ্বিতীয় যযাতির সময়ে মন্দিরটি তৈরি করা সম্ভব বলে পাণিগ্রাহি মনে করেন। এক্ষেত্রে বলা ভালো যে, এই মন্দিরের অপরূপ কারুকার্য মণ্ডিত শোভা এবং মন্দিরের বিভিন্ন উপকরণ পরীক্ষা করে ঐতিহাসিকগণ অনুমান করেন প্রথম যযাতির দুর্বল উত্তরসূরির পক্ষে এই ধরনের অসাধারণ স্থাপত্যশিল্প নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় লিঙ্গরাজ মন্দিরে। তাছাড়া এই মন্দিরে দেউল রীতি অনুসারে বিমান বা গর্ভগৃহ, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগমন্দিরও নির্মাণ করা হয়। সমগ্র মন্দিরটি প্রায় ২২৭২০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত আর প্রধান মন্দির ছাড়া মূল মন্দিরের আশেপাশে আরও অনেক অপরূপ মন্দির রয়েছে। এখানের মন্দিরগুলি ল্যাটেরাইট মাটির বিশাল প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রাচীরটি প্রায় ৭.৫ ফুট বা ২.৩ মিটার পুরু। মন্দিরের মুখ পূর্বদিকে হলেও উত্তর ও দক্ষিণে ছোট ছোট প্রবেশদ্বার আছে। এছাড়া সমগ্র মন্দিরটি খোন্ডালাইট ও ল্যাটেরাইট মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং মন্দিরের প্রবেশপথের দরজাটি চন্দন কাঠ দ্বারা নির্মিত। সিমেন্ট জাতীয় কোনও বস্তু ছাড়া এই মন্দিরের গাঁথুনির কাজ কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল তা সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে।
ভোগমণ্ডপের প্রতিটি দেওয়ালে চারটি দরজা ও পিরামিড আকৃতির একটি ছাদ রয়েছে। আর নাটমন্দিরের একটি মূল প্রবেশপথ ছাড়া আরও দুটি প্রবেশপথ আছে, দেবদাসী কর্তৃক ব্যবহৃত এই কক্ষের ছাদটি সমতল ঢালু প্রকৃতির। এছাড়া জগমোহন কক্ষের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দরজা রয়েছে। এছাড়া এই কক্ষের ৩০ মিটার লম্বা, পিরামিড আকৃতির একটি ছাদ আছে। বর্গাকৃতি জগমোহন কক্ষে প্রবেশের সম্মুখভাগে ছিদ্রযুক্ত জানালা রয়েছে। ভোগমণ্ডপ থেকে গর্ভগৃহ পর্যন্ত ধীরে ধীরে মন্দিরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এই মন্দিরের সর্বোচ্চ মিনারের উচ্চতা প্রায় ১৮০ ফুট। মন্দিরের পূর্বমুখী দরজা দিয়ে সূর্যের প্রথম রশ্মি সরাসরি মন্দিরে প্রবেশ করে, এই আলো মন্দিরের প্রাকৃতিক আলো ও উষ্ণতা বজায় রাখার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া মন্দিরের নকশায় উন্নত ধ্বনিবিদ্যার প্রকৌশল লক্ষ করা যায়, যার ফলে মন্দিরের ব্যবহৃত উপকরণ ও স্থাপত্য কৌশলগুলি মন্ত্রোচ্চারণ ও নানা আচার অনুষ্ঠানের সময় শব্দ বিতরণ উন্নত করে সর্বোত্তমভাবে শব্দকে প্রতিধ্বনিত করে। আধুনিক প্রকৌশলের সাহায্যে মন্দিরটি যাতে ভূমিকম্প, জলবায়ু পরিবর্তন সহ্য করতে পারে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। আবার এই মন্দির নির্মাণের সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কীভাবে অত বড় বড় পাথরগুলিকে পরিবহন করা হয়েছিল তা আধুনিক স্থাপত্যশিল্পীদেরও বিস্মিত করে। এইসকল উন্নত প্রযুক্তি কৌশলের সাহায্যে এখনও মন্দিরটি স্থিতিশীল হয়ে রয়েছে।
বর্তমানে এই মন্দিরটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (Archaeological Survey of India) অধীনে রয়েছে। লিঙ্গরাজ মন্দিরের গঠনশৈলী একদিকে যেমন আমাদের বিস্মিত করে আবার মন্দিরে কারুকর্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভোগমণ্ডপের বাইরের দেওয়ালে মানুষ ও পশুর ভাস্কর্য, নাটমন্দিরের দেওয়ালে নারী ও নানা যুগল মূর্তির ভাস্কর্য, জগমোহনের গায়ে এক সিংহের অপূর্ব ভাস্কর্য দেখা যায়। এছাড়া গর্ভগৃহের দেওয়ালে রয়েছে এক সিংহের মূর্তিসহ নানা ধরনের নারীমূর্তি। আবার এই মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অলসকন্যা, প্রেমিকযুগল, শিশুক্রোড়ে মাতৃমূর্তি ইত্যাদি চিত্র। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, নারীর শিক্ষা, প্রসাধন, প্রেমকলা, গৃহধর্ম সবক্ষেত্রে সেদিনকার নারী সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে মন্দিরের কারুকার্যখচিত শৈলীগুলির মধ্যে দিয়ে। এই মন্দিরে লিঙ্গরাজ ছাড়াও পার্বতী অন্নপূর্ণা বা গিরিজা রূপে, ভগবান বিষ্ণু, গণেশ, নন্দী, কার্তিক, মকরবাহিনী গঙ্গা, যমুনার মূর্তিও পূজিত হয়। এছাড়া এই মন্দিরের উত্তরের বিন্দুসাগর সরোবরের জল শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা প্রদান করে বলে লোককথা প্রচলিত আছে। লিঙ্গরাজ মন্দিরে অহিন্দুদের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ হলেও ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সময় বাইরে থেকে মন্দির দর্শনের জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে সমস্ত অহিন্দু দর্শনার্থীরা ওই মঞ্চ থেকেই মন্দিরের শোভা উপভোগ করতে পারেন।
লিঙ্গরাজ শব্দের অর্থ হল লিঙ্গের রাজা, হিন্দুধর্ম মতে লিঙ্গ হল শিবের প্রতিরূপ। লিঙ্গরাজ মন্দিরের লিঙ্গটি প্রাকৃতিক নির্দিষ্ট আকৃতিহীন একটি পাথর, যাকে শক্তির আধার বলে মনে করা হয়। এই স্বয়ম্ভু লিঙ্গটি নিজে থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়, এই লিঙ্গকে কেউ হরিহর আবার অনেকে দেবাদিদেব শিব বলে মনে করেন। তবে মন্দিরের পতাকায় শিবের হরধনুর চিহ্ন দেখা যায় বলে লিঙ্গটিকে শিবের প্রতীক হিসাবেই মনে করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, নারায়ণ বা বিষ্ণু লিঙ্গ নয় বরং শিলায় পূজিত হন। এই স্বয়ম্ভু লিঙ্গটির ব্যাস ৮ ফুট এবং উচ্চতা ৮ ইঞ্চি। অনুমান করা হয় যে এই লিঙ্গটি সপ্তম শতাব্দীতেও পূজিত হত।
লিঙ্গরাজ মন্দিরে প্রতিদিন প্রচুর দর্শক সমাগম হয়। তবে ফাল্গুন মাসের মহাশিবরাত্রি, অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু করে ২১ দিনের চন্দনযাত্রা, চৈত্র মাসে লিঙ্গরাজের রথযাত্রা অশোকাষ্টমীতে প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। প্রতি বছর এই উৎসবগুলিতে লিঙ্গরাজ মন্দিরের অঙ্গন ভক্তবৃন্দের আনন্দ ও উচ্ছাসে ভরে ওঠে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘ভারতের মন্দির’, রামাপদ চৌধুরী, প্রিয়া বুক হাউস, তৃতীয় সংস্করণ, ২০২২, পৃষ্ঠা- ১৭-২০
- https://en.wikipedia.org/
- https://avaada.com/
- https://bhubaneswartourism.in/


আপনার মতামত জানান