ইতিহাস

এস নাম্বি নারায়ণন

ইণ্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন অর্থাৎ ইসরো-র একজন অন্যতম ভারতীয় এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার এস. নাম্বি নারায়ণন (S. Nambi. Narayanan)। ২০১৯ সালে তাঁকে ভারত সরকার দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। ভারতের উৎক্ষেপণ করা প্রথম পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (PSLV)-র জন্য প্রয়োজনীয় বিকাশ ইঞ্জিনকে উন্নত করে তুলেছিলেন তিনি। ইসরো-র একজন প্রবীণ অফিসার হিসেবে ক্রায়োজেনিক্স বিভাগের অধিকর্তা হিসেবে কাজ করতেন নারায়ণন। ১৯৯৪ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে মিথ্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং সেই ঘটনাই তাঁর ও দেশের মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলেছে। ১৯৯৬ সালে তাঁর সম্পর্কে ওঠা সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করে সিবিআই। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিপূরণ বাবদ তাঁকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেয় এবং একই প্রসঙ্গে কেরালা সরকার তাঁকে ১.৩ কোটি টাকা দিতে স্বীকৃত হয়।

১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী জেলার নাগেরকয়েল শহরে এস. নাম্বি. নারায়ণনের জন্ম হয়। নাগেরকয়েলেই ডিভিডি হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেন নারায়ণন।

ইসরো-র একজন পে-লোড ইন্টিগ্রেটর হিসেব কাজ শুরু করেছিলেন এস. নাম্বি নারায়ণন । সেই সময় তাঁর সহকর্মী ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ওয়াই. এস. রাজন। ১৯৬৬ সালে তিরুবনন্তপুরমের থুম্বা ইকুয়েটোরিয়াল রকেট লঞ্চিং স্টেশনে তৎকালীন ইসরো-র চেয়ারম্যান বিক্রম সারাভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা করেন তিনি। স্পেস, সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজি সেন্টারের চেয়ারম্যান বিক্রম সারাভাই কেবলমাত্র দক্ষ বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদেরই তাঁর সংস্থায় কাজে নিতেন। তাই ইসরোয় আরও পদোন্নতি করার জন্য নারায়ণন তিরুবনন্তপুরমের কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এম.টেক এর জন্য ভর্তি হন। এই ডিগ্রি অর্জনের পরে বিক্রম সারাভাই তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য ছুটি দিতে সম্মত হন। কিন্তু সারাভাইয়ের শর্ত ছিল যে নারায়ণনকে কোনো আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করতে হবে। ক্রমান্বয়ে নাম্বি নারায়ণন একটি নাসা বৃত্তি পেয়ে ১৯৬৯ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মাত্র দশ মাসের মধ্যে কেমিক্যাল রকেট প্রপালশন বিষয়ে তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন অধ্যাপক লুইজি ক্রোকোর অধীনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া চাকরির সুযোগ ছেড়ে তরল পরিচালক (Liquid Propellant) বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু ভারতে তখনও রকেট উৎক্ষেপনের ব্যাপারে কঠিন পরিচালক (Solid Propellant)-ই ব্যবহার করা হত। ১৯৭০-এর দশকে এস. নাম্বি. নারায়ণনই প্রথম ভারতে তরল জ্বালানির রকেট প্রযুক্তির ধারণা সকলের সামনে নিয়ে আসেন। সেই সময় এ.পি.জে আবদুল কালামের দলও ‘সলিড মোটর’ (Solid Motor) বিষয়ে কাজ করছিল। ভবিষ্যতের মহাকাশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে তরল জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন নারায়ণন এবং ইসরো-র তৎকালীন চেয়ারম্যান সতীশ ধাওয়ানও তাঁকে এ বিষয়ে খুবই সাহায্য করেছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রথম ৬০০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি থ্রাস্ট ইঞ্জিন তৈরি করতে সমর্থ হন নারায়ণন তাও কেবলমাত্র তরল পরিচালকের সাহায্যে। পরবর্তীকালে আরও বড় ধরনের ইঞ্জিন বানাতে মনোনিবেশ করেন তিনি। ১৯৯২ সালে ফরাসী বদান্যতায় দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাজের ফলে নারায়ণন এবং তাঁর দল বিকাশ ইঞ্জিন তৈরি করতে সমর্থ হন যা ইসরো-র বেশিরভাগ রকেটে থাকে। এর পাশাপাশি তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় প্রথম পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (PSLV) যা ২০০৮ সালে চাঁদে অবতরণকারী চন্দ্রযান-১ এর মধ্যে ছিল। এই পিএসএল্ভি-র দ্বিতীয় ধাপে বিকাশ ইঞ্জিন ব্যবহৃত হতে থাকে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৯৪ সালে মালদ্বীপের দুজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার মারিয়াম রাশিদা এবং ফৌজিয়া হাসানের কাছে ভারতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষার তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় এস. নাম্বি. নারায়ণনকে। প্রতিরক্ষা বিভাগের অফিসারদের মতে, ঐ তথ্য ছিল আসলে রকেট ও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ব্যাপারে। আরও দুজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে নাম্বি নারায়ণনকেও কোটি টাকার বিনিময়ে তথ্য ফাঁস করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এমতাবস্থায় পুলিশের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে ৫০ দিন কারাগারে বন্দি থাকেন এস. নাম্বি. নারায়ণন। পরবর্তীকালে ছাড়া পেয়ে তিনি বলেছিলেন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সদস্যরা তাঁকে দিয়ে জোর করে ইসরো-র বড়ো বড় অফিসারদের দোষী সাব্যস্ত করতে বলেছিলেন। তিনি এই কথায় সম্মত না হলে তাঁকে এমন অত্যাচার করা হয় যে বাধ্য হয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় তাঁর একটাই অভিযোগ ছিল ইসরো-র কোনো কর্মকর্তাই তাঁকে সহায়তা করেননি। ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট নারায়ণনের উপর থেকে সমস্ত আরোপ ও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৯৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কেরালা সরকারের উপর অভিযোগ আনে যে তাঁরা নারায়ণনের গবেষণা-জীবনকে কলঙ্কিত করেছে। সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে নারায়ণনকে তিরুবনন্তপুরমে ফাইল-পত্র সামলানোর কাজ দেওয়া হয়। ২০০১ সালে কেরালা সরকারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য চাপ দিতে থাকে মানবাধিকার কমিশন। ২০১২ সালে কেরালা সরকার কেরালা উচ্চ আদালতের নির্দেশনামা অনুসারে এস. নাম্বি. নারায়ণকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। ২০১২ সালের ৩ অক্টোবর ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে কেরালা সরকার নারায়ণনকে এই মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর জন্য দায়ী পুলিশ অফিসারদের উপর থেকে সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একইসঙ্গে কেরালা সরকার নারায়ণনকে ১.৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বদলে এই মামলা বন্ধ করে দিতে চায়। কিছুদিনের মধ্যে নারায়ণনও এতে সম্মত হন। মামলা আরও দীর্ঘায়িত হয়। ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে নারায়ণনকে বলা হয় সন্দেহভাজনদের নাম প্রকাশ্যে আনতে, কিন্তু তিনি এতে অসম্মত হন কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে এই ঘৃণ্য চক্রান্ত প্রকাশ্যে এলে দেশের তরুণদের ওপর তার প্রভাব পড়বে। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিন বিচারকের একটি প্যানেল তৈরি হয় এই মামলার বিচারের জন্য। মুখ্য বিচারপতি দীপক মিশ্র এস. নাম্বি. নারায়ণনকে বিগত কয়েক বছরে মানসিক নির্যাতন ও হেনস্থা সহ্য করার জন্য অতিরিক্ত ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সম্মত হন।

নারায়ণন বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইও লিখেছিলেন। এর মধ্যে তাঁর আত্মজীবনী ‘ওরমাকালুদে ভ্রমণাপাধম্‌’ খুবই বিখ্যাত। এছাড়াও ২০১৮ সালে তাঁর এই তথ্য পাচারের মামলাকে কেন্দ্র করে হেনস্থার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে নারায়ণন নিজেই একটি বই লিখেছিলেন ‘রেডি টু ফায়ার : হাউ ইণ্ডিয়া অ্যাণ্ড আই সারভাইভড দ্য ইসরো স্পাই কেস’ নামে। ২০১৮ সালে তাঁর জীবন অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা শুরু হয় যার নাম ‘রকেট্রি : এ নাম্বি এফেক্ট’। এই চলচ্চিত্রের কাহিনী নির্মাতা এবং সহ-পরিচালক আর. মাধবন।

২০১৯ সালে ভারত সরকার এস. নাম্বি নারায়ণন কে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে।

      

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য