ধর্ম

দীপাবলি

দীপাবলি হল পাঁচদিন ধরে চলা হিন্দু উৎসব যা কিনা উত্তর ভারতে শরৎ আর দক্ষিণ ভারতে বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়।

আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস দিয়ে এই উৎসবের শুরু। ধনতেরাসের দিন ভারতীয় অর্থ ব্যবসায়ীদের অর্থ বর্ষের শুরু। এইদিন নতুন বাসন, সোনার গয়না ইত্যাদি কেনার রীতি দেখা যায়।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন হল নরক চতুর্দশী বা ভূত চতুর্দশী। বাঙালিরা এইদিন চোদ্দরকম শাকের (ওল, কেও, বেতো কালকাসুন্দা, নিম, সরিষা  শালিঞ্চা বা শাঞ্চে, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পটুক পত্র বা পলতা, ভন্টাকি(ঘেঁটু) বা ভাঁট , হিলমোচিকা বা হিঞ্চে , সুনিষন্নক বা শুষুনী বা শুষনি, শেলু বা শুলকা) মিলিত একটি পদ খেয়ে থাকে, যা চোদ্দ শাক নামে পরিচিত। তবে আয়ুর্বেদ মতে প্রাচীন বাংলায় চোদ্দো শাকগুলি ছিল (পালং শাক, লাল শাক, সুষণি শাক, পাট শাক, ধনে শাক, পুঁই শাক, কুমড়ো শাক, গিমে শাক, মূলো শাক, কলমি শাক, সরষে শাক, নোটে শাক, মেথি শাক, লাউ শাক অথবা হিঞ্চে শাক) । পুরাণ মত অনুসারে ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ শাক খাওয়ার রীতি প্রচলন করেন ঋক্ বেদের বাস্কল বা শাক দ্বীপি ব্রাহ্মণ’রা। ভেষজবিজ্ঞানী ছন্দা মণ্ডলের মতে, দীপাবলির এই মাসটায় ঋতু পরিবর্তনের ফলে নানান রোগের প্রকোপ বাড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।সেই জন্য আশ্বিন ও কার্ত্তিক মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। চোদ্দরকম শাকের  রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা ছিল দারুণ। হয়ত বাঙালিকে এই শাকের গুনাগুন অন্যকোন ভাবে বোঝাতে না পেরে ধর্মের পালনীয় কর্তব্যের মোড়কের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা থেকেই এই রীতির শুরু। তখনকার দিনে বাংলার নব্য-স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন (১৬ শতাব্দী) তাঁর অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” এই সময়কাল উল্লেখ করেছেন “নিৰ্ণয়া-মৃতের” (একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ) অভিমত অনুসরণ করে-

“ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।”

এছাড়াও বাড়ির চোদ্দ কোণায় চোদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে পরিবার থেকে ভূত প্রেতকে দূরে সরিয়ে রাখার রীতিও দেখা যায়।চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানোর পেছনে কারণ স্বরূপ মনে করা হয় যে এই দিন প্রদীপ জ্বালিয়ে পিতৃ পুরুষ দের বাড়িতে আসবার আমন্ত্রণ জানানো হয় যাতে তারা মা কালীর আগমনের দিন উপস্থিত হয়ে বাড়ির সকল সদস্যকে আশীর্বাদ করতে পারেন এবং নিজেরাও মোক্ষ লাভ করতে পারেন।

তৃতীয় দিন দীপাবলি। দীপাবলির অর্থ-প্রদীপের সমষ্টি।দীপাবলি সারি সারি প্রদীপের আলোয় স্বর্গের দেবতাকে মর্ত্যের কুটিরে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। এই দিন যখন  উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পূজা চলে, পশ্চিমবঙ্গে তখন আড়ম্বরে পালন করা হয় কালীপূজা। কালীপূজো বা শ্যামাপূজো হল হিন্দুদের বা বাঙালি হিন্দুদের একটি অন্যতম জনপ্রিয় পূজো যা কিনা কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই পুজো কে দীপান্বিতা কালীপূজো বলে। সারা ভারতে এই দিন লক্ষ্মীপূজো হলেও বাংলা, আসাম ও ওড়িশাতে এইদিন কালীর আরাধনাই হয়। সাধারণত কালীপূজো আর দীপাবলি একসাথেই পড়ে প্রতিবছর। দীপান্বিতা কালীপূজো ছাড়াও আরও দুই ধরণের কালীপূজোর চল আছে। মাঘ মাসে ‘রটন্তী’ আর জ্যৈষ্ঠ মাসে ‘ ফলহারিণী’ কালীপূজো। কালীপূজোর ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব ১৭৬৮ সালে কাশীনাথ রচিত ‘কালী সপর্যাসবিধি’ গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজোর বিধান পাওয়া গেলেও বাংলায় কালীপূজোর প্রচলনের প্রমাণ কিন্তু তখনো তেমন পাওয়া যায়নি। নবদ্বীপের বিখ্যাত তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কে বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজোর প্রবর্তক বলেমনে করা হয়।কৃষ্ণানন্দই সর্ব প্রথম কালীপূজোকে সারা বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। ওনার আগে গৃহস্হ ঘরে কালীপূজো নিষিদ্ধ ছিল। কালী পূজো তখন শ্মশানে কিংবা নদীতীরে বা গভীর  জঙ্গলে হত। অঘোরীদের আরাধ্য ভয়ংকরী দেবীকে কল্যাণময়ী মাতৃরূপ দান এই  কৃষ্ণানন্দ প্রথম করেন।  তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কালীপূজোকে যিনি বাংলায় বিখ্যাত করে দিলেন তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুসারে দেবীর ‘ দশমহবিদ্যা’, অর্থাৎ দশটি বিশেষ রূপের একেবারে প্রথম রূপটি হল ‘কালী’। কালী হল ‘কালিকুল’ সম্প্রদায় বা শাক্ত ধর্মের প্রধান আরাধ্যা দেবী।কালীঘাট ও কামাখ্যা মন্দিরে দীপান্বিতা কালীপূজোর দিন কালী কে লক্ষ্মী হিসেবে আরাধনা করা হয়।জৈন মতে ৫২৭খ্রীঃ পূঃ এই দিনেই মহাবীর পাওয়াপুরিতে মোক্ষ লাভ করেছিলেন।আবার শিখদের ষষ্ঠগুরু হরগোবিন্দ ও বাহান্ন জন রাজপুত্র এই জাহাঙ্গীরের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিলেন। এইদিনটি শিখদের কাছে ‘ বন্দী ছোড় দিবস’ নামে পরিচিত।

চতুর্থ দিন ‘বর্ষ প্রতিপদ বা প্রতিপদ পারবা বা গুড়ি পারবা। এইদিনটি মহারাষ্ট্রে নববর্ষ, অন্ধ্রপ্রদেশে ‘উগাদি’ ও সিঁধরি বাসীদের কাছে চেট্টিনাদ নামে পরিচিত।এইদিন নববিবাহিত বধূ স্বামীর কপালে মৃত্যুঞ্জয়ী লাল তিলক পরিয়ে আরতির মাধ্যমে তার দীর্ঘায়ু কামনা করে থাকে। বৈষ্ণবরা আবার এইদিন গোবর্ধন পূজা বা অন্নকূট করে থাকে শ্রী কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে ১০৮টি পদ রান্না করা হয়।

পঞ্চমদিনে ভাইফোঁটা হয়ে এই উৎসবের শেষ।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!