সববাংলায়

প্রফুল্লচন্দ্র রায়

প্রফুল্লচন্দ্র রায় (Prafulla Chandra Ray) একজন বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি রসায়নবিদ যিনি ইতিহাসে ভারতের প্রথম ঔষধ নির্মাণ কোম্পানি বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা এবং মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিষ্কারক হিসেবে অমর হয়ে আছেন।তাঁকে ‘ভারতের রসায়নবিদ্যার জনক’ বলেও অভিহিত করা হয়। তিনি কেবল একজন অসামান্য বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ এবং কবিও ছিলেন।  শুধুই নীরস বিজ্ঞানশিক্ষা নয়, বরং সমগ্র বাঙালি জাতিকে অন্তর থেকে বিজ্ঞানমনস্ক তথা বিজ্ঞানচেতনা সম্পন্ন করে তোলাই ছিল প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আজীবনের সাধনা। বই থেকে পড়া বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিবর্তে ব্যবহারিক এবং ফলিত বিজ্ঞানের প্রসারে, মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ব্যবসা-বিমুখ বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’ প্রতিষ্ঠা বাঙালিকে স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

প্রফুল্ল
ভিডিওটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৮৬১ সালের ২ আগস্ট অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার (তৎকালীন যশোর জেলার) রাড়ুলি-কাটিপাড়া গ্রামে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হরিশচন্দ্র রায়চৌধুরী এবং মায়ের নাম ভুবনমোহিনী দেবী। তাঁদের পদবি রায়চৌধুরী হলেও পরবর্তীকালে চৌধুরী পদবিটি ত্যাগ করেন প্রফুল্লচন্দ্র। তাঁরা ছিলেন চার ভাই ও দুই বোন যার মধ্যে তৃতীয় সন্তান ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। তাঁর চার ভাইয়ের নাম যথাক্রমে জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র, নলিনীকান্ত, পূর্ণচন্দ্র এবং বুদ্ধদেব আর তাঁর দুই বোন হলেন যথাক্রমে ইন্দুমতী ও বেলামতী। প্রফুল্লচন্দ্রের ডাকনাম ছিল ফুলু। তাঁর প্রপিতামহ মানিকলাল রায় ছিলেন কৃষ্ণনগর ও যশোরের কালেক্টরের দেওয়ান এবং তাঁর পিতামহ অর্থাৎ ঠাকুরদাদা আনন্দলাল রায় ছিলেন যশোরের সেরেস্তাদার।

প্রফুল্লচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় গ্রামের স্কুলে। তাঁর বাবা-ই ছিলেন সেই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। স্কুলে বই পড়ার থেকে বন্ধুবৎসল বাবার সঙ্গে কথা বলে তিনি অনেক শিক্ষালাভ করেন। তাঁর বাবা তাঁকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি.এল.রিচার্ডসনের লেখা ‘ব্রিটিশ কবিগণের জীবনী’ বইটি উপহার দেন। ১৮৭০ সালে প্রফুল্লচন্দ্র সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন এবং কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন ১৮৭১ সালে। দীর্ঘকালীন অনিয়ম এবং রাত জেগে পড়াশোনা করার ফলে হজমের সমস্যা এবং রক্ত আমাশয়ে অসুস্থ হয়ে নিজের গ্রামে আবার ফিরে যান তিনি। এই সময়ে প্রফুল্লচন্দ্র বাবার লাইব্রেরিতে শেক্সপীয়ার, এমার্সন, কার্লাইল, ডিকেন্স, নিউটন, গ্যালিলিও, ফ্রাঙ্কলিন, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি পড়ার নেশায় মেতে থাকেন। সুস্থ হয়ে ১৮৭৩ সালে পুনরায় কলকাতায় গিয়ে অ্যালবার্ট স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তারপর এন্ট্রান্স পাশ করে বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হন প্রফুল্লচন্দ্র। বহিরাগত ছাত্র হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র এফ.এ পড়ার সময় থেকেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকদের রসায়ন বিষয়ে বক্তৃতা শুনতেন নিয়মিত। ধীরে ধীরে রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নবিদ্যা নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন এবং পরে ১৮৮২ সালে ‘গিলক্রাইস্ট বৃত্তি’ পেয়ে তিনি রসায়নে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য স্কটল্যাণ্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সিতে বিখ্যাত অধ্যাপক স্যার আলেকজাণ্ডার পেডলারের সান্নিধ্যে নিজের ঘরেই একটি ছোটখাট গবেষণাগার বানিয়ে ফেলেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সেখানেই চলতে থাকে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরলস জ্ঞানচর্চা। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৪ সালে বি.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন প্রফুল্লচন্দ্র যার বিষয় ছিল ‘ইণ্ডিয়া বিফোর অ্যাণ্ড আফটার মিউটিনি’, সিপাহি বিদ্রোহের আগে ও পরের ভারতবর্ষ। অদম্য সাহসী প্রফুল্লচন্দ্র ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কুফলগুলি জোরালোভাবে তুলে ধরেন তাঁর প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি পুরস্কার না পেলেও সমাদর পেয়েছিল। ১৮৮৭ সালে তিনি ডি.এস.সি ডিগ্রি পান এবং একইসঙ্গে ‘হোপ প্রাইজ’ বৃত্তি লাভ করেন।

১৮৮৮ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি এবং এরপর শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। যদিও দেশে ফিরে সঙ্গেই সঙ্গেই তিনি চাকরি পাননি। কিছুদিন বেকার জীবনে জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। ১৮৮৯ সালে প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে এই পদে বহাল ছিলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে রসায়নে স্যার তারকনাথ পালিত নামাঙ্কিত  ‘পালিত অধ্যাপক’ হিসেবে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। তারপর আমৃত্যু এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবেই নিযুক্ত থেকেছেন তিনি। এখানে একটি ঘৃণ্য ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়। প্রেসিডেন্সিতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্বদেশী হওয়ার অছিলায় প্রফুল্লচন্দ্রকে কম মাইনে ও তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ প্রভিন্সিয়াল অধ্যাপকের পদ দেওয়া হয়েছিল। একইরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসুও।

বাংলা ভাষায় সুশ্রাব্য ও রসিক বক্তৃতার মাধ্যমে রসায়নের পাঠদানে শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিকবিদিক। বহু বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র। তাঁদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, পঞ্চানন নিয়োগী, পুলিনবিহারী সরকার, এ.কে.ফজলুল হক, রসিকলাল দত্ত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। শিক্ষকতার পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর গবেষণাও।

১৮৯৬ সাল নাগাদ হঠাৎই একদিন প্রেসিডেন্সি কলেজের গবেষণাগারে তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’। রসায়নের ইতিহাসে এক চরম আশ্চর্যজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল এই আবিষ্কার। পারদের সংস্পর্শে লঘু নাইট্রিক অ্যাসিড রাখলে এই অস্থায়ী যৌগ উৎপন্ন হয়। প্রায় সমস্ত ধাতুরই নাইট্রাইট যৌগ আবিষ্কার করা সেসময় সম্ভব হলেও অত্যন্ত ভঙ্গুর ও অস্থায়ী এই বিশেষ যৌগটি কেউই তৈরি করতে পারেননি। এজন্য তাঁকে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা ‘মাস্টার অফ নাইট্রাইটস’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই গবেষণাপত্রটি প্রথম প্রকাশ পায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’-এর জার্নালে এবং একইসঙ্গে ১৮৯৬ সালের ২৮ মে লণ্ডনের ‘নেচার’ পত্রিকায়। এছাড়াও সালফাইডস ও হাইপোনাইট্রাইট বিষয়েও প্রচুর গবেষণা করেছেন তিনি।  প্রফুল্লচন্দ্র সমগ্র জীবনে মোট ১২টি যৌগিক লবণ ও ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। প্ল্যাটিনাম, ইরিডিয়াম ইত্যাদি ধাতুর বিষয়েও তাঁর গবেষণাপত্র রয়েছে। ১৮৮৭ সালে তাঁর ডি.এস.সি ডিগ্রির গবেষণাপত্রটি জমা দেন তিনি যার বিষয় ছিল ‘অন পিরিয়ডিক ক্ল্যাসিফিকেশন অফ এলিমেন্টস্‌’ (On Periodic Classification of Elements)। এছাড়া তাঁর অন্যান্য গবেষণাপত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘অন অ্যানালিসিস অফ ডাবল সালফেট্‌স অ্যাণ্ড দেয়ার ক্রিস্টালস্‌’ এবং ‘হাইপোনাইট্রাইটস অফ মার্কারি’। এগুলি ছাড়াও প্রফুল্লচন্দ্র সিলভার নাইট্রাইট থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট কিংবা মারক্যাপ্টাইল মূলকও আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর মোট গবেষণাপত্রের সংখ্যা ১০৭টি।

প্রফুল্লচন্দ্র রায় » সববাংলায়
ভিডিওটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

প্রফুল্লচন্দ্র রায় নিরলস নিষ্ঠার সঙ্গে গবেষণাকর্মে লিপ্ত থাকার পাশাপাশি গঠনমূলক কাজেও অংশগ্রহণ করেছেন। মাত্র আটশো টাকা মূলধন নিয়ে বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী করে তোলার মহান উদ্দেশ্যে তিনি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যাণ্ড ফার্মাসিউটিকাল ওয়ার্কস’। এছাড়াও তাঁরই উদ্যোগে ‘ক্যালকাটা পটারি ওয়ার্ক্স’, ‘ন্যাশনাল ট্যানারি লিমিটেড’, ‘বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস্‌’ ইত্যাদি বহু সংস্থা গড়ে ওঠে। বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠার সময় সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থের সামান্য কিছু অংশ রেখে বাকি সমগ্র অংশটিই তিনি দান করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকল্পে, দেশবাসীর হিতার্থে। ভারতের স্বদেশি আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ১৯২২ সালে রসায়নে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তাঁর দানের টাকা থেকে চালু করা হয় ‘নাগার্জুন পুরস্কার’।

লেখক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র রায় সারাজীবনব্যাপী বহু নিবন্ধ-প্রবন্ধ এবং কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী ছাত্র-পাঠ্য বইপত্র লিখেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য লিখেছেন ‘নব্যরসায়নী বিদ্যা ও তাহার উৎপত্তি’ (১৯০৬), ‘বাঙালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার’ (১৯১০), ‘চা পান ও দেশের সর্বনাশ’ (১৯৩২) ইত্যাদি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ১৯৩৭ সালে লেখা ‘আত্মচরিত’ এবং সুবিখ্যাত ‘দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল কেমিস্ট্রি’ (১৯০২ ও ১৯০৯) বইদুটি প্রধান। এই দ্বিতীয় বইটিতেই তিনি প্রমাণ করে দেখান যে ভারতের রসায়নচর্চার ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেই চরক-সুশ্রুতের সমকালীন ভারতের রসায়নচর্চার মাহাত্ম্য তিনি এই বইতে প্রমাণ করেন। তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হল – ‘জাতি গঠনে বাধা – ভিতরের ও বাহিরের’ এবং ‘জাতীয় সম্পদের মূলে বিজ্ঞানের শক্তি’। ১৯০৩ সালে প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর বাবার নামে স্থাপন করেন আর.কে বি.কে হরিশচন্দ্র স্কুল’ এবং  ১৯০৯ সালে তাঁর নিজের জন্মভূমিতে তিনি একটি সমবায় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। প্রফুল্লচন্দ্র বাংলাদেশে ‘পি.সি কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন ১৯০৮ সালে।

ব্যতিক্রমী, উদার এবং মহৎ কার্যের জন্য বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘নাইটহুড’ উপাধি পান। তার আগে ১৯১১ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১৯ সালে মহীশূর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টরেট’ সম্মান জ্ঞাপন করে। রবীন্দ্রনাথ ‘প্রফুল্লচন্দ্র রায়’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন।

১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মহান কর্মোদ্যোগী বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading