ইতিহাস

দীনদয়াল উপাধ্যায়

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এক অন্যতম হিন্দুত্ববাদী নেতা এবং একদা ভারতীয় জনতা সংঘের মুখপাত্র ছিলেন দীনদয়াল উপাধ্যায় (Deendayal Upadhyaya)। তাঁর হাত ধরেই ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’। জনমানসে তিনি ‘পণ্ডিতজি’ নামেই সমধিক পরিচিত। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তথা আরএসএস-এর সঙ্গে জড়িত হয়ে সমগ্র ভারতে হিন্দুত্ব প্রচার করা শুরু করেন তিনি। ১৯৪০-এর দশকে রাষ্ট্রধর্ম নামে একটি রাজনৈতিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন দীনদয়াল। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জন সংঘের সভাপতি ছিলেন তিনি। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাকেন্দ্রে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধুতি-কুর্তা পরে পরীক্ষা দিতে ঢোকায় জনসমাজে তাঁর একটি ভিন্নতর রূপ ফুটে ওঠে। লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি পরাজিত হন ১৯৬৩ সালে। তাঁর মৃত্যুর পরে ২০১৮ সালে ভারত সরকার মুঘলসরাই রেলস্টেশনের নাম বদলে ‘ দীনদয়াল উপাধ্যায় জংশন’ স্থির করে।

১৯১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের মথুরা জেলার নাগাল চন্দ্রভান গ্রামে দীনদয়াল উপাধ্যায় এর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শ্রী ভগবতীপ্রসাদ এবং তাঁর মায়ের নাম রামপিয়ারী। দীনদয়ালের ঠাকুরদা পণ্ডিত শ্রী হরিরাম উপাধ্যায় এক বিখ্যাত জ্যোতিষী ছিলেন। তাঁর ভাইয়ের নাম শিবনারায়ণ ওরফে শিবু। দীনদয়ালকেও বাড়িতে ‘দীনা’ বলে ডাকা হতো। সাবেকি উত্তর ভারতের বনেদি পরিবারে হিন্দু ধর্মীয় পরিবেশে দীনদয়ালের জন্ম হয়। দীনদয়ালের যখন মাত্র আড়াই বছর বয়স, সে সময় তাঁর বাবা ভগবতীপ্রসাদ জলেশ্বরে সহায়ক স্টেশন মাস্টারের চাকরিতে নিযুক্ত হন। নিত্যদিনের পারিবারিক কলহের কারণে ভগবতীপ্রসাদ নিজের কাকিমা আর বিমাতাকে জলেশ্বরে নিজের কাছে রেখে দুই পুত্র ও স্ত্রী রামপিয়ারীকে পাঠিয়ে দেন দীনদয়ালের মামার বাড়ি আগ্রা জেলার গুড়কী মড়াই গ্রামে। মামারবাড়িতেই বড়ো হয়েছেন দীনদয়াল। মামার বাড়িতে আসার কিছুদিনের মধ্যেই বাবা ভগবতীপ্রসাদের মৃত্যুর সংবাদ পান তিনি এবং কিছুদিনের মধ্যে তাঁর মা-ও শোকে-তাপে জর্জরিত হয়ে ক্ষয়রোগে মারা যান। তখন দীনদয়ালের বয়স মাত্র সাত বছর। মাতামহ চুন্নীলাল শুক্লার স্নেহে ও বাৎসল্যে কিছুদিন কাটলেও কয়েকদিনের মধ্যে তিনিও মারা যান। ফলে বাধ্য হয়ে ঐ অর্ধ-কৈশোরে এতগুলি ক্রমান্বয়ী মৃত্যু তাঁকে স্তম্ভিত ও অন্তর্মুখী করে তুলেছিল।

নয় বছর বয়স পর্যন্ত কোনো প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেননি দীনদয়াল। বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত হয়ে দাদুর কাছে থাকলেও সেখানে পড়াশোনার ভাল ব্যবস্থা ছিল না। পরে দাদুর মৃত্যুর পরে গঙ্গানগরে তিনি চলে যান মামা রাধারমণের কাছে। সেখানেই ১৯২৫ সালে প্রথম তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। প্রচণ্ড অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে দীনদয়াল একে একে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সহায়ক স্টেশন মাস্টার রাধারমণের সান্নিধ্যে এসে বছর চারেক প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন, কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য কোনো স্কুল না থাকায় আর পড়া হয়নি তাঁর। পরে ১৯২৯ সালে রাজস্থানের কোটানগর জেলার একটি স্কুলে ভর্তি হন দীনদয়াল। তারপরে সেই স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ১৯৩১ সাল নাগাদ কোটানগর ছেড়ে আলওয়ার জেলার রাজগড়ে আরেকটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। মামার চাকরির বদলির কারণে সীকরের কল্যাণ হাইস্কুল থেকে তাঁকে দশম শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষাটি দিতে হয় যেখানে তিনি বোর্ডের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এই সাফল্যে খুশি হয়ে সীকরের রাজা কল্যাণ সিং দীনদয়ালকে একটি স্বর্ণপদক, মাসিক দশ টাকা বৃত্তি এবং নগদ আড়াইশো টাকা দান করেন বইপত্র কেনার জন্য। ইন্টারমিডিয়েট স্তরের পড়াশোনার জন্য দীনদয়াল ১৯৩৫ সালে পিলানীতে চলে যান এবং সেই পরীক্ষাতেও বোর্ডে প্রথম হন। কানপুরের সনাতন ধর্ম কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক পাশ করেন দীনদয়াল আর তারপরে আগ্রার সেন্ট জোন্স কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হলেও পরে বোনের অসুস্থতার কারণে তিনি সেই স্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষাটি দিতে পারেননি। ফলে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ না হয়ে মামার অনুরোধে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসে তাতে ভালোভাবে সফল হন তিনি। প্রশাসনিক কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা না থাকায় প্রয়াগে শিক্ষক-শিক্ষণ কোর্স তথা বি.টি পড়ার জন্য চলে যান তিনি। বহুবিধ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর জেদ এবং একমুখী মানসিকতাই পড়াশোনার জগতে তাঁর মেধার প্রকাশ ঘটিয়েছে।

১৯৩৭ সালে সনাতন ধর্ম কলেজে পড়াকালীনই সহপাঠী বালুজী মহাশব্দের সান্নিধ্যে এসে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সংস্পর্শে আসেন দীনদয়াল উপাধ্যায় এবং ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালেই তিনি এই সংঘে যোগ দেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. কেশররাও বলিরাম হেডগোয়েকারের সঙ্গে একটি বিষয়ে আলোচনাও হয় দীনদয়ালের। হিন্দুত্ববাদী ধর্মতত্ত্বের সভা-সমিতিগুলিতে সে সময় নানা বিষয় নিয়ে দীনদয়ালের কথোপকথন হতো কেশররাও বলিরাম হেডগোয়েকারের সঙ্গে। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে সেবারে কংগ্রেস জয়লাভ করলে মুসলিম লীগের সঙ্গে তাঁর বিবাদ চরমে ওঠে এবং মুসলিম লীগ সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবে জোর দিতে থাকে যা দীনদয়ালের একেবারেই মনঃপূত ছিল না। সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদ দীনদয়াল পছন্দ করতেন না। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় বিনায়ক দামোদর সাভারকর, দাদারাও পরমার্থ এবং বাবাসাহেব আপ্তের সঙ্গে। তিন বছরের একটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এই সংঘে যেখানে গ্রীষ্মকালে চল্লিশ দিনের জন্য একটি প্রশিক্ষণ আয়োজিত হতো নাগপুরে। একে বলা হতো ‘সঙ শিক্ষাবর্গ’। ১৯৩৯ সালে প্রথম বর্ষ এবং ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বর্ষের সঙ শিক্ষাবর্গের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেন দীনদয়াল উপাধ্যায়। এই প্রশিক্ষণে মানসিক এবং শারীরিক দুভাবেই প্রশিক্ষিত করে তোলা হতো সংঘের সদস্যদের। বৌদ্ধিক চর্চার জগতে দীনদয়াল ছিলেন প্রথম শ্রেণির সদস্য। দ্বিতীয় বর্ষের প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি আরএসএস-এর প্রচারক হিসেবে সারা ভারতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকেন। প্রথাগত চাকরি না করে বিরাগী সন্ন্যাসীর মতো তিনি উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর জেলার আরএসএসের শাখার প্রচারকের কাজ বেছে নেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই পদেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর বুদ্ধির প্রাখর্য লক্ষ্য করে কর্তৃপক্ষ দীনদয়ালকে সমগ্র উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের সহ-প্রান্ত-প্রচারকের পদে উন্নীত করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রচারের জন্য দীনদয়াল উপাধ্যায় প্রথমে পাঞ্চজন্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন, সেই পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেলে হিমালয় নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন তিনি। সেই সময় গান্ধী হত্যার জন্য নাথুরাম গডসের প্রসঙ্গকে বিষয় করে সমগ্র সংঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সেই জন্য পরপর দুটি পত্রিকাকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশেষে দীনদয়াল ‘রাষ্ট্রভক্ত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতাতেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র সংবিধান তৈরি হয়।

সংঘের বালকদের পড়াশোনার সুবিধের জন্য দীনদয়াল নিজে ‘সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত’ নামে একটি বই লেখেন। শিশুসাহিত্যের জগতে এই বইটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এরপরে তিনি আরেকটি উপন্যাস লেখেন ‘জগদগুরু শঙ্করাচার্য’ নামে। ইতিহাস থেকে তথ্য ও উপাদান নিয়ে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন যদিও সে সবই সংঘের শিক্ষার উদ্দেশ্যে। ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালে যথাক্রমে এই দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। কিন্তু এরপরে আর কোনো উপন্যাস লেখেননি তিনি। ১৯৪৫ সালে ‘পাঞ্চজন্য’ পত্রিকা প্রকাশ করার সময়ে সাংবাদিকতাও করতে হয়েছে দীনদয়ালকে। ‘দৈনিক স্বদেশ’ নামেও একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এই পত্রিকাগুলির সম্পাদনার পাশাপাশি প্রকাশনার অন্য ক্ষেত্রগুলিও নিজের হাতে দেখেছেন।

অখণ্ড ভারতের দর্শন নিয়ে তিনি নিজে ‘অখণ্ড ভারত কেন’ নামের একটি বই লেখেন দীনদয়াল উপাধ্যায় যে বই থেকেই তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ১৯৫২ সালের সর্বভারতীয় অধিবেশনে ভারতীয় জনসংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের হয়ে কাজ করেছেন তিনি। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের হয়ে এই ধর্মীয় ভাবাদর্শই তিনি আজীবন প্রচার করে এসেছেন। কাশ্মীরের অখণ্ডতার প্রশ্নে তিনি কখনোই কাশ্মীরে পৃথক সংবিধান, পৃথক দেশনেতা চাননি।

১৯৬৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মুঘলসরাই স্টেশনে রহস্যজনকভাবে দীনদয়াল উপাধ্যায় এর মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন