ইতিহাস

আবু রায়হান আল বিরুনি

আবু রায়হান আল বিরুনি (Abu Rayhan al-Biruni ) ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত ইরানি শিক্ষাবিদ ও গবেষক।  তাঁকে “ভারত সংক্রান্ত বিদ্যার প্রবর্তক”(founder of Indology), “তুলনামূলক ধর্ম সংক্রান্ত বিদ্যার প্রবর্তক” (Father of Comparative Religion) ” আধুনিক ভূগণিত-এর প্রবর্তক”(Father of modern geodesy), এবং ”প্রথম নৃতত্ত্ববিদ”(first anthropologist) হিসেবে অভিহিত করা হয়। অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তধারার অধিকারী আল বিরুনির প্রকৃত নাম আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি।

৯৭৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর (মতান্তরে ৩ সেপ্টেম্বর),  একটি অতি সাধারণ ইরানি পারিবারে  আল বিরুনির জন্ম হয়।  আল-ইরাক বংশীয় রাজপতি বিশেষ করে আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরকের তত্ত্বাবধানে তাঁর বাল্যকাল অতিবাহিত হয়েছিল। তিনি  আবু নাসের ইবন আলি ইবন ইরাক জিলানি  এবং আরো কয়েকজন  বিদ্বান ব্যক্তির কাছে গণিতশাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তাঁর কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবন সিনার সাথে পত্র বিনিময় করেন।

আল বিরুনির মাতৃভাষা ছিল  ইরানি হলেও তিনি আরবি ভাষায় মূলত তাঁর রচনা করেছেন । আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ। গ্রিক,  হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তাঁর জ্ঞান ছিল।তিনি ছিলেন গণিত, জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। তিনি ছিলেন ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানী, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক। 

আল বিরুনি ১০০৮ সালে নিজের দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলি ইবন মামুনের দ্বারা সসম্মানে গৃহীত হন। তিনি আলি ইবন মামুনের প্রয়াণের পর তাঁর ভ্রাতার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং রাজকীয় দৌত্যকার্যের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। মামুন  ১০১৬ সালে নিহত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নিলে আল বিরুনি গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবন আলি ও চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসায়ন ইবন বাবা আল-খাম্মার আল-বাগ দাদির সঙ্গে গজনি চলে যান। এখানেই তাঁর জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। 

আল বিরুনি গজনির শাহি দরবারে  রাজজ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি কয়েক বার সুলতান মাহমুদের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন। গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। ভারতে থাকাকালীন তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাতেও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি ভারত থেকে ফিরেই রচনা করেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল তারিকিল-হিন্দ। সে সময়ের ভারতীয় জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় নিয়ম কানুন জানার জন্যে এটি একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
আল বিরুনি ভারত থেকে গজনীতে ফেরার কিছুদিন পরেই সুলতান মাহমুদ পরলোক গমন করেন। তাঁর পুত্র মাসউদ ১০৩১ সালে সিংহাসনে বসেন। সুলতান মাসউদও আল বারুনীকে খুবই সম্মান করতেন। এ সময় আল বারুনী ‘কানুনে মাসউদী’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এটি তাঁর রচিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।  সুবিশাল এই গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, ত্রিকোনমিতি, আকৃতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্রসূর্যের মাপ, সূর্যের গতি, চন্দ্রের গতি,  চন্দ্রের গ্রহণ,  স্থির নক্ষত্র। গ্রন্থটি সুলতান মাসউদের নামে নামকরণ করায় তিনি খুশী হয়ে বহু মূল্যবান রৌপ্যমুদ্রা উপহার দেন। আল বিরুনি সেসব রৌপ্য মুদ্রা রাজকোষে জমা দিয়ে দেন।  তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সম্পদ বা অর্থকড়ি কখনও নিজের কাজে জমা রাখতেন না। তিনি ছিলেন নির্লোভ ও ভালমানুষ।

আল বিরুনি বিভিন্ন বিষয়ে মানব জাতির জন্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়, বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস, মৃত্তিকাতত্ত্ব, সাগর তত্ত্ব এবং আকাশ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

আল বিরুনি পৃথিবী বৃত্তিক গতিতে ঘূর্ণনের কথা বলেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনিই প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও আর্টেজিয় কূপের রহস্য উদঘাটন করেন। তিনি একজন খ্যাতনামা জ্যোতিষী ছিলেন। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেন। তিনি অ্যারিষ্টটলের ‘হেভেন’ গ্রন্থের ১০টি ভুল বের করেছিলেন। তিনিই প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের পার্থক্য নির্ণয় করেন।

আল বিরুনি সূক্ষ্ম ও শুদ্ধ গণনার একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন যার বর্তমান নাম ‘দি ফরমুলা অব হিন্টার পোলেশন’। বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয় ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না। তিনিই প্রথম এ সূত্র আবিষ্কার করেন।
আল বিরুনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বহুরোগের ঔষধ তৈরীর কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। । তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইতিহাস প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ হল ‘কিতাবুল তাফহিম’। এটি ৫৩০ অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে অংক, জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি ‘আল আরসুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া’ গ্রন্থে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

আল বিরুনির সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১০৩টি  সম্পূর্ণ গ্রন্থ এবং ১০টি অসম্পূর্ণ গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা ১৮০টি।

আল-বিরুনি ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তারপরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ১০৪৮ সালের তাঁর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।