ইতিহাস

এ. কে. ফজলুল হক

এ. কে. ফজলুল হক (Abul Kasem Fazlul Huq) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন জাতীয় নেতা। তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সর্বভারতীয় রাজনীতির পাশাপাশি গ্রাম বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ‘শের-এ-বাংলা’ (Tiger of Bengal) নামেও পরিচিত ছিলেন।

১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বাখেরগঞ্জে একটি মধ্যবিত্ত  বাঙালি মুসলিম পরিবারে এ. কে. ফজলুল হকের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম আবুল কাশেম ফজলুল হক। তাঁর বাবার নাম কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ  এবং মায়ের নাম সাইদুন্নেসা খাতুন। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবা পেশায় আইনজীবী ছিলেন। এ কে ফজলুল হকের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতে। বাড়িতেই তিনি আরবি, ফারসি ও বাংলা ভাষায় শিক্ষা শুরু করেছিলেন। পরে তিনি বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৮৯০ সালে এন্ট্রাস পাশ করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রখর মেধাসম্পন্ন ছাত্র হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিল। সেই সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ফজলুলের মেধার দ্বারা তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ১৮৯৪ সালে তিনি একই বছরে রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিদ্যা তিনটি বিষয়ে  কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, যা তখন ছিল একটি বিরল দৃষ্টান্ত। ইংরাজি ভাষায় এমএ পড়া শুরু করলেও পরে ১৮৯৬ সালে তিনি গণিতশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৮৯৭ সালে কলকাতার ইউনিভার্সিটি ল কলেজ (University Law College) থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করে তিনি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে ওকালতি শুরু করেন। বহুরূপে ও বিভিন্নভাবে  অশ্বিনীকুমার দত্ত এবং  প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর স্নেহলাভের সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল।

বাবার মৃত্যুর পর ফজলুল হক বরিশাল শহরে ওকালতি শুরু করেন। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯০৪ সাল  অবধি তিনি এই শহরের রাজচন্দ্র কলেজে লেকচারার হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ১৯০৬ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। সেই বছরেই ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতেও তিনি সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সম্মেলন থেকেই জন্ম হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সমবায়ের সহকারী রেজিস্ট্রার। এরপর সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি জনসেবামূলক কাজ ও আইন ব্যবসাকে বেছে নেন। স্যার আশুতোষ মুখর্জীর পরামর্শে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষক এবং শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা দেখেছিলেন, তাদের ওপর জমিদার ও মহাজনদের নির্মম অত্যাচার তাঁকে পীড়িত করেছিল। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার ফলে পরবর্তী জীবনে দরিদ্র নিপীড়িত কৃষক এবং শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে তিনি প্রবর্তন করেছিলেন ঋণ সালিশী বোর্ড এবং প্রণয়ন করেছিলেন বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন।

ফজলুল হক ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২১ সাল অব্দি তিনি  নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতিও ছিলেন। একই সময়ে পাশাপাশি তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (Indian National Congress) যুগ্ম সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। দিল্লিতে ১৯১৮ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র বাঙালি যিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন। লক্ষ্ণৌতে ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে তিনি যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তা ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ নামে পরিচিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রাদেশিক পর্যায়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। ওই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মহাত্মা গান্ধী।১৯২৪ সালে তিনি বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন এ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম মুসলমান। ১৯১৯ সালে তিনি খিলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন কিন্তু অসহযোগের প্রশ্নে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। পরে ১৯২০ সালে কংগ্রেস-গৃহীত অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্রিটিশ পণ্য ও উপাধি বর্জনের তিনি সমর্থন করেন। কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়া অবস্থার কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করে তিনি স্কুল ও কলেজ বর্জনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। স্কুল কলেজ বর্জনের সিদ্ধান্ত মুসলমান ছেলেমেয়েদের অগ্রগতিতে বাধার সৃষ্টি করবে এটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন তাই তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন।

১৯২০ সালে কাজী নজরুল ও   মুজাফ্ফর আহমদ এর সঙ্গে  মিলে তিনি নবযুগ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার সরকারবিরোধী নীতির কারণে সরকারের দ্বারা এর জামানত বহুবার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিনব্যাপী এই দৈনিক পত্রিকা চালানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তিনি তাঁর যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন এবং মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। বাংলায় দ্বৈত শাসন আমলে ১৯২৪ সালে প্রায় ছয় মাসের জন্য তিনি শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দেশে শিক্ষা সংক্রান্ত পরিকাঠামো সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম এডুকেশনাল ফান্ড (Muslim Educational Fund) গঠন করে তিনি যোগ্য মুসলমান ছাত্রদের সাহায্য করেন। মুসলমান ছাত্রদের ফারসি ও আরবি শিক্ষাদানের জন্য তিনি বাংলায় একটি পৃথক মুসলমান শিক্ষা দপ্তরও গঠন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সকল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণেরও তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার নতুন কাঠামো তৈরিতেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। ভারতের ভবিষ্যত শাসনতন্ত্রের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য ১৯৩০ সালে এবং ১৯৩২ সালের মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পরপর বেশ কয়েকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার দ্বিতীয় বৈঠকে  যোগ দিয়েছিল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ। তিনি সেই বৈঠকে বাংলা এবং পাঞ্জাবের মুসলমানদের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব দাবি করেছিলেন। তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচনের পক্ষেও বক্তৃতা দিয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন পাবার পর ১৯৩৭ সালে সেখানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতে প্রজা পার্টি নামে সামন্ততন্ত্র বিরোধী যে দল ছিল তিনি সেটির রূপান্তর ঘটান কৃষক-প্রজা পার্টি নামে রাজনৈতিক দলে। সেই নির্বাচনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে তাঁর দল তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ এবং নির্দলীয় সদস্যদের সঙ্গে জোট গঠন করেন তিনি এবং অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ‘লাহোর প্রস্তাব’ ছিল একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা পরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত হয়। ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব এবং উত্তরপশ্চিমের মুসলমান প্রধান অংশে ‘স্বায়ত্তশাসিত পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার দাবি সম্বলিত সেই প্রস্তাব গৃহীত ও পাশ হয় ওই অধিবেশনে। ওই অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসীরা তাঁকে উপাধি দিয়েছিল শের-এ-বঙ্গাল (শেরে বাংলা)। ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হয়ে যাবার পর ফজলুল হক ঢাকায় চলে যান এবং ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল (Advocate General) নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ‘যুক্তফ্রন্ট’ দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত ও কার্যকর হবার পর তিনি স্বারষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে করাচি থেকে ঢাকা চলে যান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের এক অভ্যূত্থানের পর তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়।

এ. কে. ফজলুল হকের ১৯৬২ সালে ২৭ এপ্রিল মৃত্যু হয়। তাঁর অবদান বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল মনে রাখবে শুধু রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে না বরং পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতি সাধনের জন্য তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা, বিপুল সংখ্যক কৃষকের দারিদ্র্য বিমোচন ও তাঁর উদার প্রকৃতির জন্য।।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন