ইতিহাস

মেঘনাদ সাহা

মেঘনাদ সাহা (Meghnad Saha) ছিলেন একজন স্বনামধন্য বাঙালি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি সাহা আয়োনাইজেশন ইকুয়েশন (Saha Ionization Equation) তৈরি করেছিলেন যার দ্বারা নক্ষত্রের রাসায়নিক এবং ভৌত অবস্থা বোঝা যেত। তাঁর কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানশাস্ত্রে এক মাইলফলক হিসেবে মনে করা হয়।

১৮৯৩ সালে ৬ অক্টোবর অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার শেওড়াতলী গ্রামে একটি গরিব পরিবারে মেঘনাথ সাহার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম জগন্নাথ সাহা ও মায়ের নাম ভুবনেশ্বরী দেবী।  তিনি তাঁদের পঞ্চম সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবার মুদির দোকান ছিল। ছোট থেকেই তাঁকে অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে এবং অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের টোলে। এরপর  তিনি বৃত্তি পেয়ে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়ার জন্য তাকে এই স্কুল ছাড়তে হয়। এরপর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। পরে তিনি কলকাতায় চলে এসে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন। সেই সময় তাঁর সহপাঠী ছিলেন আরেকজন বিখ্যাত  বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি  আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে গণিতে বিএসসি (BSc) করেন এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর (Masters) সম্পন্ন করেন। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি দ্বিতীয় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ১৯১৯ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি (DSc) প্রদান করে। সেই বছর তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন, যার ফলে তিনি ইংল্যান্ড জার্মানীতে গবেষণার সুযোগ পান।

১৯১৯ সালের প্রথম পাঁচ মাস তিনি লণ্ডনে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলারের গবেষণাগারে এবং তারপর বার্লিনে ওয়াস্টার নার্নস্টের সাথে কাজ করেন। তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র “অন ম্যাক্সওয়েলস স্ট্রেসেস” লন্ডনের  ফিলোসফিক্যাল  ম্যাগাজিনে (Philosophical Magazine) প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। ১৯২০ সালে তিনি তাঁর সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখেন। এ বছর মেঘনাদ সাহা চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এই নিবন্ধগুলোর মাধ্যমে তিনি তাপীয় আয়নবাদ (Thermal Ionization) সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। দুবছর ধরে দেশের বাইরে গবেষণা করার পর ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি জলবিজ্ঞান, বর্ণালিবীক্ষণ এবং তাপগতিবিদ্যা বিষয়ে শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি গবেষণার কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন উন্নত মানের গবেষণাগার সেইসময় না থাকায় তিনি ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলেন।  ১৫ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি বিভাগটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন। এরপর তিনি  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। 

১৯১৮ সালে রাধারাণী সাহার সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তান ছিল। তাঁর প্রথম পুত্র অজিত কুমার সাহা প্রোথিতযশা বিজ্ঞানী ছিলেন।

১৯২৫ সালে  মেঘনাদকে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি (President) হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পরে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাকালীন তিনি গবেষণার বাইরেও কিছু সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান বিষয় সংযোজন করেন। এছাড়া তিনি ভারতবর্ষের প্রথম সাইক্লোট্রন (cyclotron) নির্মাণ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নামে পরিচিত। এর পাশাপাশি তিনি দামোদর উপত্যকা প্রকল্পের (Damodar Valley Project)  মূল নকশা তৈরি করেন।  তিনি বিজ্ঞানের অগ্রসরতায় কোনো অন্যায় সহ্য করতে পারতেন না। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের আগে জাতীয় বিজ্ঞান নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরুর সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়। এরপর তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে সাথে নিয়ে ভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন। অনেকের মতে, জওহরলাল নেহেরু একজন দূরদর্শী নেতা হলেও মেঘনাদ সাহা তাঁর বাল্যজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ভারতবর্ষের জনগণের চাহিদা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। তাছাড়া বিজ্ঞানের আঙিনায় মেঘনাদ সাহা নেহেরুর চেয়ে বেশি পারদর্শী ছিলেন। এই মর্মে তিনি ১৯৪৫ সালের ১২ আগস্ট নেহেরু এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে চিঠি প্রেরণ করেন। নেহেরুর সাথে শীতল সম্পর্কের মূল্যও দিতে হয়েছিল তাঁকে। দেশ বিভাগের পর নতুন ভারতে তাঁর প্রণীত বহু বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা জওহরলাল নেহেরু কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৯৫১ সালে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে লোকসভায় নির্বাচিত হন। এরপর তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে তিনি ভারতের বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত হয়ে যান।

মেঘনাদ এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু যুগ্মভাবে সর্বপ্রথম আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বসহ তাঁর বিভিন্ন নিবন্ধ ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন।  তাঁদের করা এই অনুবাদ ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রিন্সিপল্‌স অব রিলেটিভিটি  (Principles of Relativity) নামে প্রকাশিত হয়। অনুদিত বইটির ভূমিকা লেখেন প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ। ১৯৩০ সালে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী দেবেন্দ্র মোহন বসু এবং শিশির কুমার মিত্র মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করেন। কিন্তু নোবেল কমিটি মেঘনাদ সাহার কাজকে (আয়োনাইজেশন ইকুয়েশন) পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্ল্যেখযোগ্য প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এটি “আবিষ্কার” (invention) নয় বলে তিনি নোবেল পুরষ্কার পাননি। তাঁকে ১৯৩৭ সালে ও ১৯৪০ সালে এবং পরে আরো বেশ কয়েক মনোনীত করা হলেও নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল ৷

১৯৫৬ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে পরিকল্পনা কমিশনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদান ও বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান ভারত তথা বিশ্বের মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।