থিওডোর রুজভেল্ট

থিওডোর রুজভেল্ট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ উত্থান-পতনময় রাজনৈতিক ইতিহাস যে সমস্ত মহান প্রতিভাশালী রাজনীতিবিদের অবদানে সমৃদ্ধ তাঁদের মধ্যে অন্যতম থিওডোর রুজভেল্ট (Theodore Roosevelt)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম করা হয়। তবে কেবলমাত্র একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবেই তিনি পরিচিত নন, তাঁর পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয়, তিনি ছিলেন একাধারে একজন রাষ্ট্রনায়ক, প্রকৃতিবিদ, ইতিহাসবিদ, সংরক্ষণবাদী এবং লেখক। কলম তুলে নিয়ে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি, তেমনি সৈনিকের বেশে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দুই বিবদমান দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আপস মীমাংসার স্তরেও নিয়ে গিয়েছেন। প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন রুজভেল্ট। রিপাবলিকান দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে প্রগতিশীল আন্দোলন থেকে প্রগতিশীল দলেরও জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। নিউইয়র্কের গভর্নর হিসেবে যেমন গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন, তেমনি নৌ-বাহিনীর সহকারী সচিব, নিউইয়র্ক সিটি বোর্ড অফ পুলিশ কমিশনারের সভাপতি, নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সংখ্যালঘু নেতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে। দুই দেশের যুদ্ধ মীমাংসার জন্য তিনি পেয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার।

১৮৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটানের একটি ডাচ পরিবারে থিওডোর রুজভেল্টের জন্ম হয়। এই ডাচ পরিবার সপ্তদশ শতাব্দীতে আমেরিকায় বসতি স্থাপন করেছিল। রুজভেল্টের পিতামহ ছিলেন ডাচ বংশোদ্ভূত। তাঁর বাবা থিওডোর রুজভেল্ট সিনিয়র (Theodore Roosevelt Sr.) ছিলেন নিউইয়র্কের কালচারাল অ্যাফেয়ার্সের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা এবং নামজাদা ব্যবসায়ী ও জনহিতৈষী এক ব্যক্তি। রুজভেল্টের মা মার্থা স্টুয়ার্ট ‘মিটি’ বুলোচ (Martha Stewart ‘Mittie’ Bulloch) ছিলেন এক ধনী দাস-মালিকানাধীন কৃষক পরিবারের মেয়ে। মার্থার চার সন্তানের মধ্যে থিওডোর রুজভেল্ট ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। ১৮৮০ সালে রুজভেল্ট বিবাহ করেন অ্যালিস হ্যাথাওয়ে লি (Alice Hathaway Lee) নামক এক নারীকে।

ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেন রুজভেল্ট। মূলত দুর্বল স্বাস্থ্য এবং তীব্র হাঁপানির রোগ ছিল তাঁর। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তিও ছিল তাঁর অত্যন্ত ক্ষীণ যা সারা জীবন তাঁকে নানা অসুবিধায় ফেলেছিল। রাত্রিকালীন হাঁপানি তাঁকে আক্রমণ করত মাঝেমধ্যেই। এমনকি প্রায় মৃত্যুর মত অবস্থা থেকেও বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। ডাক্তারদের কাছে তখন তাঁর এই অসুখের কোনও প্রতিকার ছিল না। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতাকে আমল না দেওয়ারই চেষ্টা করতেন রুজভেল্ট। এমনকি এই অসুস্থতায় নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য তিনি নিজের একটি ঘরে ডাম্বেল তুলতেন এবং বক্সিং অভ্যাস করতেন। সেই ঘরটিকে একটি ছোটখাটো জিমন্যাসিয়াম বানিয়ে ফেলেছিলেন প্রায়।

সেই ছোট থেকেই যে কোনও কাজে প্রচন্ড উদ্যমী এবং অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। বিশেষত প্রাকৃতিক বিশ্ব বিষয়ে তাঁর কৌতূহল যেন ছিল সহজাত। বিভিন্ন প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, মাছ ইত্যাদি সম্পর্কে পড়াশোনা করতে ভালবাসতেন তিনি। সাত বছর বয়সে বাজারে যখন একটি মৃত সীল মাছ দেখেছিলেন রুজভেল্ট, সেই সীল মাছের মাথাটা পাওয়ার পর সেটিকে সংরক্ষণ করে রাখেন তিনি এবং দুই পারিবারিক ভাইয়ের সঙ্গে একটি ঘরোয়া মিউজিয়াম গড়ে তোলেন যার নাম দেন, ‘রুজভেল্ট মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’। যে সমস্ত প্রাণী তিনি মেরেছিলেন বা ধরেছিলেন সেগুলি দিয়েই সেই মিউজিয়াম ভর্তি হতে থাকে। ট্যাক্সিডার্মি বা প্রাণী সংরক্ষণের মূল বিষয়গুলি তিনি শিখেছিলেন। নয় বছর বয়সে থিওডোর রুজভেল্ট পোকামাকড় সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিষয়ে ‘দ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ ইনসেক্টস’ নামে একটি গবেষণাপত্র রচনা করেছিলেন। ১৮৬৯ ও ১৮৭০ সালে ইউরোপ এবং ১৮৭২ সালে মিশরে পারিবারিক ভ্রমণের সময়ে তাঁর এক মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি আল্পস ভ্রমণের সময় অনুভব করেছিলেন যে শারীরিক পরিশ্রম তাঁর হাঁপানি কমাতে এবং আত্মাকে শক্তিশালী করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময় ভারী ব্যয়াম শুরু করেন তিনি। ক্যাম্পিং ট্রিপে দুই বয়স্ক ছেলে তাকে হেনস্তা করেছিল। এরপর এক বক্সিং প্রশিক্ষকের কাছে ভর্তি হন তিনি শরীর শক্ত করবার জন্য।

ছোটবেলা থেকেই শারীরিক অসুস্থতা এবং দুর্বলতার জন্য থিওডোর রুজভেল্ট মূলত বাড়িতেই শিক্ষালাভ করেছিলেন। তিনি ভূগোল বিষয়ে ছিলেন তুখোড়, তাছাড়াও ইতিহাস, জীববিদ্যা, ফরাসি এবং জার্মান ভাষাতেও বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু গণিত এবং ধ্রুপদী ভাষাগুলি আয়ত্ত করতে তাঁকে ভালই বেগ পেতে হয়েছিল। ১৮৭৬ সালে সতের বছর বয়সে হাভার্ড কলেজে প্রবেশ করেন তিনি পড়াশোনার জন্য। বিজ্ঞান, দর্শন এবং অলঙ্কারশাস্ত্রে ভাল ফল করলেও লাতিন ও গ্রিক ভাষা শিক্ষায় সমস্যা হয়েছিল তাঁর। তবে জীববিদ্যা তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন সেই সময়। এমনকি তখন একজন দক্ষ প্রকৃতিবিদ এবং পক্ষীবিদ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হাভার্ডে থাকাকালীন রোয়িং এবং বক্সিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি এবং বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্স-আপ হয়েছিলেন। হাভার্ডে পড়াকালীন ১৮৭৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাবার মৃত্যু হলে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন থিওডোর রুজভেল্ট, কিন্তু সেই শোক কাটিয়ে উঠে ১৮৮০ সালে তিনি হাভার্ড থেকে এবি ম্যাগনা কাম লড-সহ ফি বেটা কাপা স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অধ্যয়নের পূর্ব পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে রুজভেল্ট আইন অধ্যয়নের জন্য ক]\\লম্বিয়া ল স্কুলে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সেখানে ভর্তি হন। একজন দক্ষ আইনের ছাত্র হলেও আইনকে কখনও কখনও অযৌক্তিক বলে মনে হত তাঁর। সেখানে পড়াকালীন ১৮৮২ সালে তিনি ১৮১২’র আমেরিকার নৌ-যুদ্ধ সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেন যার নাম ‘ন্যাভাল ওয়ার অফ ১৮১২’। আইন খুব একটা আকর্ষণ করেনি রুজভেল্টকে। তিনি যখনই নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান, তখনই কলম্বিয়া ল স্কুল থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন। সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে থিওডোর রুজভেল্ট নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন এবং রাজনীতির বৃহৎ ক্ষেত্রে পদার্পণ করেন। ১৮৮২, ১৮৮৩ এবং ১৮৮৪, পরপর এই তিন বছর তিনি স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্যপদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন দুর্নীতি বিষয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। কর্পোরেট দুর্নীতি নিয়ে যেমন সরব হয়েছিলেন, তেমনি অর্থদাতা জে গোল্ড নিজের কর কমানোর জন্য যে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তাও রুখে দিয়েছিলেন তিনি।  আলবেনিতে সম্ভাব্য দুর্নীতির কথাও প্রকাশ করে দেন রুজভেল্ট।

১৮৮৪ সালে রুজভেল্টের কন্যা অ্যালিস লি রুজভেল্টের জন্ম হয়। এর দুই দিন পরেই কিডনির ব্যর্থতার কারণে রুজভেল্টের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। আশ্চর্যজনকভাবে সেই একই দিনেই টাইফয়েড জ্বরে মৃত্যু হয় তাঁর মায়েরও। এই ভয়ঙ্কর শোক কাটিয়ে ওঠা ভীষণই মুশকিল হয়ে পড়েছিল রুজভেল্টের পক্ষে। সেসময় কিয়ৎকালের জন্য তিনি চলে যান ডাকোটা টেরিটোরি অঞ্চলে। এখানে গবাদি পশুর ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছিল, ফলে এই অঞ্চলে খামারবাড়ি তৈরি করে গবাদি পশুপালক হওয়ার আশায় বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির কিছু টাকা এখানে বিনিয়োগ করেছিলেন। ১৮৮৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরে, থিওডোর রুজভেল্ট এলখোর্ন নামে একটি খামার তৈরি করেছিলেন যা উত্তর ডাকোটার মেডোরা শহরের বুমটাউন থেকে ৩৫ মাইল (৫৬ কিমি) উত্তরে ছিল। গবাদি পশুপালন, শিকার ইত্যাদি কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে মা এবং স্ত্রীয়ের শোক থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। এখানে থাকাকালীন সীমান্তবর্তী জীবন এবং তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে যে গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন তিনি সেগুলি হল ‘হান্টিং ট্রিপস অফ আ রেঞ্চম্যান’, ‘রেঞ্চ লাইফ অ্যান্ড দ্য হান্টিং-ট্রেল’ এবং ‘দ্য ওয়াইল্ডারনেস হান্টার’। ফিরে এসে ১৮৮৬ সালের ২ ডিসেম্বর বোনেদের অনেক আপত্তি সত্ত্বেও রুজভেল্ট তাঁর শৈশবের পারিবারিক এক বন্ধু এডিথ কারমিট ক্যারোকে (Edith Kermit Carow) বিবাহ করেন। তাঁদের মোট পাঁচটি সন্তান ছিল।

এরপর পুরোদস্তুর রাজনীতিতে মনোযোগ দেন তিনি। রিপাবলিকান নেতারা নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাব এনেছিল তাঁর কাছে। সেই প্রস্তাবে তিনি সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সাতাশ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। এসময় ‘দ্য উইং অফ দ্য ওয়েস্ট’ লেখার দিকে মন দেন এসময়। এই পরাজয়ের কারণে তিনি ভেবেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক জীবন পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা আর খুব বেশি নেই। ১৮৮৮ সালে বেঞ্জামিন হ্যারিসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং থিওডোর রুজভেল্ট তাঁকে সমর্থন করে মিডওয়েস্টে স্টাম্প বক্তৃতা দেন। ক্যাবট লজের অনুরোধে হ্যারিসন ইউনাইটেড স্টেটস সিভিল সার্ভিস কমিশনে নিয়োগ করেন রুজভেল্টকে। ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত এই পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। এর মাঝে ১৮৯৪ সালে সংস্কারবাদী রিপাবলিকানদের মেয়র পদের জন্য লড়াইয়ের অনুরোধ ফিরিয়ে দেন তিনি। ১৮৯৪ সালে রিপাবলিকান উইলিয়াম লাফায়েট স্ট্রং মেয়র নিযুক্ত হয়ে রুজভেল্টকে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার বোর্ডের সভাপতির পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলে সম্মত হন তিনি। পুলিশ বাহিনীর বিপুল সংস্কার করেন তিনি। নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্র পরিদর্শন করতেনও তিনি। রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে শারীরিক এবং মানসিক যোগ্যতার ভিত্তিতে পুলিশ নিয়োগ করতেন তিনি। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ হোস্টেলগুলিও তিনি বন্ধ করে দেন।

এরপর ১৮৯৭ সালে রাষ্ট্রপতি ম্যাককিনলে সেনেটর হেনরি ক্যাবট লজের অনুরোধে রুজভেল্টকে নৌ-বাহিনীর সরকারি সচিব হিসেবে নিয়োগ করেন এবং এক বছর এই দায়িত্ব সামলান তিনি। দেশের নৌ-শক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে জোর দেন তিনি। এরপর ১৮৯৮ সালে স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রথম মার্কিন স্বেচ্ছাসেবক অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করেন এবং এই রেজিমেন্টের কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব সামলান। এই বাহিনী ‘রাফ রাইডার্স’ নামে পরিচিত ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্বে সাহসী অবদানের জন্য আমেরিকার সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান কংগ্রেসনাল মেডেল অফ অনারের জন্য মনোনীত হন থিওডোর রুজভেল্ট। ১৮৯৮ সালে নিউইয়র্কের গভর্নর নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং প্রগতিশীল কাজকর্মের জন্য রিপাবলিকানরা ভীত হয়ে পড়ে। ফলে রিপাবলিকান নেতারা তাঁর থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য ১৯০০ সালে তাঁকে ম্যাককিনলের অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করেন। সেই পদ নিছকই এক আনুষ্ঠানিক পদ জেনেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনোনয়ন গ্রহণ করেন রুজভেল্ট। ভেবেছিলেন অন্ততপক্ষে ১৯০৪-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। কিন্তু ১৯০১ সালে যখন আততায়ীরা ম্যাককিনলেকে হত্যা করেন, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৬তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন থিওডোর রুজভেল্ট।
৪২ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমেরিকান কর্মক্ষেত্রের সংস্কার করেন রুজভেল্ট। ঘরোয়া অনেক কর্মসূচি প্রবর্তন করে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী শ্রেণির উন্নতি করতে চেয়েছিলেন তিনি। শিল্প এবং উপভোক্তার সুরক্ষা বিষয়টিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনেন তিনি। আমেরিকাকে বিশ্ব ফোরামের কেন্দ্রে আনার উদ্দেশ্যে জনসংযোগের জন্য নৌ-বাহিনীর সাহায্যে ‘গ্রেট হোয়াইট ফ্লিট’ তৈরি করেন। রুজভেল্ট পানামা খালের কাজও ত্বরান্বিত করেন। এছাড়াও তিনি সংরক্ষণের কাজ করেছিলেন বিস্তর। জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ঐতিহ্যমন্ডিত স্থান, অভয়ারণ্য ইত্যাদি সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন তিনি। মনরো মতবাদের মাধ্যমে রাশিয়ান-জাপানি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে থিওডোর রুজভেল্ট ১৯০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। নারীর ভোটাধিকার, জাতিগত বৈষম্যেরও মোকাবিলা করেছিলেন তিনি।

১৯০৮ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করেন। ১৯০৯ সালে আফ্রিকা অভিযানে যান তিনি। শিকার করেন সেখানে, ‘আফ্রিকান গেম ট্রেইল’ নামে বইও লেখেন। এরপর ইংল্যান্ডে বিশেষ রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজের জন্য সফর করেন। ফিরে এসে নতুন রাষ্ট্রপতি টাফটের সরকার পরিচালনায় হতাশ হয়ে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেন রুজভেল্ট। টাফট রিপাবলিকান দলের ছিল বলে, ১৯১২ সালে প্রগতিশীল দল গঠন করে নির্বাচনে লড়েন থিওডোর রুজভেল্ট কিন্তু ব্যর্থ হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করে জার্মানির বিরুদ্ধে কঠোর নীতির দাবি জানান। ১৯১৬-তে আবার রাষ্ট্রপতি পদের জন্য লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষান্ত হন তিনি। জীবদ্দশায় রুজভেল্টের প্রায় ২৫টি বই প্রকাশিত হয়। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ চার খণ্ডের ‘দ্য উইনিং অফ দ্য ওয়েস্ট’।

১৯১৯ সালের ৬ জানুয়ারি সাগামোর হিলের বাড়িতে করোনারি এমবোলিজমে ভুগে ঘুমের মধ্যেই থিওডোর রুজভেল্টের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান