ভারতের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক যিনি শিক্ষার আধুনিকীকরণ এবং মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তিনি হলেন অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় (Aghorenath Chattopadhyay)। তিনি ডক্টর অফ সায়েন্স (ডি.এসসি.) ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ভারতীয়। এই ডিগ্রি সেই সময়ে একটি বিরল স্বীকৃতি ছিল।
১৮৫১ সালের ৩১ অক্টোবর (মতান্তরে ১৮৫৫ সালে) বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরের কনকসার গ্রামের ভ্রামণগাঁওয়ে অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম রামচরণ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল বরোদাসুন্দরী দেবী। পড়াশোনার জন্য অঘোরনাথ এডিনবার্গ (Edinburgh) গিয়েছিলেন এবং যাওয়ার আগে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর অঘোরনাথ বিদেশযাত্রা করলে বরদাসুন্দরীর দেবী কেশবচন্দ্র সেনের শিক্ষাক্ষেত্র ‘ভারত আশ্রম’ (Bharat Ashram)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের আটটি সন্তানের মধ্যে চারজন মেয়ে এবং চারজন ছেলে। তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন সরোজিনী নাইডু। ১৮৭৯ সালে তাঁর জন্ম হয় এবং এর ঠিক এক বছর পর, ১৮৮০ সালে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। ১৮৯৮ সালে জন্ম হয় তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র হরিন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের।
অঘোরনাথের প্রায় সব সন্তানই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সরোজিনী নাইডুকে ‘ভারতের নাইটেঙ্গল’ (The Nightingale of India or Bharatiya Kokila) বলা হয়। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর সরোজিনী নাইডু সংযুক্ত প্রদেশের (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ) প্রথম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অঘোরনাথের দ্বিতীয় সন্তান বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ও বিপ্লবী ছিলেন। তিনি বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশদের অপরাধের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেডের তালিকায় তাঁর নাম ছিল। এক সময় তিনি ইউরোপে বেশ কিছুকাল সময় কাটিয়েছিলেন ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের জন্য সমর্থন সংগ্রহ করেছিলেন। মস্কোতে থাকাকালীন তিনি স্ট্যালিনের গ্রেট পার্জের (Stalin’s Great Purge) শিকার হন। ১৯৩৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অঘোরনাথের দ্বিতীয় কন্যা মৃণালিনী কেমব্রিজ থেকে পড়াশোনা করেন এবং অবিভক্ত ভারতে লাহোরের গঙ্গারাম গার্লস হাই স্কুলে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। এটি বর্তমানে লাহোর কলেজ ফর উইমেন ইউনিভার্সিটি নামে পরিচিত। তৃতীয় কন্যা সুনালিনী ছিলেন একজন কত্থক নৃত্যশিল্পী। কনিষ্ঠ কন্যা সুহাসিনী ছিলেন একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম মহিলা সদস্য। তিনি এ.সি.এন.নাম্বিয়ারকে (A.C.N.Nambiar) বিয়ে করেছিলেন কিন্তু পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। অঘোরনাথের কনিষ্ঠ সন্তান হরিন্দ্রনাথ ছিলেন একজন কবি, নাট্যকার, অভিনেতা ও সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি বিজয়ওয়াড়া নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রথম লোকসভার সদস্য মনোনীত হন। ১৯৭৩ সালে তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানীত করা হয়।
এক নজরে অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী:
- জন্ম: ৩১ অক্টোবর, ১৮৫১
- মৃত্যু: ২৮ জানুয়ারি, ১৯১৫
- কেন বিখ্যাত: অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম D.Sc. ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষাবিদ, যিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে এই ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি নিজাম কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ এবং হায়দরাবাদে নারী শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সমাজ সংস্কার, আধুনিক শিক্ষা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সরোজিনী নাইডু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় গিলক্রিস্ট বৃত্তি, হোপ পুরস্কার ও ব্যাক্সটার স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। D.Sc. ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় বলে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন।
অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পড়াশোনা শুরু হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর, তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সাড়ে তিন বছর পড়াশোনা করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি বিদেশে যান এবং একজন ব্যতিক্রমী ছাত্র হিসেবে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ডি.এস.সি. (Doctor of Science) প্রোগ্রাম করার জন্য গিলক্রিস্ট বৃত্তি (Gilchrist scholarship) লাভ করেন। ডক্টর অফ সায়েন্স ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় ছিলেন অঘোরনাথ। পড়াশোনায় তিনি বরাবরই উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনায় তাঁর দক্ষতার জন্য অঘোরনাথ হোপ পুরস্কার (Hope Prize) এবং ব্যাক্সটার স্কলারশিপ (Baxter Scholarship) অর্জন করেন।
এখানকার পড়া শেষ হলে নিজামের রাজ্যে (হায়দরাবাদ) ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার উন্নতির জন্য সালার জং (Salar Jung) তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর আমন্ত্রণে অঘোরনাথ এডিনবার্গ থেকে হায়দরাবাদে চলে আসেন। সেখানে চান্দেরঘাটে অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন তিনি। এটি ছিল আদ্যোপান্ত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং তিনিই ছিলেন এই স্কুলের প্রথম অধ্যক্ষ। অঘোরনাথের স্কুলে যোগ দেওয়ার পর থেকে স্কুলের পঠনপাঠনের মানোন্নয়ন ও শিক্ষার আধুনিকীকরণ হয়। এই স্কুলই পরবর্তীকালে যখন নিজাম কলেজে রূপান্তরিত হয়, তখন তিনিই কলেজের দায়ভার সামলান। নিজাম কলেজেরও প্রথম অধ্যক্ষ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তিনি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হিসেবে মহিলাদের জন্য একটি কলেজ চালু করার প্রচেষ্টাও শুরু করেন। শিক্ষা বিস্তারে অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহ ছিল প্রবল। তাঁর প্রচেষ্টাতেই মহিলাদের শিক্ষা আরও একধাপ অগ্রসর হয়। পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী বরদাসুন্দরী অঘোরনাথের সহায়তায় চন্দরঘাটে একটি বালিকা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর পারিবারিক বাড়িটি তেলেঙ্গানা মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ম (TMV) এর মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অঘোরনাথ হায়দরাবাদে চাকরিতে নিযুক্ত হওয়ার পর গোটা চট্টোপাধ্যায় পরিবার হায়দরাবাদে স্থানান্তরিত হয়। এখানেই জন্ম হয় সরোজিনী নাইডু-সহ অঘোরনাথের তিন সন্তানের। তিনি নারী শিক্ষা, বিধবা পুনর্বিবাহ এবং বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণের পক্ষে ছিলেন। হায়দ্রাবাদ রাজ্যে ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রচলিত বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act, 1872) যা বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করত, তা বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অঘোরনাথ হায়দ্রাবাদের বুদ্ধিজীবীদের একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন যারা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনায় অংশ নিতেন এবং দেশের উন্নতির জন্য সর্বদাই উদ্যত থাকতেন।
হায়দরাবাদে থাকাকালীন সময়েই অঘোরনাথ সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি হায়দরাবাদে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর ছেলে ও মেয়েরাও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন যার সবচেয়ে বড় নিদর্শন সরোজিনী নাইডু এবং বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। একবার তাঁর বিপ্লবী পুত্র বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে আসা অপরাধমূলক চিঠির সন্ধানে ব্রিটিশ সরকারের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তাঁর বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায়।
১৮৮৩ সালে সরকার সমর্থিত চন্দ রেল প্রকল্প (Chanda Rail Project) নিয়ে নিজামের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। তিনি এই প্রকল্পের সপক্ষে ছিলেন না। ফলে অসন্তুষ্ট নিজাম তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো হয়ে ওঠে যে ১৮৮৩ সালের ২০ মে তাঁকে হায়দ্রাবাদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু শিক্ষার প্রসার, আধুনিকীকরণ, সততা, পাণ্ডিত্য এবং সুশাসনমূলক প্রশাসনিক দক্ষতায় অঘোরনাথের ক্ষমতা ছিল অদ্বিতীয়। তিনি ছাত্রছাত্রীদের নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। ফলে কয়েক বছর পর ফের তাঁকে হায়দরাবাদে ফিরিয়ে আনতে হয় এবং পুরনো নির্দেশ প্রত্যাহার করে অঘোরনাথকে তাঁর চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়। ক্রমেই নিজামদের সঙ্গে সম্পর্কে উন্নতি হতে থাকে অঘোরনাথের। এই নিজামই পরবর্তীকালে সরোজিনী নাইডুকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য বৃত্তি প্রদান করেন। নিজামের সঙ্গে মতবিরোধ মিটলেও হায়দরাবাদে ফিরে অঘোরনাথের রাজনৈতিক সক্রিয়তার কোনও পরিবর্তন হয়নি। নিজের মতাদর্শে তিনি অটল ছিলেন এবং রাজনীতি চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা ও উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পেতে থাকায় ফের নিজামের রোষানলে পড়েন তিনি। ফলশ্রুতি হিসেবে তাঁকে তাড়াতাড়ি অবসর নিতে কার্যত বাধ্য করা হয়। এরপর হায়দরাবাদ ছেড়ে সপরিবারে কলকাতায় স্থানান্তরিত হন অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতায় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী বরদাসুন্দরী দেবী লাভলক স্ট্রিটে থাকতে শুরু করেন।
তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ ছিল অঘোরনাথের। সেই কারণে তিনি ইয়ং মেনস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি (Young Men’s Improvement Society) এবং আঞ্জুমানে-ইকওয়ানস-সুফা (ব্রাদারহুড সোসাইটি) [Anjumane-Ikwanus-Sufa (The Brotherhood Society)]-র মতো সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সরোজিনী নাইডুর প্রথম কবিতা সংকলন ‘গোল্ডেন থ্রেশোল্ড’ (Golden Threshold) প্রকাশের পর তাঁদের হায়দরাবাদের বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘গোল্ডেন থ্রেশোল্ড’। এটি বর্তমানে একটি জাদুঘর।
১৯১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি কলকাতায় লাভলক স্ট্রিটের বাড়িতেই অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারায় এক অতুলনীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারককে যিনি প্রতি পদক্ষেপে দেশকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। তিনি যা কাজ করেছেন সেই তুলনায় খ্যাতি না পেলেও তাঁর নাম ও শিক্ষা তাঁর পুত্রকন্যাদের মধ্যে দিয়ে অমর হয়ে রয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের অবদান ভোলার নয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান