ইতিহাস

হেমেন্দ্রমোহন বসু

হেমেন্দ্রমোহন বসু (Hemendra Mohan Bose) একজন বাঙালি উদ্যোগপতি যিনি তাঁর শৌখিন রুচিবোধকে কাজে লাগিয়ে অসাধারণ ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিলেন। ব্যবসার ক্ষেত্রে আজও বাঙালি ব্যবসায়ীরা তাঁকে পথিকৃৎ গণ্য করে থাকেন। গ্রামোফোন তৈরি ও বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি আমাদের কাছে সুপরিচিত। কুন্তলীন তেল এবং ‘দেলখোস’ সুগন্ধী দ্রব্য প্রস্তুতের জন্য তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।

১৮৬৬ সালে (মতান্তরে ১৮৬৪ সালে) বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে হেমেন্দ্রমোহন বসুর জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম হারানমোহন বসু, তিনি পেশায় ছিলেন সরকারি আদালতের মুন্সেফ। হেমেন্দ্রমোহনের কাকা ছিলেন বিখ্যাত ব্রাহ্মসমাজ-নেতা আনন্দমোহন বসু। হেমেন্দ্রমোহন বসুর স্ত্রী মৃণালিনীদেবী ছিলেন প্রবাদপ্রতিম শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোট বোন। হেমেন্দ্রমোহনের দশ পুত্রকন্যাদের মধ্যে চিত্রপরিচালক নীতিন বসু, ক্রিকেটার কার্তিক বসু এবং সঙ্গীত শিল্পী মালতী ঘোষাল খ্যাতিলাভ করেছিলেন৷

প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর হেমেন্দ্রমোহন আই.এ পাস করেন এবং কলকাতার মেডিকেল কলেজে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হন৷ সেই সময়েই তাঁর চোখে অ্যাসিড ছিটকে পড়ায় তিনি কিছুদিন অসুস্থ থাকেন। এরপর তেমনভাবে তাঁর প্রথাগত শিক্ষা আর এগোয়নি৷ ফলে তিনি ডাক্তারি নয়, পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাণিজ্যকে৷

হেমেন্দ্রমোহন বসুর কর্মজীবন শুরু হয় একজন বাঙালি ব্যবসায়ী হিসেবেই। প্রথমদিকে হেমেন্দ্রমোহন বসু সুগন্ধী দ্রব্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।  সুগন্ধীদ্রব্য থেকে শুরু করে সাইকেল, মোটর গাড়ি, রেকর্ড, টর্চ লাইট এবং ছাপাখানার ব্যবসা করেছিলেন। তিনি শিল্পে বাঙালির কর্মক্ষেত্র তৈরি করেন এবং বহু বিষয়ে নিজস্ব ধারার প্রবর্তন করেন। ১৮৯০ থেকে ১৮৯১ সালে ‘কুন্তলীন’ নামক চুলের তেল নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তাঁর তৈরি ‘কুন্তলীন তেল’ পূর্বভারতে দীর্ঘকাল রাজত্ব করেছিল এবং তিনি কলকাতার ৬, শিবনারায়ণ দাস লেনে দ্বিতীয় একটি কারখানাও খোলেন। ১৮৯৪ সালে ‘দেলখোস’ নাম দিয়ে সুগন্ধী দ্রব্য তৈরির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তাঁর কর্মের প্রতি নিষ্ঠা, বৈচিত্র্যের প্রতি উৎসাহ ও দক্ষতা তাঁকে সিনেমাটোগ্রাফি, সাউন্ড রেকর্ডিং, সাইকেল ইন্ডাস্ট্রি, মোটরগাড়ি, প্রিন্টিংয়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক উদ্যোগে অনুপ্রাণিত করেছিল। সকালের দাঁতের মাজন থেকে শুরু করে সারাদিনের ব্যবহার্য নানা দ্রব্যের সুলুক সন্ধান পাওয়া যেত তাঁর কাছে৷ বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম কলকাতার হ্যারিসন রোডে সাইকেলের দোকান খোলেন। ইংল্যান্ডে তৈরি রোভার সাইকেল আর ডারকাপ সাইকেলের ‘এক মাত্র এজেন্সি নিয়েছিলেন হেমেন্দ্রমোহন। দোকানে বিক্রির পাশাপাশি সাইকেলে চড়তে শেখার পাঠও তিনি দিতেন। জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে নীলরতন সরকারকে তিনিই সাইকেল চড়া শিখিয়েছিলেন৷

তাঁর হাত ধরে স্থাপিত হয় ‘গ্রেট ইষ্টার্ন মোটর কোম্পানি’। পার্ক স্ট্রিটে ‘গ্রেট ইষ্টার্ন মোটর ওয়ার্কস’ নামে তাঁর একটি মেরামতির কারখানাও ছিল। হেমেন্দ্রমোহন ব্যবসার জন্য স্টোনলে সিডলে ডেজি, অস্টিন আর ল্যান্ডলেট গাড়ির এজেন্সি নিয়েছিলেন। সেই সময়ে সাহেবদের পাশাপাশি বাঙালিরাও মোটরগাড়ি কেনার দিক থেকে পিছিয়ে ছিল না৷ তবে এই ব্যবসা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মন্দার বাজারে ১৯২০ সাল নাগাদ মোটরগাড়ির ব্যবসা বন্ধ করে দেন হেমেন্দ্রমোহন। এরপর ধর্মতলার মার্বেল হাউসে ‘দ্য টকিং মেশিন হল’ নামে হেমেন্দ্রকুমার এদেশে প্রথম রেকর্ড তৈরির কারখানা খোলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা পেল গ্রামোফোন৷ হেমেন্দ্রকুমার সম্পর্কে বারিদবরণ ঘোষ লিখছেন, ‘‘যন্ত্র আর রেকর্ডের ব্যবসামাত্র নয়, রেকর্ড তৈরি করা পর্যন্ত। কি বিস্ময়কর প্রতিভা আর অত্যাশ্চর্য উদ্যোগ! সিলিন্ডার রেকর্ডকে আবার প্যারিসের বিখ্যাত চার্লস প্যাথি কোম্পানি থেকে ডিস্ক রেকর্ডে পরিণত করিয়ে ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম ‘প্যাথেফোন’ যন্ত্রের প্রবর্তন করলেন।’’  এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, প্রমদারঞ্জন রায়, লালচাঁদ বড়়াল থেকে শুরু করে উস্তাদ রমজান খান, পিয়ারা সাহেব, মানদাসুন্দরী দেবী, নরীসুন্দরী, কাশীবাবু, পূর্ণ কুমারী, মহম্মদ হুসেন, দেবেন বন্দ্যোপাধ্যায়, এস সি সমাজপতি, জি জি গুপ্ত, নীরোদা বাঈ কে না এসেছিলেন ধর্মতলার মার্বেল হাউসে৷ হেমেন্দ্রমোহন বসুর প্যাথে-তে রবীন্দ্রনাথের রেকর্ডিংয়ের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল একুশেরও বেশি। ‘লুকোচুরি’, ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি’, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’, ‘অয়ি ভুবন মনমোহিনী’, ‘বন্দেমাতরম’  তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ঢেউ এসে এই ব্যবসাও ডুবে গেল। একসময় যেটুকু বাকী ছিল শহরে প্লেগ এসে তাও শেষ করে দিয়ে গেল। পাশাপাশি বাজারে ডিস্ক আসায় তাঁর ব্যবসা আর চলল না। কমবেশি তাঁর অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও সুগন্ধির ব্যবসা কখনও তাঁকে হতাশ করেনি৷ তিনি সুগন্ধির ব্যবসার ক্ষেত্রে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব খাঁটি বাঙালি ব্র্যান্ড। সুবাসিত, পদ্মগন্ধ, গোলাপ, যুঁই, চন্দন, বোকে, ভায়োলেট কুন্তলীন — এই সাত রকমের চুলের তেল ছাড়াও নানা সুগন্ধি পাওয়া যেত৷ ‘কুন্তলীন’ চুলের তেলের প্রশংসায় আকাশবাণী কলকাতা থেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উদাত্ত কণ্ঠে প্রকাশ্যে বলে উঠেছিলেন, ‘‘তেলে-জলে কখনও মেশে না, কিন্তু তবুও একথা মানতেই হয় যে অন্তত একটি তেল আমাদের সাহিত্যরূপ জলের সঙ্গে নিতান্ত নিগূঢ় ভাবেই মিশে আছে। সেটি কুন্তলীন।’’

“কেশে মাখ ‘কুন্তলীন’/রুমালেতে ‘দেলখোস’ /পানে খাও ‘তাম্বুলীন’/ ধন্য হোক্‌ এইচ বোস।’’ – এই ছড়া তখন লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। এগুলোর পাশাপাশি তিনি তৈরি করেছিলেন পানে খাবার তাম্বুলীন, ক্যাস্টর অয়েল — ক্যাস্টারীন, অপরাজিতা সেন্ট, স্পেশাল এসেন্স, কোকোলীন সাবান, সিরাপ, গোলাপ দন্তমঞ্জন, ফ্লোরিডা। দেলখোস সুগন্ধি বাজারে আসার পর তার সুঘ্রাণ এত দূর ছ়ড়িয়ে পড়েছিল যে হেমেন্দ্রমোহনের বৌবাজার স্ট্রিটের বাড়ির নামই হয়ে গিয়েছিল ‘দেলখোস হাউস’৷ ৬২, বৌবাজার স্ট্রিটে হেমেন্দ্রমোহন খুলেছিলেন বিশাল ছাপাখানা। ছাপার কাজ বৌবাজার স্ট্রিটের বাড়িতে হলেও ব্লক তৈরি হত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘ইউ রে অ্যান্ড সন্স’ থেকে। ছাপাখানা তৈরির পাশাপাশি তিনি আনলেন ‘কুন্তলীন পুরস্কার’। ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ নাম দিয়ে তিনি প্রতি বছর কয়েকটি গল্পে সমন্বিত বই প্রকাশ করতেন এবং এই সকল গল্প লেখককে নগদ টাকা বা তাঁর গন্ধদ্রব্য পুরস্কার হিসেবে দিতেন৷ সর্বোপরি পুরস্কারের ব্যবস্থা করে সাহিত্য-চর্চায় উৎসাহ দানের প্রথা বোধ হয় তিনিই সর্বপ্রথম এই বাংলায় চালু করেন৷ প্রথম পুরস্কৃত গল্পের নাম ছিল ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’, লেখকের নাম তখন প্রকাশিত না থাকলেও জানা যায় সেই গল্পের রচয়িতা ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু৷ কুন্তলীন পুরস্কার পুস্তিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘কর্মফল’ গল্পটি লিখে সাম্মানিক পেয়েছিলেন ৩০০ টাকা। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘মন্দির’ও পুরস্কৃত হয় কুন্তলীন পুরস্কারের সম্মানে। কুন্তলীন পুরস্কারের জন্য ১০০ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রথম স্থানাধিকারী পেতেন ১০০ টাকা। এ ভাবে ২৫, ২০, ১৫, ১০ এবং পঞ্চম থেকে দশম স্থানাধিকারীকে ৫ টাকা দেওয়া হত। এরপরে হেমেন্দ্রমোহনের ঝোঁক শুরু হয় ছবি তোলার দিকে। ছবির প্রতি ভালোবাসা হেমেন্দ্রমোহনের এতটাই বেশি ছিল যে তিনি বিদেশ থেকে কেবল একাধিক ক্যামেরা আনিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিজের বাড়িতেই তৈরি ডার্করুমেই প্রথম শুরু হয়েছিল। ছবিতে ‘থ্রি ডায়মেনশন’ বা ত্রিমাত্রিক ভাবনাও প্রথম তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সাল নাগাদ তাঁর তোলা স্ত্রী মৃণালিনীদেবীর একটি ছবি এখনও দেখতে পাওয়া যায় যে ছবিতে মৃণালিনী দেবীর শাড়ির আঁচলে লাগানো ছিল একটি ব্রোচ তাতে জ্বলজ্বল করছে ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটি। রঙিন ফিল্মের পাশাপাশি মুভি ক্যামেরাও বিদেশ থেকে তিনি আনিয়েছিলেন। গ্রুপ ফটোর পাশাপাশি পোর্ট্রেটেও ছিল হেমেন্দ্রমোহনের দক্ষতা। চৌকোনা পকেট টর্চ লাইটও এ দেশে এসেছে তাঁরই হাত ধরেই বাংলায় প্রচলন হয়।

হেমেন্দ্রমোহন বসু কেবলমাত্র ব্যবসার জন্য নানারকম জিনিস প্রস্তুত করেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। ঠিকমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে, নিজের প্রচার করে ব্যবসা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নিয়মিত পান ও বিদেশি ক্যাডবেরি খাওয়ার ফলে তাঁর দাঁতে ছোপ পড়েছিল। তিনি বিদেশি কায়দায় দাঁতে স্ক্রেপ করিয়েছিলেন, কিন্তু স্ক্রেপ করার ঠিক দু’দিনের মাথাতেই শুরু হল দাঁত থেকে অনর্গল রক্ত পড়া, একই সঙ্গে প্রবল জ্বর, বেহুঁশ অবস্থা, অসহনীয় যন্ত্রণা। অনেক চিকিৎসা করেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ১৯১৬ সালের ২৮ আগস্ট মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে হেমেন্দ্রমোহন বসুর মৃত্যু হয়৷

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন