কালীপূজা

কালীপূজা

দুর্গাপূজার পর পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের কাছে অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হল কালীপূজা বা শ্যামাপূজা। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত এই কালীপূজাকে বলা হয় দীপান্বিতা কালীপূজা। এই পূজা আলো ও আতসবাজির উৎসব। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই বাংলায় শাক্ত সাধনার প্রসার ঘটেছিল। শক্তির উপাসনার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে বহন করে বাংলার বুকে আজও দেবী কালীর আরাধনা করা হয়। করালবদনী, মহানিশার প্রতীক দেবী কালী সংহারক বেশে প্রলয়বাদন জাগিয়ে তোলেন আর প্রলয়ের শেষে অসীম শান্তিতে ভরে ওঠে ভক্তের মন। রক্ষাকালী, শ্যামা, তারা বিভিন্ন নামে পূজিতা হন দেবী কালী। শিবের বুকের উপর পা দিয়ে এক হাতে খড়্গ আর অন্য হাতে কাটা মুণ্ড নিয়ে দেবীর ভয়াল সুন্দর রূপের সঙ্গে তন্ত্রসাধনার অনুষঙ্গ জড়িয়ে থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণ, রামপ্রসাদ, বামাক্ষ্যাপা কিংবা কমলাকান্ত ভট্টাচার্য সকলের পরম আরাধ্যা দেবী কালীকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে রচিত হয়েছে বহু গান। কালীপূজাকে কেন্দ্র করে এই গানগুলিও সুপরিচিত হয়ে উঠেছে ।

পুরাণ মতে, দেবী মহামায়ার দশমহাবিদ্যা রূপের প্রথম রূপ হল কালী। পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়, শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুরকে পরাজিত করে দেবকুলকে রক্ষা করার জন্য আবির্ভূতা হন দেবী কালী। আদ্যাশক্তি ভগবতীর কোষ থেকেই সৃষ্টি হন কালী। কোষ থেকে জন্ম বলে প্রথমে তাঁকে বলা হয় ‘দেবী কৌশিকী’। আর কৌশিকী রূপ ধারণের পর ভগবতীর গায়ের রঙ ঘন কালো হয়ে ওঠে আর এই রঙের কারণেই তাঁকে ‘কালী’ বলে সম্বোধন করা হয়। শক্তির উপাসনার আরাধ্যা আদ্যাশক্তি মহামায়ার অন্যতম রূপ দেবী কালী শাক্ত ধর্মে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করেন। তাঁর মূর্তিতে দেখা যায় চারটি হাত যার মধ্যে এক হাতে খড়্গ, এক হাতে কাটা নরমুণ্ড, আর দুই হাতে দেখা যায় বরাভয় মুদ্রা ও আশীর্বাদ মুদ্রা। তাঁর গলায় নরমুণ্ডের মালা আর তাঁর হাতে ধরা নরমুণ্ডের রক্ত পান করে তাঁর বাহন শিয়াল। এলোকেশী দেবী কালী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণভাবে পরিচিত এই রূপটি ছাড়াও বিভিন্ন পুরাণে কালীর অন্যান্য বিভিন্ন রূপের বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। তবে মোটামুটিভাবে কালীর যেকয়টি রূপের কথা জানা যায় তা হল রক্ষাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, দক্ষিণা কালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। বাংলার বিভিন্ন মন্দিরে কোথাও ব্রহ্মময়ী, করুণাময়ী, কোথাও ভবতারিণী নামে তিনি পূজিতা হন। মহাকাল সংহিতায় আবার কালীর নয়টি রূপের কথা বলা হয়েছে যার মধ্যে কালকালী, কামকলাকালী, চণ্ডিকাকালী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দিগম্বরী দক্ষিণাকালীর মূর্তিটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বাংলায়। বলা হয়, কালীর ভয়ে দক্ষিণ দিকের অধিপতি যম ভীত হয়ে পলায়ন করেছিলেন বলে কালীর এই রূপের নাম দক্ষিণাকালী। এভাবে কখনো ভদ্রকালীরূপে শান্ত-সমাহিত কালীর রূপ, চামুণ্ডারূপে উগ্র ভয়ালদর্শনা দেবীর মূর্তি কিংবা সিদ্ধকালী রূপে সালঙ্কারা অপূর্ব সুন্দর রূপের দেবী কালী পূজিতা হন এই বাংলায়। দেবী মহামায়ার দশমহাবিদ্যা রূপের মতো দেবী কালীরও নয়-দশটি পৃথক রূপের কথা বলা আছে বিভিন্ন শাস্ত্রে।

নবদ্বীপের বিখ্যাত তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকেই বাংলায় প্রথম কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কালীপূজাকে যিনি বাংলায় বিখ্যাত করে তোলেন, তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। গবেষক শশিভূষণ দাশগুপ্ত যদিও সপ্তদশ শতকের বাংলায় কিছু কিছু অংশে কালীপূজার নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন। তবু ইতিহাসের দিক থেকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের হাত ধরেই বাংলায় কালীপূজার প্রচার ও প্রসার ঘটেছে বলে মেনে নেওয়া যেতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে দেখা যায়, ডাকাতেরা রানি ভবানীর আদেশে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কালী মায়ের পূজা করছেন। ফলে বোঝাই যায় প্রাচীন বাংলায় কৌম নির্দিষ্ট সমাজে শাক্ত সাধনার অঙ্গ হিসেবে কালীই হয়ে উঠেছিলেন একমাত্র শক্তির আধার।

বই  প্রকাশ করতে বা কিনতে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে সাধারণভাবে কালীপূজা হয়ে থাকে যা দ্বীপান্বিতা কালীপূজা নামেই পরিচিত। বাংলায় যেদিন দীপান্বিতা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেই দিনটি ভারতের অন্যান্য জায়গায় দীপাবলী হিসেবে পালিত হয়। দীপান্বিতা কালীপূজা ছাড়াও বাংলায় আরও দুই ধরনের কালীপূজার প্রচলন আছে। তার মধ্যে মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে রটন্তী কালী এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে ফলহারিণী কালীপূজা। তাছাড়া তারাপীঠের আরাধ্যা দেবী তারার পূজাকে বলা হয় কৌশিকী কালীপূজা। নিয়মিত পূজা হিসেবে প্রত্যেক অমাবস্যা তিথিতে বা প্রতি শনি কিংবা মঙ্গলবারেও কালীপূজা করা হয়ে থাকে। এছাড়া শীতকালে পৌষ মাসে কোথাও কোথাও বিশেষ মনস্কামনা পূরণের লক্ষ্যে পৌষকালী রূপে দেবীর আরাধনা করা হয়। দুর্গাপূজার মতো কালীপূজাতেও গৃহস্থ বাড়িতে বা মণ্ডপে মাটির মূর্তি তৈরি করে তাতে পূজা করা হয়। ব্রাহ্মণ্য ও তান্ত্রিক দুই পদ্ধতিতেই কালীর আরাধনা করা হয়ে থাকে। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে মধ্যরাত্রে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজা হয় এবং দেবীর সামনে পাঁঠা বা ভেড়া বলি দেওয়া হয়। বলি দেওয়া পশুর কাটা মুণ্ডু, রক্ত, মিষ্টি, অন্ন বা লুচি, মাছ ও মাংস উৎসর্গ করা হয় দেবীকে। তবে গৃহস্থবাড়িতে সাধারণত ব্রাহ্মণ্যমতেই আদ্যাশক্তি দেবী কালী পূজিতা হন। বিশেষ বিশেষ উপজাতিদের মধ্যে মদ ও মাংস সহযোগে তন্ত্রমতে কালীপূজা করার কথা জানা যায়। সবক্ষেত্রেই রক্তজবা ফুল ছাড়া দেবী কালীর পূজা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। রামপ্রসাদের সেই বিখ্যাত গান ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মা’ আমরা অনেকেই শুনেছি। দেবী কালীকে শ্মশানচারী মনে করা হয়। তাই বাংলার বিভিন্ন শ্মশানে দ্বীপান্বিতা কালীপূজার দিন শ্মশানকালীর পূজা করা হয়। একদিকে শক্তির আরাধনার মধ্য দিয়ে অন্তরের কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ ঘটিয়ে অসুর বিনাশ এবং অন্যদিকে আলোর উৎসবে আতসবাজির রোশনাইতে মনের অন্ধকার দূর করার বাসনা নিয়ে ভক্তরা কালীপূজায় সমবেত হন। কালীপুজোর পাশাপাশি দেবী কালীকে নিয়ে লেখা হাজারো শ্যামাসঙ্গীত এই বিশেষ দিনটিকে এক অন্য মাত্রা এনে দেয়। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, নজরুল ইসলামের লেখা বহু শ্যামাসঙ্গীতের মূর্চ্ছনায় ভক্তদের মনে জেগে ওঠে অপার ভাবের সাগর।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় যেমন দুর্গাপূজার আড়ম্বর সবথেকে বেশি, ঠিক সেভাবেই বারাসাতের কালীপূজাও খুবই ঐতিহ্যপূর্ণ এবং জাঁকজমকের সঙ্গে এখানে কালীপূজা করা হয়। কলকাতার কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, ভুবনেশ্বরের কালীক্ষেত্র মন্দির, গৌহাটির কামাখ্যা মন্দির দেবী কালীর অন্যতম বিখ্যাত পীঠস্থান। কালীপূজার দিন এই মন্দিরগুলিতে অসংখ্য ভক্ত সমবেত হন।

12 comments

আপনার মতামত জানান