সব

দেবযানী বণিক হত্যা মামলা

দেবযানী বণিক হত্যা মামলা

ভারতে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও গৃহবধূ নির্যাতনের ঘটনা এক জ্বলন্ত সমস্যা। বিবাহের সময় পণ-যৌতুক দেওয়া নিয়ে সমস্যা কিংবা শ্বশুরবাড়ির অহেতুক চাহিদা মেটানোর অক্ষমতা থেকে গৃহবধূর উপর নেমে আসে চূড়ান্ত অত্যাচার। আর এরই মাঝে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারা কিংবা পিটিয়ে খুন করে ফেলার মত ঘটনাও নেহাত কম নয়। বাংলা ভাষার কোনও বিশেষণ দিয়েই এইরকম ঘটনাগুলির নির্মমতা ও নৃশংসতার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। খোদ কলকাতার বুকেও আশির দশকে ঘটে যাওয়া এরকমই এক চাঞ্চল্যকর গৃহবধূ খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেবযানী বণিক হত্যা মামলা রুজু হয়েছিল।

আলিপুর আদালতে ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শুরু হয় দেবযানী বণিক হত্যা মামলা। আদালতের ৪৯ নং এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন কলকাতার গড়িয়াহাট এলাকার বিখ্যাত বণিক পরিবারের কর্তা চন্দ্রনাথ বণিক, তার পুত্র চন্দন বণিক, অসীম বণিক, জয়ন্তী বণিক, সুমিত্রা বণিক ও বিত্রা বণিক। মৃতা দেবযানীর সম্পর্কে এরা যথাক্রমে তাঁর শ্বশুরমশাই, স্বামী, দেওর এবং ননদ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০ বি, ৩০২, ২০১ এবং ৩৪ নং ধারা অনুসারে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, খুন, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। এই মামলার তদন্ত করেছিলেন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার সুজিত সান্যাল। বিত্রা বণিকের বিচার যদিও জুভেনাইল আদালতে হয়েছিল তার নাবালকত্বের কারণে। প্রথমে আলিপুর আদালতে মামলার শুনানি হলেও পরে চন্দ্রনাথ বণিক ফের সেই শুনানির বিরোধিতা করে কলকাতা উচ্চ আদালতে মামলা রুজু করেন। উচ্চ আদালতের শুনানিতেও এই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। মামলা গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। দেবযানী বণিক হত্যা মামলা সমাপ্ত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

গড়িয়াহাট মোড়ের খুব কাছেই ২৬ নং গড়িয়াহাট রোডে বিখ্যাত বহুতল বণিকবাড়ি। সেই বাড়ির মালিক চন্দ্রনাথ বণিক চা-বাগানের ব্যবসার কারণে প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক ছিলেন এবং তার এগারোতলা বাড়ির প্রথম চারতলা বিক্রি করে দিয়েছিলেন আবার কোনওটা ভাড়া দিয়েছিলেন কোনও সংস্থাকে। পাঁচ থেকে সাততলা পর্যন্ত ছিল তাঁর অধিকারে। চন্দ্রনাথ বণিকের পাঁচ কন্যা কল্যাণী, জয়ন্তী, সুমিত্রা, চিত্রা, বিত্রা এবং চার পুত্র চন্দন, আশীষ, অসীম ও নন্দন। এদের মধ্যে চন্দ্রনাথের বড় ছেলে চন্দন বণিকের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল বর্ধমানের ধনী দত্ত পরিবারের ধনপতি দত্তের একমাত্র কন্যা দেবযানীর। চালকল, পেট্রল পাম্প ইত্যাদি নানাবিধ উৎস থেকে দত্তদেরও অনেক অনেক উপার্জন ছিল। এই ধনপতি দত্তের তিন ছেলে দেবদাস, বিপ্রদাস ও রামদাস। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে চন্দন বণিকের সঙ্গে দেবযানী দত্তের বিবাহে যৌতুক নিয়ে কোনও কার্পণ্য করেননি দেবযানীর বাবা ধনপতি। কিন্তু বিবাহের প্রথম তিন বছর সুখে-শান্তিতে শ্বশুরবাড়িতে দেবযানীর দিন কাটলেও, ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে চন্দ্রনাথ বণিকের সেজো মেয়ে চিত্রার সঙ্গে ধনপতি দত্তের বড় ছেলে দেবদাসের বিবাহের প্রস্তাবকে ঘিরেই দুই পরিবারের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয় আর তার জের এসে লাগে দেবযানীর উপর। চন্দ্রনাথ বণিক নিজে এই প্রস্তাব দেওয়ার পরে ধনপতি দত্ত রাজি হতে পারেন না, কারণ কয়েকদিন আগেই দেবদাসের সঙ্গে আসানসোলের হরিসাধন ঘাঁটির কন্যা কুমকুমের বিবাহ স্থির হয়ে গিয়েছিল। এর কিছুদিন পরে দেবদাসের বিবাহের নিমন্ত্রণ করতে যাওয়ার সময় ধনপতি দত্তকে চন্দ্রনাথ বণিক স্পষ্ট জানান দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ ডাক্তার মৃণালকান্তি বিষ্ণুকে নিমন্ত্রণ না করলেই একমাত্র তিনি বিবাহে উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু বিবাহের দিন তাঁকেই দেখতে পেয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে চন্দ্রনাথ বণিক বিবাহ অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে আসেন বাড়িতে। এর কিছুদিন পরে আবার দুজনের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয় অর্জনহাটের মিদ্দা-পুকুর নামে একটি পুকুর কেনা নিয়ে। ধনপতি দত্ত সেই পুকুরটি কিনে নিয়েছেন জানতে পেরে চন্দ্রনাথ বণিক দাবি করেন যে সেই পুকুরের মালিককে অনেক আগেই বায়না দিয়ে সেটি তিনি কিনে রেখেছিলেন। কিন্তু ধনপতি দত্ত সেই বায়নার দলিল দেখাতে বললে চন্দ্রনাথ কোনওভাবেই তা দেখাতে পারেন না। ইতিমধ্যেই শ্বশুরবাড়ির সকলের আচরণ খারাপ হচ্ছিল, এটা দেবযানী নিজেও বুঝতে পারছিলেন। বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তার। এরই মাঝে বর্ধমানে চন্দন বণিক একটি কোল্ডস্টোরেজ কেনার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে কয়েক কোটি টাকা ঋণ নেয়, কিন্তু সময়মত সেই টাকা শোধ না করায় বাড়িতে ডিমান্ড নোটিশ পাঠায় ব্যাঙ্ক। এমতাবস্থায় চন্দ্রনাথ বণিক ধনপতি দত্তকে ফোন করে সেই ঋণের ২৫ শতাংশ বহন করতে বলেন, কিন্তু এই প্রস্তাবে অসম্মত হন তিনি। দশ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে সমর্থ হলেও ধনপতি দত্ত এর বেশি টাকা দিতে অস্বীকার করেন। বাড়ির পুরনো রাঁধুনি চৈতন্যের হাত দিয়ে গোপনে চিঠিতে নিজের যন্ত্রণার কথা লিখে বাবার কাছে পাঠাতেন দেবযানী। চন্দ্রনাথের বাড়িতে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেও বহুক্ষণ বসিয়ে রাখার পর মিনিট দশেক কথা বলতে দেওয়া হত ধনপতিকে, তাও আবার প্রহরায় থাকতেন দেবযানীর ননদেরা। সেই বছর পুজোতেই ধনপতির গাড়ির চালককে দিয়ে চন্দ্রনাথ বণিক বলে পাঠান যে তিনি উপযুক্ত প্রতিশোধ নেবেন। এভাবেই ১৯৮৩ সালের ২৮ জানুয়ারি সত্যনারায়ণ পুজোর দিন সকালে দেবযানীকে প্রচণ্ড মারধোর করেন চন্দন এবং তার কিছুক্ষণ পরে ফোন করে দেবযানী নিজের বাড়িতে জানান এই অত্যাচারের কথা। অলক্ষ্মী অপবাদ দিয়ে তাঁকে এমনিতেই বণিকবাড়িতে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। ঐ দিনই বিকেল ৪টে ৫ নাগাদ দেবযানীর ঘরে ঢুকে চন্দ্রনাথ ও তার ছেলে চন্দন দুজনে মিলে প্রচণ্ড মারধোর করে দেবযানীকে মেরে ফেলেন এবং পরিকল্পনামাফিক মৃতদেহকে গলায় শাড়ির ফাঁস দিয়ে ফ্যানের সিলিঙ থেকে ঝুলিয়ে দেন যাতে মনে হয় এটা আত্মহত্যার ঘটনা। এই কাজে সাহায্য করেছিলেন চন্দ্রনাথ বণিকের পুত্র-কন্যা অসীম, জয়ন্তী, সুমিত্রা ও বিত্রাও। কিল, চড়, লাথি, ঘুষি মারার সঙ্গে সঙ্গে চন্দন লাঠি দিয়ে দেবযানীর মাথায় সজোরে আঘাত করার ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ততক্ষণে বাড়ির কাজের লোক শান্তি, উর্মিলা আর যদুকে হুমকি দিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। পরে এই আত্মহত্যার সাজানো ঘটনা ধোপে টিকবে না ভেবে দেবযানীর মৃতদেহ ঘরের মধ্যেই ফোল্ডিং খাটের ভিতর লেপ-কম্বল-তোশক চাপা দিয়ে লুকিয়ে ফেলা হল। পরদিন সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট আদায় করারও চেষ্টা করেছিলেন চন্দ্রনাথ বণিক, কিন্তু সজ্জন ডাক্তার তা দিতে নারাজ হওয়ায় বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। সেইদিনই কোনও এক অজানা নম্বর থেকে লালবাজার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন আসে এবং জানানো হয় দেবযানীর উপর অত্যাচারের কথা। পুলিশ তৎক্ষণাৎ রওনা দেয় বণিকবাড়ির উদ্দেশ্যে। রাত্রি দশটা নাগাদ বণিকবাড়ির দরজায় টোকা দেওয়া মাত্রই ভিতরে আলো বন্ধ হয়ে যায়, বাইরে থেকে যে পুরুষ ও নারীর বাক্যালাপ শোনা যাচ্ছিল তাও বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ অনেকবার দরজা খুলতে বললেও কেউ দরজা না খোলায় দরজা ভেঙে পুলিশ ভিতরে ঢোকে। কিছুক্ষণ খোঁজার পরেই মৃতদেহ পচার অসহ্য গন্ধ পেয়েই দেবযানীর ঘর থেকে লেপ-তোশকে চাপা দেওয়া পচতে থাকা তার লাশ খুঁজে পায় পুলিশ। বাড়ির ছোট্ট সদস্য চন্দ্রনাথ বণিকের ছোট ছেলে নন্দন তাঁকে নিজের বৌদি বলে শনাক্ত করে। বাড়িতে কেবল মহিলারা ছিলেন তখন, চন্দ্রনাথ, চন্দন ও অসীম বণিক ততক্ষণে পালিয়ে গিয়েছেন। কলকাতার বিভিন্ন হোটেলে নাম ভাঁড়িয়ে থাকছিলেন তারা তিনজনে। তাদের ধরার জন্য সারা কলকাতায় ছবি দিয়ে তন্নতন্ন করে খোঁজ শুরু করে পুলিশ। ৪ ফেব্রুয়ারি রাসবিহারী মোড়ের কাছে একটা ট্যাক্সিতে তিনজনকে ধরে ফেলে পুলিশ। শুরু হয় মামলা।

আলিপুর আদালতে মামলা চলাকালীন বণিক পরিবারের তরফ থেকে দাবি করা হয় যে ঘটনার দিন বাড়িতেই ছিলেন না চন্দ্রনাথ, চন্দন ও অসীম বণিক। কিন্তু এই মিথ্যা দাবি ধোপে টেকেনি। বাড়ির কাজের লোক যদু ও শান্তি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। তাছাড়া যে লাঠি দিয়ে দেবযানীর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল তাতে চন্দনের হাতের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি যে সব হোটেলে নাম ভাঁড়িয়ে ছিলেন তারা, সেখানকার রেজিস্টারে নাম লেখার সঙ্গে চন্দন, চন্দ্রনাথের নিজস্ব হাতের লেখার মিল পাওয়া গিয়েছিল। বাড়িতে গোপনে পাঠানো চিঠিগুলি থেকেও তার উপর নির্যাতনের সপক্ষে প্রমাণ মিলেছিল। মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডাক্তার রবীন বসু দেবযানীর মৃতদেহের ময়না তদন্ত করে জানান যে তার দেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল অনেক, মাথায় আঘাতের ফলে তার খুলিতে চিড়ও ধরেছিল। ফলে আগে তাঁকে হত্যা করে তারপর গলায় ফাঁস দিয়ে ঝোলানো হয়েছিল। ১৯৮৫ সালের এপ্রিল মাসে আলিপুর আদালতের রায়ে চন্দ্রনাথ ও চন্দন বণিকের মৃত্যুদণ্ড এবং চন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যা জয়ন্তী, সুমিত্রা ও অসীমের যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়। পরে এই রায়ের বিরোধিতা করে কলকাতা উচ্চ আদালতে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন চন্দ্রনাথ ও চন্দন বণিক। সেখানে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর চন্দ্রনাথ ও চন্দন বণিকের ফাঁসির আদেশ এবং সুমিত্রার যাবজ্জীবন কারাবাসের আদেশ বহাল রেখে কেবলমাত্র অসীম ও জয়ন্তীর দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। জল গড়াল সুপ্রিম কোর্টের দোরগোড়ায়। দেবযানী বণিক হত্যা মামলা সুপ্রিম কোর্টে উঠলে সেখানে চন্দ্রনাথ ও চন্দন বণিকের ফাঁসির আদেশ রদ করে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়। বিত্রা নাবালক হওয়ায় তার বিচার চলেছিল জুভেনাইল আদালতে। ১৪ বছর কারাবাসের পর মুক্তি পেয়েছিলেন চন্দ্রনাথ বণিক, চন্দন বণিক এবং সুমিত্রা বণিক।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

তথ্যসূত্র


  1. চিন্ময় চৌধুরী, 'দেবযানী বণিক হত্যা মামলা', দে'জ পাবলিশিং, ২য় সং, ২০০৬, পৃষ্ঠা ৯-১৩
  2. সুপ্রতিম সরকার, 'গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার', আনন্দ, ২০১৯, পৃষ্ঠা ৩৬-৫১
  3. https://indiankanoon.org/
  4. https://www.casemine.com/
  5. https://www.lawyerservices.in/
  6. https://www.jiyobangla.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন