ইতিহাস

হরগোবিন্দ খোরানা

হরগোবিন্দ খোরানা (Har Gobind khorana) একজন নোবেলজয়ী ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান জৈবরসায়নবিদ যিনি ১৯৬৮ সালে নিউক্লিক অ্যাসিডের মধ্যে নিউক্লিওটাইডের বিশেষ সজ্জারীতি আবিষ্কার করে মার্শাল ডব্লু নিরেনবার্গ এবং রবার্ট ডব্লু হোলির সঙ্গে যৌথভাবে শারীরবিদ্যা তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। জেনেটিক কোড আবিষ্কার করে জিনতত্ত্বে এক বিপ্লব আনেন হরগোবিন্দ খোরানা। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রেটিনার রোগ ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’র কারণ আবিষ্কারও তিনিই করেছেন। জৈব রসায়ন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর অবদান আজও সমানভাবে স্মরণীয়।

১৯২২ সালের ৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে পাঞ্জাবের মূলতানে অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম রায়পুরে হরগোবিন্দ খোরানার জন্ম হয়। গণপত রাই খোরানা এবং কৃষ্ণা দেবী খোরানার পাঁচ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন হরগোবিন্দ। তাঁর বাবা গণপত রাই খোরানা ছিলেন ব্রিটিশ-শাসিত ভারত সরকারের পাটোয়ারী অর্থাৎ কৃষিকর আদায়কারী করণিক। দরিদ্র হলেও গণপত রাই সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। রায়পুর গ্রামে তাঁদের পরিবারটিই ছিল একমাত্র শিক্ষিত পরিবার।

এই গ্রামে তখন কোনো পাকা বিদ্যালয় ভবন ছিল না। গাছের নীচে কোন রকমে অস্থায়ী একটি বিদ্যালয় লেখাপড়া শেখানো হত। হরগোবিন্দ শিক্ষা জীবনের প্রথম চারটি বছর এখানেই অতিক্রান্ত হয়। এরপর তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের মুলতানের দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৪৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। জৈব রসায়নে পিএইচডি করার জন্য ভারত সরকারের একটি বৃত্তি নিয়ে ১৯৪৫ সালে তিনি যাত্রা করেন ইংল্যাণ্ডে। রজার জে. এস. বিয়ারের তত্ত্বাবধানে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৮ সালে ডক্টরেট হন হরগোবিন্দ খোরানা। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে খোরানা এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকেন। ক্ষারীয় রসায়নে পোস্ট ডক্টরাল স্টাডিজের জন্য সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত জুরিখের ‘সুইস ফেডেরাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’তে বিনা পারিশ্রমিকে এক বছর কাজ করেন তিনি। এরপর ভারতে ফিরে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কোনো চাকরি না পেয়ে তিনি আবার ইংল্যাণ্ড প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি পুনরায় একটি বৃত্তি সহযোগে যৌথভাবে জর্জ ওয়ালেস কেনার এবং আলেকজাণ্ডার আর টডের সঙ্গে পেপটাইড ও নিউক্লিওটাইডের উপর গবেষণা করার সুযোগ পান।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত হরগোবিন্দ খোরানা কেমব্রিজে বসবাস করেন এবং ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধীনে ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া রিসার্চ কাউন্সিল’-এ কাজ করার সুযোগ পেলে তিনি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুবারে সপরিবারে চলে আসেন। খোরানা এখানে একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশেষ আগ্রহী হন। ব্রিটিশ কলম্বিয়া রিসার্চ কাউন্সিলে সেই সময় গবেষণার উপযোগী সেরকম পরিকাঠামো ছিল না ঠিকই, কিন্তু এখানে গবেষকদের সমস্ত প্রকার স্বাধীনতা দেওয়া হত। নিউক্লিক অ্যাসিড সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জৈব অণুর সংশ্লেষের উপর তিনি এখানে গবেষণা শুরু করেন।

১৯৬০ সালে ম্যাডিসনের ‘উইসকনসিন ইউনিভার্সিটি’র অধীনে ‘ইনস্টিটিউট ফর এনজাইম রিসার্চ’-এ তিনি সহ-অধ্যক্ষ পদে যোগদান করে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০ সালেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল জিনগত তথ্য ডিএনএ (DNA) থেকে আরএনএ (RNA) এবং তারপর প্রোটিনে বাহিত হয়। ডিএনএ-র তিনটি করে নিউক্লিওটাইডের বিশেষ সজ্জা প্রোটিন মধ্যস্থ অ্যামাইনো অ্যাসিড সৃষ্টির জন্য দায়ী তা জানা গেলেও এই জেনেটিক কোড অর্থাৎ জিন সংকেত কি হবে তা তখনও পর্যন্ত একটি ধাঁধার মতো ছিল। বিজ্ঞানী মার্শাল নিরেনবার্গ এই ধাঁধার কিছুটা সমাধান করেন। ১৯৬০ সালে হরগোবিন্দ খোরানা বিজ্ঞানী নিরেনবার্গের প্রাপ্ত সিদ্ধান্তকে পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন। নিরেনবার্গের সিদ্ধান্ত ছিল যে, কোনো নতুন কোষের রাসায়নিক সংযুক্তি ও কার্য নির্ধারণ করে ডিএনএ অণুর প্যাঁচানো সিঁড়ির মত দ্বিতন্ত্রী কুণ্ডলীতে সজ্জিত চার ধরনের নিউক্লিওটাইড। এই নিউক্লিওটাইডগুলি ডিএনএ তন্ত্রের মধ্যে চৌষট্টিভাবে সজ্জিত থাকতে পারে এবং দেহের প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড সংশ্লেষ করতে পারে। অ্যামাইনো অ্যাসিড সংশ্লেষ দেহের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কারণ যেকোনো প্রোটিনের প্রধান উপাদানই হল অ্যামাইনো অ্যাসিড। এই সিদ্ধান্তের অনুসরণ করে হরগোবিন্দ খোরানা বিশ্লেষণ করেন নিউক্লিওটাইডের এক একটি বিশেষ সজ্জা এক একটি পৃথক অ্যামাইনো অ্যাসিড গঠনের জন্য দায়ী। তিনি প্রমাণ করেন যে নিউক্লিওটাইড কোড সব সময় তিনটি করে গ্রুপ বানিয়ে কোষে স্থানান্তরিত হয়। তিনটি নিউক্লিওটাইড কোড একত্রে একটি করে ‘কোডন’ তৈরি করে। খোরানা প্রমাণ করেন কিছু কিছু কোডন যেমন প্রোটিন সংশ্লেষ শুরু করতে পারে, তেমনি আবার প্রোটিন সংশ্লেষ বন্ধও করতে পারে।

১৯৬২ সালে ম্যাডিসনে অবস্থিত উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব-রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন হরগোবিন্দ খোরানা। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী আরএনএ কিভাবে প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন ফাংশনাল জিনের সংশ্লেষ করে সেই রহস্য উদ্ধার করেছিলেন তিনি। জেনেটিক কোড কী এবং প্রোটিন সংশ্লেষে এর ভূমিকা কী তা তিনি বুঝিয়েছিলেন তাঁর গবেষণাপত্রের মাধ্যমে। বিভিন্ন উৎসেচকের সহায়তায় তিনি বিভিন্ন আরএনএ শৃঙ্খল বানিয়েছিলেন আর এই উত্সেচকগুলির সহায়তায় তিনি অনেক ধরনের প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সমগ্র কাজটির জন্যই তিনি ১৯৬৮ সালে শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৭০ সালে খোরানা এবং তাঁর গবেষক দল জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ঈস্টের (Yeast) জিনের কৃত্রিম নকল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার পরবর্তী বিষয় ছিল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দর্শনপথ (Visual Pathway)। স্নায়ুকোষ মস্তিষ্ককে কিভাবে আণবিক সংকেত প্রেরণ করে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দেখতে সাহায্য করে তা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রেটিনাতে প্রাপ্ত রোডোপ্‌সিনের গঠন ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। রোডোপ্‌সিন হল আলোকসংবেদী প্রোটিন যা আলোকরশ্মিকে বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত করে। স্বল্প আলোয় বা রাতের বেলায় দেখার জন্য এই রোডোপ্‌সিন সাহায্য করে। ড. হরগোবিন্দ খোরানা পর্যবেক্ষণ করেন যে রোডোপ্‌সিনে অনেক সময় মিউটেশন (Mutation) বা পরিব্যক্তি ঘটে যাকে ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ (Retinitis Pigmentosa) বলে। প্রাণীরা তখন রাতের বেলা বা স্বল্প আলোয় দেখতে পায় না যাকে বলা হয় ‘নাইট ব্লাইণ্ডনেস’ (Night Blindness)। ১৯৬৬ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। ১৯৭০ সালে ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (MIT)’ জীববিদ্যা এবং রসায়নের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন খোরানা।

অভিনব সব আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার ড. হরগোবিন্দ খোরানা ‘গার্ডনার ফাউণ্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড’, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়ৰ্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘লুইজা গ্রস হরউইটজ প্রাইজ’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘উইলার্ড গিবস অ্যাওয়ার্ড’ এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মবিভূষণ পুরস্কার’ পান। ১৯৬৮ সালে ‘অ্যালবার্ট লস্কর বেসিক মেডিকেল রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড’ এবং ১৯৮৭ সালে ‘ন্যাশনাল মেডেল অফ সায়েন্স’ অর্জন করেন ড. খোরানা। ১৯৮৭ সালে ‘পল কায়সার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড অফ মেরিট ইন রেটিনা রিসার্চ’-এ ভূষিত হন তিনি।

২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্টের ‘ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন’, ভারত সরকারের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োটেকনোলজি’ এবং ইন্দো-আমেরিকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফোরাম যৌথভাবে ‘খোরানা প্রোগ্রাম’ চালু করে যার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সমস্ত বিজ্ঞানী, শিল্পপতি ও উদ্যোগপতিদের নিয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় তৈরি করা এবং দুটি প্রধান দিক নজরে রাখা – ১) স্নাতক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে গবেষণা করার সুযোগ পায়। ২) এই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সরকারি তথা বেসরকারি সংস্থার সহাবস্থানের মাধ্যমে গ্রামোন্নয়ন সহ দুটি দেশের খাদ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে।

‘দ্য উইসকন্সিন-ইণ্ডিয়া সায়েন্স অ্যাণ্ড টেকনোলজি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ ২০০৭ সালে এই খোরানা প্রোগ্রামের যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্বভার বহন করে। পরবর্তী সময়ে দ্য স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ‘বোর্ড অফ সায়েন্টিফিক গভর্নরস’-এর সদস্য হন তিনি। ২০০৭ সালে MIT থেকে অবসর গ্রহণ করেন ড. হরগোবিন্দ খোরানা। ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি গুগল ডুডল হরগোবিন্দ খোরানার মৃত্যুর পরে তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর ৯৬তম জন্মদিবসটি উদযাপন করে।

২০১১ সালের ৯ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে ম্যাসাচুসেট্‌সের কনকর্ডে হরগোবিন্দ খোরানার মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও